মিজোরাম: দুর্নীতির বিরুদ্ধে নতুন বার্তা

IMG-20260513-WA0083(1)

প্রাক্তন বিধানসভা স্পিকারের বিরুদ্ধে মামলা চালানোর অনুমতি কেন ঐতিহাসিক বলে মনে করা হচ্ছে?

দেবেন্দ্র কিশোর

মিজোরাম-এ গত কয়েক বছর ধরে রাজনৈতিক স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং উন্নয়নমূলক বাজেটের ব্যবহারের ওপর গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রাক্তন বিধানসভা স্পিকার ও প্রাক্তন মন্ত্রী লালরিনলিয়ানা সাইলো-এর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলায় বিচার প্রক্রিয়া চালানোর অনুমতি রাজ্যপাল ভি. কে. সিং দেওয়ায় রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
এটি শুধুমাত্র একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়; বরং মিজোরামের রাজনৈতিক ইতিহাসে “ক্ষমতার সুরক্ষার উপরে আইনের শাসন” প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয় সমীকরণের কারণে সংবেদনশীল দুর্নীতির মামলাগুলি চাপা পড়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠছিল। সেই প্রেক্ষাপটে রাজ্যপালের এই সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আরও সক্রিয় ও জবাবদিহিমূলক করার ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হচ্ছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে সড়ক নির্মাণ প্রকল্প:
পুরো ঘটনাটি পূর্ব মিজোরামের খাওজাওল–নগাইজাওল সড়ক নির্মাণ প্রকল্পকে ঘিরে। রাজ্য দুর্নীতি দমন ব্যুরো (এসিবি)-র তদন্ত অনুযায়ী, সাইলোর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে প্রকল্পের সাব-কন্ট্রাক্ট প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তে প্রকল্প-সংক্রান্ত অর্থের অনিয়মিত লেনদেন, ব্যক্তিগত স্বার্থে সরকারি প্রভাবের অপব্যবহার এবং ঠিকাদারদের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগও সামনে এসেছে। এসিবি-র দাবি, প্রায় ৯৭.৮৫ লক্ষ টাকা অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হল, তদন্তকারীদের দাবি অনুযায়ী, সাইলো বিধানসভা স্পিকারের পদে থাকাকালীনও প্রকল্প-সংক্রান্ত অর্থ গ্রহণ করেছিলেন। যদি আদালতে এই অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে তা মিজোরামের রাজনৈতিক নৈতিকতার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তুলে দেবে।
রাজনৈতিক যাত্রা থেকে বিতর্ক পর্যন্ত:
সাইলোর রাজনৈতিক জীবনও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি একসময় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। পরে ২০১৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে কংগ্রেস ছেড়ে মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট (এমএনএফ)-এ যোগ দেন এবং নির্বাচনে জিতে বিধানসভা স্পিকার হন।
২০২৩ সালের নির্বাচনের আগে তিনি ভারতীয় জনতা পার্টি-তে যোগ দিলেও নির্বাচনে পরাজিত হন। বারবার দল পরিবর্তন এবং ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকার রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজ্যপালের সিদ্ধান্ত কেন ঐতিহাসিক?
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত এগিয়ে নিতে “প্রসিকিউশন স্যাংশন” বা বিচারিক অনুমোদন প্রায়ই বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বহু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চাপ, জোটের সমীকরণ কিংবা প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে মামলা এগোয় না।
কিন্তু এবার রাজ্যপাল দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৮৮ এবং ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (বিএনএসএস), ২০২৩-এর অধীনে বিচারিক অনুমতি দিয়ে আদালতে মামলা চালানোর পথ খুলে দিয়েছেন। এর ফলে স্পষ্ট বার্তা গেছে যে সাংবিধানিক পদগুলি কেবল আনুষ্ঠানিক নয়, বরং জবাবদিহির আওতায়ও পড়ে।
বিশেষত উত্তর-পূর্ব ভারতের ছোট রাজ্যগুলিতে রাজনীতি প্রায়ই ব্যক্তিকেন্দ্রিক বলে মনে করা হয়। সেই প্রেক্ষাপটে এই ধরনের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত বিরল। তাই একে “দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক সক্রিয়তার” একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মিজোরামে বাড়তে থাকা দুর্নীতি নিয়ে উদ্বেগ:
মিজোরাম দীর্ঘদিন ধরে ভারতের অন্যতম শান্তিপূর্ণ ও সামাজিকভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ রাজ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নয়নমূলক প্রকল্পে বিলম্ব, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে।
সড়ক, গ্রামীণ অবকাঠামো এবং সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ সাধারণ মানুষের আস্থা দুর্বল করেছে। এই কারণেই ২০২২ সালের বিধানসভা বাজেট অধিবেশনে বিরোধী দলগুলি সাইলোর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রতিবাদে ওয়াকআউট করেছিল।
এই ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে দুর্নীতি এখন শুধুমাত্র আইনি বিষয় নয়; এটি জননৈতিকতা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।
সামনে কী?
রাজ্যপালের অনুমতির পর এখন মামলাটি আদালতে যাবে। আদালত প্রমাণ, আর্থিক লেনদেন, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং অভিযুক্তদের ভূমিকা নিয়ে বিশদ তদন্ত করবে। আইন অনুযায়ী, অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সাইলোকে নির্দোষ হিসেবেই গণ্য করা হবে।
তবে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনা ইতিমধ্যেই একটি বড় বার্তা দিয়েছে—ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরাও তদন্তের ঊর্ধ্বে নন।
যদি তদন্ত নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে এগোয়, তাহলে তা শুধু মিজোরাম নয়, সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতে সুশাসন ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দিতে পারে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই যে শুধুমাত্র স্লোগানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক আচরণে রূপ নিচ্ছে—এই ঘটনাকে সেই পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

About Author

Advertisement