দেবেন্দ্র কিশোর
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি হওয়া “পারস্পরিক গোয়েন্দা সহযোগিতা” চুক্তি দক্ষিণ এশীয় কূটনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তিকে মাদক পাচার, মনঃপ্রভাবিত পদার্থের অবৈধ বাণিজ্য, অর্থপাচার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে জানানো হলেও এর গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ করে ভারত এই চুক্তিকে সন্দেহের চোখে দেখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ এবং পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন রাজা নকভি এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তিতে যৌথ গোয়েন্দা তৎপরতা, তথ্য আদান-প্রদান এবং “সীমান্ত-সংক্রান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ”-এর মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অথচ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো প্রত্যক্ষ স্থলসীমান্তই নেই। এই বাস্তবতাই চুক্তিটির প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই সহযোগিতাকে কেবল মাদক নিয়ন্ত্রণের সাধারণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা যায় না। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মাদক পাচার, জঙ্গি সংগঠন এবং গোয়েন্দা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে আলোচিত। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের উন্মুক্ত ও সংবেদনশীল সীমান্ত রয়েছে, যেখানে অবৈধ পাচার, মানবপাচার, জাল মুদ্রা ব্যবসা এবং উগ্রপন্থী তৎপরতার অভিযোগ প্রায়ই উঠে আসে।
এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বাংলাদেশে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাওয়া ভারতের জন্য কৌশলগত উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার মতো ভারতীয় সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে লস্কর-ই-তৈয়বার মতো পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠনের ভারত–বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় উপস্থিতির অভিযোগও এই চুক্তি নিয়ে সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর গোপনীয়তা। আদান-প্রদান করা তথ্য কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে প্রকাশ না করা এবং যৌথ অভিযান পরিচালনার ব্যবস্থাও এতে রাখা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রভাব বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমনকি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে পর্যাপ্তভাবে অবহিত না করেই এই চুক্তি করা হয়েছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে ভারতের সঙ্গে একটি “ভারসাম্য নীতি” অনুসরণ করার চেষ্টা করছে। তবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর হওয়ায় ঢাকা অতিরিক্ত কৌশলগত ঝুঁকি নিতে পারবে না। যদি পাকিস্তানের সঙ্গে এই সহযোগিতা ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার এই চুক্তিকে কেবল অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরছে। আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং সীমান্তপারের অপরাধ দমনে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের লক্ষ্য ইতিবাচক মনে হলেও দক্ষিণ এশিয়ার সংবেদনশীল শক্তির রাজনীতিতে এ ধরনের চুক্তি সবসময়ই বড় কূটনৈতিক তাৎপর্য বহন করে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, পাকিস্তান–বাংলাদেশ নিরাপত্তা সহযোগিতা কেবল মাদক নিয়ন্ত্রণের প্রশাসনিক সমঝোতা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য, গোয়েন্দা রাজনীতি এবং আঞ্চলিক অবিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত একটি জটিল ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে এর প্রভাব ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো এবং সীমান্তপারের অপরাধ নিয়ন্ত্রণের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।










