দেবেন্দ্র কিশোর
ভদ্রপুর: নেপালের বিচার বিভাগীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় সাংবিধানিক পরিষদের সাম্প্রতিক সুপারিশকে ঘিরে আবারও তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে পাশ কাটিয়ে অন্য একজন বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি পদে সুপারিশ করার ঘটনায় আইনি বৈধতা, প্রথাগত চর্চা, প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের সম্ভাবনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
এই বিতর্ক কেবল একজন ব্যক্তির নির্বাচনকে ঘিরে নয়; বরং রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনবিশ্বাসের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এটিকে শুধুমাত্র একটি সাধারণ নিয়োগ প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যায় না।
১. সুপারিশের পটভূমি ও বিতর্কের সূত্রপাত
সাংবিধানিক পরিষদ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের মধ্য থেকে একজনকে ভবিষ্যৎ প্রধান বিচারপতি হিসেবে সুপারিশ করার পর জনপরিসরে বিতর্ক তীব্র হয়ে ওঠে। জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে উপেক্ষা করে অন্য একজনের নাম সুপারিশ করায় এক পক্ষ অভিযোগ তোলে যে “জ্যেষ্ঠতার প্রথা ভঙ্গ করা হয়েছে”, অন্যদিকে আরেক পক্ষের দাবি—এটি “যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা ও সাংবিধানিক অধিকারের ভিত্তিতে করা নির্বাচন।”
এদিকে সাবেক বিচারপতি, আইনজ্ঞ ও অধ্যাপকরা বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন। কেউ এটিকে আইনসম্মত বলেছেন, আবার কেউ ভবিষ্যতে বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
২. সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে কী বলা হয়েছে?
নেপালের সংবিধানে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের জন্য সাংবিধানিক পরিষদের সুপারিশ এবং সংসদীয় শুনানির ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সংবিধানে কোথাও স্পষ্টভাবে বলা নেই যে “জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকেই অবশ্যই প্রধান বিচারপতি করতে হবে।”
সুতরাং আইনি দৃষ্টিতে সাংবিধানিক পরিষদ “উপযুক্ত” মনে করা বিচারপতিকেই সুপারিশ করার অধিকার রাখে। এই ভিত্তিতেই কিছু আইনজ্ঞ বর্তমান সুপারিশকে অসাংবিধানিক বলা যায় না বলে মত দিয়েছেন।
তবে এখানে মূল প্রশ্ন কেবল আইনি বৈধতা নয়, বরং “প্রাতিষ্ঠানিক প্রথা ও নিরপেক্ষতার সংস্কৃতি।”
৩. জ্যেষ্ঠতার প্রথা: বাধ্যতামূলক নিয়ম নাকি নৈতিক চর্চা?
নেপালের বিচার বিভাগীয় ইতিহাসে সাধারণত জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকেই প্রধান বিচারপতি করার প্রথা চলে এসেছে। যদিও এটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়, তবুও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা ও নিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে এটিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে সময়ে সময়ে এই প্রথা ভাঙার উদাহরণও রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আইনজীবীদের সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, আবার কখনও জ্যেষ্ঠতাকে উপেক্ষা করে অন্য বিচারপতিদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ফলে বোঝা যায়, এই প্রথা কোনো কঠোর নিয়ম ছিল না।
তাই বর্তমান বিতর্ক নতুন নয়, তবে এর রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা আগের তুলনায় অনেক বেশি।
৪. রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা
এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি উঠছে তা হলো—“বিচার বিভাগের নেতৃত্ব নির্বাচন কি রাজনৈতিক প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে?”
