কোলকাতা(বেবি চক্রবর্তী): ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে ভারতীয় জনতা পার্টি আজ এক প্রভাবশালী শক্তি। তবে এই দলের শিকড় বহু গভীরে প্রোথিত। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে জাতীয়তাবাদ, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিতে যে ধারার সূচনা হয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান স্থপতি ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী। তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ, সংগ্রাম এবং সংগঠন গঠনের ভাবনা থেকেই পরবর্তীকালে ভারতীয় জনসংঘ এবং পরে ভারতীয় জনতা পার্টির উত্থান ঘটে। বর্তমান সময়ে বিজেপি শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং ভারতের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই দীর্ঘ যাত্রাপথের ইতিহাস, আদর্শ এবং পরিবর্তনের ধারাই এখানে তুলে ধরা হল। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ, আইনজীবী এবং প্রখর জাতীয়তাবাদী নেতা।তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম মন্ত্রিসভায় শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন। তবে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর নীতির সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। বিশেষ করে কাশ্মীর নীতি এবং সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগ নিয়ে তিনি কংগ্রেস সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, ভারতকে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক জাতিরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এই ভাবনা থেকেই ১৯৫১ সালে ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় জনসংঘের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় সংস্কৃতি, হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবোধ এবং কেন্দ্রীয় ঐক্যের ভিত্তিতে রাজনীতি করা। জনসংঘের আদর্শিক ভিত্তি গড়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের দর্শনের উপর। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী “এক দেশ, এক সংবিধান, এক পতাকা” নীতির প্রবল সমর্থক ছিলেন।তিনি বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত জম্মু ও কাশ্মীরের বিরোধিতা করেন। সেই আন্দোলনের সময় ১৯৫৩ সালে কাশ্মীরে গ্রেফতার হন এবং রহস্যজনক পরিস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যু জনসংঘের মধ্যে এক আবেগপূর্ণ জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম দেয়। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মৃত্যুর পর দীনদয়াল উপাধ্যায় জনসংঘের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। তিনি “একাত্ম মানববাদ”-এর ধারণা দেন। তাঁর মতে, পশ্চিমা পুঁজিবাদ কিংবা সমাজতন্ত্র—কোনোটিই ভারতের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভারতের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কাঠামোর ভিত্তিতে উন্নয়নের পথ খুঁজতে হবে।এই সময় জনসংঘ ধীরে ধীরে উত্তর ভারত-সহ বিভিন্ন অঞ্চলে সংগঠন বিস্তার করতে শুরু করে। যদিও তখনও দলটি জাতীয় রাজনীতিতে প্রধান শক্তি হয়ে ওঠেনি, তবুও তাদের আদর্শিক ভিত্তি ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছিল।
১৯৭৫ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর উপর কঠোর দমননীতি চালানো হয়। জনসংঘের বহু নেতা গ্রেফতার হন। এই সময় গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে জনসংঘ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জরুরি অবস্থার পর ১৯৭৭ সালে বিভিন্ন বিরোধী দল একত্রিত হয়ে জনতা পার্টি গঠন করে। জনসংঘও তার সঙ্গে যুক্ত হয়।নির্বাচনে কংগ্রেস পরাজিত হয় এবং প্রথমবার কেন্দ্রে অ-কংগ্রেস সরকার গঠিত হয়। তবে মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিতর্কের কারণে জনতা পার্টি ভেঙে যায়। এরপর ১৯৮০ সালে ভারতীয় জনতা পার্টির জন্ম হয়। ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত বিজেপির প্রথম সভাপতি ছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। শুরুতে দল “গান্ধীয় সমাজতন্ত্র”-এর কথা বললেও পরে আরও স্পষ্টভাবে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি মাত্র দুটি আসন পায়। কিন্তু এই পরাজয়ই দলকে নতুন রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে।লালকৃষ্ণ আডবাণীর নেতৃত্বে বিজেপি রাম জন্মভূমি আন্দোলনকে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে সামনে আনে। ১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দশকে অযোধ্যার রামমন্দির আন্দোলন বিজেপির রাজনৈতিক উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিজেপি দাবি করে, অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের স্থানে প্রাচীন রামমন্দির ছিল।১৯৯০ সালে আডবাণীর রথযাত্রা দেশজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এর ফলে বিজেপির জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। যদিও এই আন্দোলনের ফলে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাও বৃদ্ধি পায়। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংস ভারতের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। এরপর বিজেপি উত্তর ভারতের বহু রাজ্যে শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং জাতীয় রাজনীতিতে প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয়।
