নেপালের অর্থনীতির অবস্থা চ্যালেঞ্জপূর্ণ

IMG-20260512-WA0006

দেবেন্দ্র কিশোর

নেপালের অর্থনীতি গত এক দশকে এক ধরনের বৈপরীত্যপূর্ণ বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে মাথাপিছু আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, শিল্প সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যায়নি। ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নেপালের গড় বাস্তব জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪–৪.৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকলেও মাথাপিছু জাতীয় আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই ঘটনা স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং নেপালের অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা, কাঠামোগত দুর্বলতা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে গভীর আলোচনার প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করেছে।
সাধারণত কোনো দেশের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কিন্তু নেপালের ক্ষেত্রে এই সম্পর্কটি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এখানে আয় বৃদ্ধির প্রধান উৎস বৈদেশিক কর্মসংস্থান থেকে আসা রেমিট্যান্স। লাখো নেপালি যুবক বিদেশে শ্রম বিক্রি করছেন এবং তাদের পাঠানো অর্থ দেশের ভোগব্যয়, সেবা খাত এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে টিকিয়ে রেখেছে। এ কারণেই নেপালের মাথাপিছু আয় ডলারে আকর্ষণীয় দেখালেও তার ভিত্তি অভ্যন্তরীণ উৎপাদন নয়, বরং বিদেশি শ্রমবাজার।
বর্তমানে নেপালের জিডিপিতে রেমিট্যান্সের অবদান ২০ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে, যা বিশ্বের অন্যতম উচ্চ হার। রেমিট্যান্স পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং ভোগক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গ্রামাঞ্চলে পাকা বাড়ি, বেসরকারি স্কুল, মোটরসাইকেল, স্মার্টফোন এবং শহুরে জীবনধারার বিস্তারে এর বড় অবদান রয়েছে। তবে একই সঙ্গে এই কাঠামো দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে বলেও সমালোচনা বাড়ছে।
নেপালের অর্থনীতি এখন অনেকটা “রেমিট্যান্স-নির্ভর ভোগ অর্থনীতি” হিসেবে গড়ে উঠেছে। বিদেশ থেকে আসা অর্থ প্রধানত ভোগব্যয়, জমি-বাড়ি, আমদানিকৃত পণ্য এবং অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হচ্ছে। উৎপাদনশীল শিল্প, গবেষণা, প্রযুক্তি, কৃষির আধুনিকীকরণ বা রপ্তানিমুখী শিল্পে এর ব্যবহার খুবই সীমিত। ফলে আয় বাড়লেও শিল্প সক্ষমতার সম্প্রসারণ ঘটেনি। দেশের ভেতরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি দুর্বল থাকায় তরুণদের বিদেশমুখিতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনও মাথাপিছু আয়কে কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে তুলেছে। নেপালের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং বিপুল সংখ্যক যুবক বিদেশে চলে যাওয়ায় সক্রিয় জনসংখ্যাও অনেক ক্ষেত্রে হ্রাস পেয়েছে। যখন মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে যায়, তখন মাথাপিছু আয়ের হিসাবের ভাজক ছোট হয়ে যায় এবং গড় আয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেশি দেখায়। এর ফলে প্রকৃত অর্থনৈতিক বাস্তবতার তুলনায় পরিসংখ্যান বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়।
ভারত-এর সঙ্গে তুলনা করলে নেপালের দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারতে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি মূলত অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, তথ্যপ্রযুক্তি, উৎপাদন শিল্প, সেবা রপ্তানি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু আয়ের মধ্যে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। ভারত উৎপাদন, ডিজিটাল অর্থনীতি, স্টার্টআপ, জ্বালানি এবং শিল্প রপ্তানিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে কাঠামোগত রূপান্তর ঘটাচ্ছে। অন্যদিকে নেপাল এখনও আমদানিনির্ভর এবং সেবাকেন্দ্রিক ভোগ অর্থনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
নেপালের বর্তমান অর্থনৈতিক মডেল দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণও বটে। প্রথমত, ব্রেইন ড্রেইন দ্রুত বাড়ছে। দক্ষ জনশক্তি বিদেশে চলে যাওয়ায় দেশের ভেতরে উদ্ভাবন, গবেষণা এবং উদ্যোক্তা বিকাশের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। দ্বিতীয়ত, রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বহিরাগত ঝুঁকির সঙ্গে জড়িত। উপসাগরীয় দেশ বা অন্যান্য শ্রমবাজারে অর্থনৈতিক মন্দা, যুদ্ধ, অভিবাসন নীতির পরিবর্তন কিংবা প্রযুক্তিগত স্বয়ংক্রিয়তা নেপালি শ্রমিকদের চাহিদা কমিয়ে দিতে পারে। এতে নেপালের বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ ও ভোগব্যবস্থায় সরাসরি প্রভাব পড়বে। তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা না বাড়ায় বাণিজ্য ঘাটতি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমদানির তুলনায় রপ্তানি দুর্বল থাকায় অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নেপালকে এখন অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তন করতে হবে। শুধুমাত্র রেমিট্যান্সভিত্তিক আয় বৃদ্ধিকে উন্নয়নের সূচক হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এখন অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকীকরণ এবং দক্ষতাভিত্তিক মানবসম্পদ গঠনে জোর দিতে হবে।
নেপালের কৃষি, জলবিদ্যুৎ, পর্যটন এবং জীববৈচিত্র্যে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এসব খাত এখনও পর্যাপ্ত মূল্য সংযোজনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেনি। চা, কফি, মসলা, ভেষজ, ফলমূল এবং জৈব কৃষিপণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করে রপ্তানিমুখী শিল্প সম্প্রসারণ করা সম্ভব। একইভাবে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনকে শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে সীমাবদ্ধ না রেখে আঞ্চলিক জ্বালানি বাণিজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে।
পর্যটন খাতেও নতুন চিন্তাভাবনা প্রয়োজন। ঐতিহ্যগত ট্রেকিং ও পর্বতারোহণের পাশাপাশি বন্যপ্রাণী পর্যটন, স্বাস্থ্য ও সুস্থতা পর্যটন, সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা, শিক্ষা পর্যটন এবং অ্যাডভেঞ্চার কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। বিশ্ববাজারে “উচ্চমূল্যের পর্যটন” ধারণা যখন বিস্তৃত হচ্ছে, তখন নেপালকে মানসম্মত সেবা ও অনন্য অভিজ্ঞতা বিক্রি করতে সক্ষম হতে হবে।
একই সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করা জরুরি। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত সনদ উৎপাদন করছে, কিন্তু দক্ষতা ও উদ্ভাবন তৈরি করতে পারছে না। কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা ও উন্নয়ন, ডিজিটাল দক্ষতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ জ্বালানি এবং উদ্যোক্তা বিকাশকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, নেপালের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ইতিবাচক সংকেত হলেও একে প্রকৃত সমৃদ্ধির নির্দেশক হিসেবে দেখার আগে সতর্ক হওয়া দরকার। যদি আয় বৃদ্ধি মূলত বিদেশি শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তবে তা টেকসই উন্নয়ন নয়। দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির জন্য উৎপাদনশীল অর্থনীতি, দেশীয় কর্মসংস্থান, শিল্প রূপান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন অপরিহার্য। নেপাল এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে—হয় রেমিট্যান্সনির্ভর ভোগ অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নয়তো অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও উদ্ভাবনভিত্তিক টেকসই উন্নয়নের নতুন পথ বেছে নেবে।

About Author

Advertisement