যেহেতু সাংবিধানিক পরিষদ প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়, তাই নির্বাহী বিভাগের প্রধানের প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই দেখা যায়। যখন পরিষদ জ্যেষ্ঠতাকে উপেক্ষা করে অন্য বিকল্প বেছে নেয়, তখন রাজনৈতিক পক্ষপাতের আশঙ্কা আরও জোরালো হয়।
আইনজ্ঞদের একাংশ সতর্ক করেছেন যে, এই প্রবণতা ভবিষ্যতে “অনুকূল ব্যক্তিদের নির্বাচন” করার সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে। যদি বিচার বিভাগের নেতৃত্ব রাজনৈতিক ইচ্ছানুযায়ী নির্ধারিত হতে শুরু করে, তবে আদালতের স্বাধীনতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
৫. বিরোধী পক্ষ ও ভিন্নমতের ভূমিকা
এই সুপারিশ প্রক্রিয়ায় পরিষদের সব সদস্য একমত ছিলেন না। প্রধান বিরোধী দলের নেতা এবং জাতীয় পরিষদের সভাপতির “নোট অব ডিসেন্ট” দাখিল করার ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে যে সিদ্ধান্তটি সর্বসম্মত ছিল না।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতভেদ স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু যখন সাংবিধানিক সংস্থার ভেতরে গভীর মতবিরোধ দেখা যায়, তখন সিদ্ধান্তের বৈধতা নয়, বরং তার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
৬. ভবিষ্যতে সম্ভাব্য প্রভাব
এই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তিনটি স্তরে দেখা যেতে পারে—
(ক) বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা
যদি নাগরিকরা মনে করতে শুরু করেন যে বিচার বিভাগ রাজনৈতিক প্রভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তবে আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। বিচার ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হলো জনবিশ্বাস।
(খ) প্রাতিষ্ঠানিক প্রথা
যদি জ্যেষ্ঠতার প্রথা দুর্বল হতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে বারবার প্রশ্ন উঠবে—“কাকে কেন নির্বাচন করা হলো?”
(গ) ক্ষমতার ভারসাম্য
নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলে গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
৭. “সরকারি প্রভাব” নিয়ে অভিযোগ কতটা যৌক্তিক?
কিছু মন্তব্যে অভিযোগ করা হয়েছে যে বর্তমান সরকার বিচার বিভাগে নিজেদের অনুকূল ব্যক্তিকে আনতে চাচ্ছে।
তবে বাস্তবিকভাবে এটি পরিষ্কার করা জরুরি যে নেপালের বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী বিচার বিভাগীয় নিয়োগ সাংবিধানিক পরিষদের সমষ্টিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে হয়, কোনো এক ব্যক্তির একক সিদ্ধান্তে নয়। তাই “একজন ব্যক্তির ইচ্ছাতেই পুরো সিদ্ধান্ত হয়েছে” — এমন দাবি আইনগত ও কাঠামোগতভাবে প্রমাণ করা কঠিন।
তবুও রাজনৈতিক প্রভাবের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না।
৮. প্রয়োজনীয় সংস্কারের দিকনির্দেশ
এই বিতর্ক কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে—
(১) জ্যেষ্ঠতার মানদণ্ড স্পষ্ট করা
জ্যেষ্ঠতাকে বাধ্যতামূলক বা অগ্রাধিকারমূলক মানদণ্ড হিসেবে ধরা হবে কি না, তা স্পষ্টভাবে আইনে উল্লেখ করা উচিত।
(২) পরিষদের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি
সাংবিধানিক পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ করা প্রয়োজন।
(৩) কারণসহ সিদ্ধান্ত প্রকাশ
যদি জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে নির্বাচিত না করা হয়, তবে তার স্পষ্ট লিখিত কারণ প্রকাশ করার চর্চা শুরু করা যেতে পারে।
(৪) সংসদীয় নজরদারি শক্তিশালী করা
সংসদীয় শুনানি প্রক্রিয়াকে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা না রেখে বাস্তবভিত্তিক প্রশ্নোত্তর ও জবাবদিহিতামূলক করতে হবে।
৯. উপসংহার: বিতর্কের বাইরে, প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসের প্রশ্ন
প্রধান বিচারপতির নিয়োগ নিয়ে এই বিতর্ক কেবল একজন ব্যক্তির নির্বাচনকে ঘিরে নয়, বরং নেপালের গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
একদিকে সংবিধান একটি নমনীয় কাঠামো দিয়েছে, অন্যদিকে প্রথা স্থিতিশীলতা ও বিশ্বাসের ভিত্তি তৈরি করেছে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে এ ধরনের বিতর্ক ভবিষ্যতেও বারবার ফিরে আসবে।
সবশেষে বলা যায়, কোনো সিদ্ধান্ত আইনগতভাবে বৈধ হলেও যদি তা জনবিশ্বাসকে দুর্বল করে, তবে তার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্য অনেক বড় হয়ে দাঁড়ায়। তাই এখন প্রয়োজন শুধু আইনের নয়, বরং বিশ্বাস গড়ে তোলার সংস্কৃতির—যেখানে বিচার বিভাগ কেবল ক্ষমতার একটি অঙ্গ নয়, বরং নিরপেক্ষতার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।










