জয়শঙ্করের সম্ভাব্য নেপাল সফর: নয়াদিল্লি–কাঠমান্ডু সম্পর্কের নতুন অধ্যায় নাকি পুরোনো দ্বিধা?

IMG-20260513-WA0092

দেবেন্দ্র কিশোর

নেপাল–ভারত সম্পর্ক দক্ষিণ এশীয় কূটনীতিতে সবচেয়ে জটিল, সংবেদনশীল এবং বহুমাত্রিক সম্পর্কগুলোর একটি। উন্মুক্ত সীমান্ত, সাংস্কৃতিক নৈকট্য, ধর্মীয় সম্পর্ক, অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দুই দেশের সম্পর্ক কেবলমাত্র দুটি সরকারের আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি জনগণ থেকে শুরু করে কৌশলগত স্তর পর্যন্ত গভীরভাবে যুক্ত। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সম্ভাব্য নেপাল সফর কূটনৈতিক মহলে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নেপাল থেকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। যদিও সফরের তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি, তবে এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা স্পষ্ট—কাঠমান্ডু এবং নয়াদিল্লি উভয়ই এখন তাদের সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করছে। বিশেষ করে নেপালে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ গঠনের পর ভারত তার কৌশলগত সংলাপ আরও সক্রিয় করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জয়শঙ্কর কোনো সাধারণ কূটনীতিক নন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন হওয়ার পাশাপাশি গত কয়েক বছরে ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম নীতি’, ইন্দো–প্যাসিফিক কৌশল এবং চীনের সঙ্গে শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। নেপাল সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় বাস্তববাদী ও কৌশলগত বলে বিবেচিত হয়েছে। তাই তার সম্ভাব্য নেপাল সফরকে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক সৌজন্য নয়, বরং একটি বড় রাজনৈতিক সংকেত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সূত্র অনুযায়ী, তিনি কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন শাহর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করতে পারেন। যদি এমন সাক্ষাৎ হয়, তবে তা শুধুমাত্র স্থানীয় সরকারের সঙ্গে সাধারণ আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বালেন শাহ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিকল্প রাজনৈতিক চেতনার প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছেন। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা এবং প্রচলিত রাজনৈতিক দলের প্রতি অসন্তোষের প্রতিনিধিত্ব তিনি করেন। এটি ইঙ্গিত করতে পারে যে ভারত এখন কেবল কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গেই নয়, বরং নেপালের অভ্যন্তরে উদীয়মান নতুন ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক বিস্তারে আগ্রহী।
তবে নেপাল–ভারত সম্পর্কের আলোচনায় একটি বিষয় উপেক্ষা করা যায় না—সীমান্ত বিরোধ। বিশেষ করে লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ এবং কালাপানি অঞ্চল নিয়ে বিরোধ দুই দেশের মধ্যে আবেগগত দূরত্ব তৈরি করেছিল। নেপাল নতুন মানচিত্র প্রকাশ করে এসব অঞ্চলকে নিজের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পর সম্পর্ক কিছুটা উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। সে সময় ভারত কঠোর অবস্থান নিয়েছিল এবং নেপালে জাতীয়তাবাদের বিতর্ক তীব্র হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। নেপাল সরকার তার আনুষ্ঠানিক অবস্থান পরিবর্তন করেনি। বিতর্কিত অঞ্চলগুলোর ওপর দাবি এখনও বহাল রয়েছে। তবে সংলাপের ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে—সংঘাতের বদলে সংলাপ, আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়ার বদলে কূটনৈতিক সংযম এবং প্রকাশ্য দোষারোপের বদলে কাঠামোগত সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ভারতও নেপালকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করতে পারছে না, কারণ চীনের ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তা দক্ষিণ এশীয় কৌশলে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।
এই কারণেই জয়শঙ্করের সম্ভাব্য সফর কেবল দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গেও যুক্ত। গত কয়েক বছরে নেপালে চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) প্রকল্প, জ্বালানি সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তাই নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে বিন্যস্ত করা ভারতের জন্য কৌশলগত প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেপালের জন্যও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক একটি সংবেদনশীল বিষয়। অর্থনৈতিকভাবে নেপাল এখনও অনেকাংশে ভারতের ওপর নির্ভরশীল। বাণিজ্য, পেট্রোলিয়াম, কর্মসংস্থান, বিদ্যুৎ রপ্তানি, পরিবহন এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে নেপালি সমাজে ভারতের প্রতি আস্থা ও সন্দেহ—দুই-ই পাশাপাশি বিদ্যমান। একদিকে ধর্মীয়–সাংস্কৃতিক নৈকট্য, অন্যদিকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে গভীর মনস্তাত্ত্বিক অসন্তোষও রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে নেপাল সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি। জাতীয় সার্বভৌমত্বে স্পষ্ট অবস্থান রেখে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা জোরদার করা এখন অত্যাবশ্যক। কেবল জাতীয়তাবাদের রাজনীতি দিয়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায় না, আবার জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষা করেও স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
জয়শঙ্করের সম্ভাব্য সফর এই দ্বিধার মধ্যেই একটি নতুন সংলাপের সুযোগ হতে পারে। যদি এই সফরে সীমান্ত সমস্যা, জ্বালানি বাণিজ্য, সংযোগ ব্যবস্থা, বিনিয়োগ, তরুণ নেতৃত্ব এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয়গুলোতে স্পষ্ট ও পরিপক্ব আলোচনা হয়, তবে এটি সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু যদি এটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা শক্তি প্রদর্শনে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে নেপালি জনগণের মধ্যে বিদ্যমান অবিশ্বাস আরও গভীর হতে পারে।
নেপাল ও ভারতের সম্পর্ক ইতিহাস, ভূগোল এবং জনমানসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এটিকে না কোনো সরকার একা নষ্ট করতে পারে, না একদিনে আদর্শ সম্পর্ক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। প্রয়োজন স্বচ্ছ সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান এবং সংবেদনশীল বিষয়ে আন্তরিক কূটনীতি। জয়শঙ্করের সম্ভাব্য নেপাল সফর নির্ধারণ করবে কাঠমান্ডু–নয়াদিল্লি সম্পর্ক ভবিষ্যতে কোন পথে এগোবে—নতুন আস্থার দিকে, নাকি পুরোনো দ্বিধার পুনরাবৃত্তির দিকে।

About Author

Advertisement