১৯৯৮ সালে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসে এবং অটলবিহারী বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর নেতৃত্বে বিজেপি তুলনামূলকভাবে উদার ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক ভাবমূর্তি গড়ে তোলে। এই সময় ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষা, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে অগ্রগতি ঘটে।পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টাও দেখা যায়। যদিও কার্গিল যুদ্ধ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকট সরকারকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। বাজপেয়ী ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি জোট রাজনীতিকে সফলভাবে পরিচালনা করেছিলেন। তাঁর সময় বিজেপি কেবল হিন্দুত্ববাদী দল নয়, উন্নয়নমুখী জাতীয় দল হিসেবেও পরিচিতি পেতে শুরু করে।
২০০৪ সালে বিজেপি ক্ষমতা হারায়। এরপর দল সাংগঠনিক পুনর্গঠনের দিকে মনোযোগ দেয়। এই সময় নরেন্দ্র মোদী গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে জাতীয় স্তরে পরিচিতি পান।২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি বিপুল জয় অর্জন করে। “উন্নয়ন”, “দুর্নীতিমুক্ত সরকার” এবং শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলে। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার কোনও অ-কংগ্রেস দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বর্তমানে বিজেপি ভারতের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক দল। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে দল জাতীয়তাবাদ, উন্নয়ন এবং শক্তিশালী কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সমন্বয় ঘটিয়েছে। বর্তমান বিজেপি রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে হিন্দুত্ব ও সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ, উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক প্রকল্প, শক্তিশালী কেন্দ্রীভূত নেতৃত্ব এবং বিরোধীদের সমালোচনার মুখে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় রাখা।রামমন্দির নির্মাণ, কাশ্মীরের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে আলোচনা বিজেপির রাজনৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উঠে এসেছে। একইসঙ্গে “ডিজিটাল ইন্ডিয়া”, “মেক ইন ইন্ডিয়া”, “উজ্জ্বলা যোজনা”-সহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রভাব ফেলেছে। তবে বিরোধীরা বিজেপির বিরুদ্ধে ধর্মীয় মেরুকরণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকোচন এবং কেন্দ্রীয় সংস্থার রাজনৈতিক ব্যবহারের অভিযোগ তোলে। বিজেপি অবশ্য দাবি করে, তারা জাতীয় নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের স্বার্থেই কাজ করছে। একসময় পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রভাব খুব সীমিত ছিল। কিন্তু গত এক দশকে দল দ্রুত শক্তি বৃদ্ধি করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে বিজেপি উঠে এসেছে।জাতীয়তাবাদ, হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক এবং সাংগঠনিক বিস্তারের মাধ্যমে বিজেপি বাংলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। যদিও এখনও তারা রাজ্যে ক্ষমতায় আসতে পারেনি, তবুও ভোটের শতাংশ এবং সাংগঠনিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বিজেপি শুধু ভারতের নয়, বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম। দলটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলেছে।

তরুণ ভোটার, প্রযুক্তিনির্ভর প্রচার এবং শক্তিশালী সংগঠন তাদের বড় শক্তি।তবে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, সামাজিক সম্প্রীতি এবং আঞ্চলিক রাজনীতির মতো বিষয় বিজেপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। একইসঙ্গে বিরোধী জোটের শক্তি এবং গণতান্ত্রিক ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর হাতে যে রাজনৈতিক বীজ রোপিত হয়েছিল, তা আজ বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। ভারতীয় জনসংঘ থেকে বিজেপির বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানো শুধুমাত্র একটি দলের ইতিহাস নয়; এটি স্বাধীনোত্তর ভারতের রাজনৈতিক পরিবর্তনেরও প্রতিচ্ছবি।এই দীর্ঘ যাত্রাপথে আদর্শ, আন্দোলন, সাংগঠনিক শক্তি, নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বিজেপি আজ ভারতের রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করলেও তার পথচলা এখনও অব্যাহত। ভবিষ্যতে এই দল ভারতের গণতন্ত্র, সমাজ এবং রাষ্ট্রনীতিকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, সেটাই আগামী দিনের অন্যতম বড় প্রশ্ন।










