স্ক্রিনের আলোয় ঢেকে যাওয়া আড্ডার সোনালি বিকেল

IMG-20260328-WA0003

বেবি চক্রবর্ত্তী

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে এক সময় শহরের অলিগলি যেন নিজে থেকেই জেগে উঠত। পাড়ার মোড়ে, চায়ের দোকানের সামনে, কিংবা পুরোনো কোনো গাছের তলায় জড়ো হত কয়েকজন মানুষ—হাতে কাঁচের ভাঁড়, চোখে কৌতূহল, আর মনে অজস্র গল্পের ভাণ্ডার। সেই আড্ডা ছিল না কেবল কথোপকথন; ছিল সময়কে একটু থামিয়ে রাখার শিল্প, ছিল ব্যস্ত জীবনের ভিড়ে কিছুটা নিঃশ্বাস নেওয়ার অবকাশ। আজ সেই দৃশ্য যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। মোবাইলের আলোয় আলোকিত মুখগুলো আর একে অপরের দিকে তাকায় না, বরং ডুবে থাকে নিজস্ব ভার্চুয়াল জগতে। যে আড্ডা একসময় বাঙালির জীবনকে রঙিন করে তুলত, তা এখন যেন স্মৃতির কুয়াশায় আবৃত এক অতীত। আড্ডা মানে ছিল মুক্তির স্বাদ। কোনো বাঁধাধরা নিয়ম ছিল না, ছিল না কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য। তবুও সেই উদ্দেশ্যহীনতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকত গভীর অর্থ। রাজনীতি নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক, কবিতার পঙক্তি আবৃত্তি, ফুটবল ম্যাচের বিশ্লেষণ কিংবা সিনেমার দৃশ্য নিয়ে অনন্ত আলোচনা—সবকিছু মিলেই তৈরি হত এক অনন্য পরিবেশ। সেখানে মানুষ নিজের মত প্রকাশ করত নির্ভয়ে, আবার অন্যের মতকে শুনত মন খুলে।সেই আড্ডা ছিল এক অদৃশ্য বিদ্যালয়, যেখানে বইয়ের পাতার বাইরেও শেখা হত জীবনের পাঠ। বহু চিন্তার জন্ম, বহু আন্দোলনের সূচনা, এমনকি সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা ধারার বিকাশও এই আড্ডার মধ্য দিয়েই ঘটেছে। কোনো কবির প্রথম কবিতা হয়তো জন্ম নিয়েছিল বন্ধুর মুখে শোনা একটি কথার মধ্যে দিয়ে, কোনো নাট্যকারের নতুন নাটকের বীজ হয়তো বপন হয়েছিল পাড়ার এক সন্ধ্যার আড্ডায়। এক সময় কলকাতার কফি হাউস, কলেজ স্ট্রিট, শ্যামবাজারের মোড় কিংবা উত্তর কলকাতার পুরোনো বনেদি বাড়ির বারান্দা ছিল আড্ডার প্রাণকেন্দ্র। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল পেরিয়ে রাত—কথার শেষ ছিল না। কেউ আসত খবরের কাগজ হাতে, কেউ নতুন বইয়ের কথা বলতে, কেউ বা শুধু একটু মানুষের সঙ্গ খুঁজতে। সেই আড্ডায় বয়সের ফারাক থাকত, কিন্তু দূরত্ব থাকত না।কিন্তু সময়ের স্রোত আজ অন্য পথে বয়ে চলেছে। ডিজিটাল যুগ মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে গোটা পৃথিবী, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে পাশের মানুষটির সঙ্গে সহজ সংযোগের মুহূর্তগুলো। এখন আর তর্ক জমে না চায়ের কাপে, বরং তা ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। এখন আর মুখোমুখি হাসি ভাগ করে নেওয়া হয় না, বরং ইমোজির আড়ালে লুকিয়ে থাকে অনুভূতি।একটি ছোট্ট পর্দা যেন ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠেছে মানুষের সমস্ত সম্পর্কের মাঝখানে। আগে সন্ধ্যা হলে কেউ ডাকত—“চল, একটু বাইরে গিয়ে বসি।” এখন সেই ডাক আর শোনা যায় না। বরং এক ঘরে বসে থেকেও প্রত্যেকে আলাদা হয়ে যায় নিজস্ব মোবাইলের ভেতরে। কথোপকথনের জায়গা নিয়েছে নোটিফিকেশন, আন্তরিকতার জায়গা নিয়েছে অনলাইন উপস্থিতি।এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভেতরেও জন্ম নিচ্ছে এক অদৃশ্য নিঃসঙ্গতা। অনেক মানুষের ভিড়েও একাকীত্ব যেন ক্রমশ বেড়ে চলেছে। আগে যেখানে পাড়ার প্রতিটি মানুষ একে অপরের পরিচিত ছিল, আজ সেখানে পরিচয়ের জায়গা দখল করেছে দূরত্ব। একই ঘরে বসেও পরিবারের সদস্যরা আলাদা আলাদা স্ক্রিনে ডুবে থাকেন। মা রান্নাঘরে, বাবা টেলিভিশনের সামনে, সন্তান নিজের ফোনে—এক ছাদের নীচে থেকেও যেন সবাই আলাদা আলাদা দ্বীপে বাস করছে। সমাজবিদদের মতে, এই বদলে যাওয়া জীবনযাত্রা শুধু সম্পর্ক নয়, মানুষের মননকেও প্রভাবিত করছে। আড্ডা মানুষকে সহনশীল হতে শেখাত। ভিন্ন মতকে সম্মান করতে শেখাত। আজকের ভার্চুয়াল পরিসরে মতের অমিল অনেক সময় তর্ক নয়, বিভাজন তৈরি করছে। অথচ আড্ডার টেবিলে মতভেদ থাকলেও সম্পর্ক ভাঙত না; শেষ পর্যন্ত এক কাপ চা-ই সব দূরত্ব মুছে দিত।নগরজীবনের ব্যস্ততা এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। সময় যেন এখন আর কারও জন্য থেমে থাকে না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ছুটে চলা জীবনে আড্ডার জন্য আলাদা করে সময় বের করা যেন বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে চায়ের দোকানে একসময় সন্ধ্যা হলেই জায়গা পাওয়া কঠিন ছিল, আজ সেখানে অনেক সময়ই ফাঁকা চেয়ারে ধুলো জমে।পাড়ার রকের ওপর বসে থাকা ছেলেগুলোর জায়গায় এখন দাঁড়িয়ে আছে মোটরবাইক, আর হাতে হাতে বই বা খবরের কাগজের বদলে রয়েছে স্মার্টফোন। একসময় যে গলিতে রাত পর্যন্ত তর্কের গলা শোনা যেত, সেখানে এখন শুধু গাড়ির শব্দ, কিংবা নিঃশব্দে চলতে থাকা ইন্টারনেটের তরঙ্গ।তবুও আশার আলো সম্পূর্ণ নিভে যায়নি। শহরের কিছু কোণে এখনও বেঁচে আছে সেই পুরোনো দিনের আড্ডা। বইয়ের গন্ধে ভরা গলিতে, কোনো পুরোনো কফি হাউসের কাঠের টেবিলে, কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরবর্তী আলোচনায়—এখনও শোনা যায় মানুষের সরাসরি কথোপকথনের সুর। কোনো বইমেলায়, কোনো নাটকের মহড়ার শেষে, কিংবা কোনো ছোট্ট কবিতা পাঠের আসরে এখনও মানুষ একে অপরের দিকে তাকিয়ে কথা বলে, হাসে, তর্ক করে।অনেক তরুণ-তরুণীও এখন বুঝতে শুরু করেছেন, কেবল ভার্চুয়াল জগৎ মানুষকে সম্পূর্ণ তৃপ্তি দিতে পারে না। তাই কেউ কেউ আবার ফিরে যাচ্ছেন পুরোনো অভ্যাসে। বন্ধুরা সপ্তাহে একদিন ঠিক করছেন—সেদিন ফোন নয়, শুধুই গল্প। কেউ আয়োজন করছেন ‘নো মোবাইল আড্ডা’, কেউ আবার পাড়ার লাইব্রেরি বা ক্লাবে বসে নতুন করে কথোপকথনের পরিবেশ তৈরি করছেন।বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সরাসরি সংযোগের বিকল্প কখনও হতে পারে না। তাই প্রয়োজন সচেতনতার—নিজেদের মধ্যেই খুঁজে নিতে হবে সেই হারিয়ে যাওয়া সময়। হয়তো প্রতিদিন নয়, কিন্তু কখনও কখনও মোবাইল সরিয়ে রেখে, একটু সময় বের করে, কাছের মানুষদের সঙ্গে বসে কথা বলার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সেই পুরোনো আনন্দের পুনরাবৃত্তি।বাঙালির আড্ডা কেবল একটি অভ্যাস নয়; এটি এক অনুভব, এক ঐতিহ্য, এক সাংস্কৃতিক পরিচয়। সময়ের ঢেউয়ে তা আজ কিছুটা ক্ষয়ে গেলেও, তার অস্তিত্ব এখনও অমলিন। হয়তো কোনো এক নিরিবিলি সন্ধ্যায়, আবার কোথাও জমে উঠবে আড্ডা—চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠবে, তর্কের ঝড় বইবে, আর মানুষের মুখে ফুটে উঠবে সেই চিরচেনা হাসি।হয়তো আবার কোনো পাড়ার মোড়ে কেউ বলে উঠবে, “অনেকদিন বসা হয়নি, চল আজ একটু আড্ডা দেওয়া যাক।” আর সেই একটুকরো ডাকেই ফিরে আসবে হারিয়ে যাওয়া এক পৃথিবী—যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব মাপা হত না নেটওয়ার্কের গতিতে, বরং মাপা হত একসঙ্গে বসে কাটানো সময়ের উষ্ণতায়। কারণ, আড্ডা কখনও সম্পূর্ণ হারিয়ে যায় না। সে শুধু অপেক্ষা করে- মানুষ আবার মানুষকে সময় দেবে, এই আশায়।

About Author

Advertisement