বেবি চক্রবর্ত্তী
‘ভারতের স্বাধীন মাটিতে’– কথাটি এখানে ব্যাখ্যার বিষয়, কারণ সে সময় ওই এলাকা জাপানি ও আইএনএ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এলেও আন্তর্জাতিকভাবে ব্রিটিশ ভারতের অংশই ছিল।
কর্নেল শওকত আলি মালিক: ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রথম আজাদ হিন্দ ফৌজের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ইতিহাস।ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এমন বহু অধ্যায় রয়েছে, যা মূলধারার আলোচনায় খুব বেশি স্থান পায় না। স্বাধীনতার ইতিহাস বলতে সাধারণত অহিংস আন্দোলন, সত্যাগ্রহ কিংবা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের কথাই বেশি উচ্চারিত হয়। কিন্তু একই সঙ্গে সশস্ত্র সংগ্রামের এক গৌরবময় ধারা ছিল, যার অন্যতম প্রধান সংগঠন ছিল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন আজাদ হিন্দ ফৌজ বা ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (আইএনএ)। এই বাহিনীর বীর সেনানায়কদের মধ্যে কর্নেল শওকত আলি মালিকের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। কারণ তিনিই ১৯৪৪ সালের ১৪ এপ্রিল মণিপুরের মইরাংয়ে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রথম আজাদ হিন্দ সরকারের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন।
এই ঘটনা শুধু একটি পতাকা উত্তোলনের আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; এটি ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার প্রত্যয়ের এক ঐতিহাসিক ঘোষণা। এটি ভারতীয়দের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল এবং স্বাধীনতার সংগ্রামকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল।

শওকত আলি মালিক কে ছিলেন:-
কর্নেল শওকত আলি মালিক ছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের একজন সাহসী অফিসার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বহু ভারতীয় সৈন্য ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে জাপানের হাতে যুদ্ধবন্দী হন। তাঁদের অনেকেই পরে নেতাজির আহ্বানে সাড়া দিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগ দেন। শওকত আলি মালিকও তাঁদের অন্যতম।
সামরিক দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণ এবং অসীম সাহসিকতার জন্য তিনি দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব লাভ করেন। নেতাজি তাঁর প্রতি গভীর আস্থা রাখতেন। বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) সীমান্ত থেকে ভারতের দিকে অগ্রসর হওয়ার অভিযানে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়া হয়।
আজাদ হিন্দ ফৌজের লক্ষ্য:-
১৯৪৩ সালে সিঙ্গাপুরে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন ভারত প্রতিষ্ঠা করা।
আজাদ হিন্দ ফৌজের মূল স্লোগান ছিল— “চলো দিল্লি”— এই আহ্বান শুধু একটি সামরিক অভিযান নয়; এটি ছিল সমগ্র ভারতবাসীর উদ্দেশে স্বাধীনতার ডাক।
জাপানের সহায়তায় আজাদ হিন্দ ফৌজ উত্তর-পূর্ব ভারতের দিকে অগ্রসর হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল ভারতের মাটিতে প্রবেশ করে ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া।
মইরাং অভিযানের পটভূমি:-
১৯৪৪ সালের শুরুতে ইম্ফল-কোহিমা অভিযান শুরু হয়। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত।
জাপানি বাহিনী ও আজাদ হিন্দ ফৌজ যৌথভাবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রবেশ করে। বহু সংঘর্ষের পর তারা মণিপুরের মইরাং অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।
মইরাং ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। এখানেই ইতিহাস সৃষ্টি করেন কর্নেল শওকত আলি মালিক।
১৪ এপ্রিল ১৯৪৪ সালে ইতিহাসের সেই দিন:-
১৯৪৪ সালের ১৪ এপ্রিল।মণিপুরের মইরাংয়ে স্থানীয় মানুষের উপস্থিতিতে কর্নেল শওকত আলি মালিক আজাদ হিন্দ সরকারের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।
এই পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে তিনি ঘোষণা করেন যে এই অঞ্চল আজাদ হিন্দ সরকারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে এসেছে।এই মুহূর্তটি ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক।
প্রথমবারের মতো ভারতীয় ভূখণ্ডে নেতাজির আজাদ হিন্দ সরকারের পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উড়েছিল।
পতাকার প্রতীকী গুরুত্ব:-
একটি পতাকা শুধু কাপড়ের টুকরো নয়।এটি একটি জাতির আশা, আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীনতার প্রতীক।মইরাংয়ে পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতবাসীকে জানিয়ে দেয়—
স্বাধীনতা কেবল স্বপ্ন নয়; সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে তা অর্জন করা সম্ভব।এই ঘটনা স্বাধীনতার আন্দোলনে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।
সেই সময় স্থানীয় মানুষের ভূমিকা:-
মণিপুরের সাধারণ মানুষ আজাদ হিন্দ ফৌজকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছিলেন।তাঁরা খাদ্য, আশ্রয় এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন।
অনেক স্থানীয় যুবকও আজাদ হিন্দ ফৌজের কর্মকাণ্ডে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। এই কারণে মইরাং শুধু একটি যুদ্ধক্ষেত্র নয়; এটি স্বাধীনতার সংগ্রামে জনগণের অংশগ্রহণেরও প্রতীক।
নেতাজির প্রতিক্রিয়া:-
মইরাংয়ে পতাকা উত্তোলনের সংবাদ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর কাছে পৌঁছালে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হন।
তিনি এই ঘটনাকে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করেন।
শওকত আলি মালিকের সাহসিকতার প্রশংসা করে তাঁকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়।
কেন এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ:-
মইরাংয়ের পতাকা উত্তোলনের গুরুত্ব কয়েকটি কারণে অনন্য।
প্রথমত, এটি ছিল ভারতীয় ভূখণ্ডে আজাদ হিন্দ সরকারের উপস্থিতির বাস্তব প্রকাশ।
দ্বিতীয়ত, এটি প্রমাণ করে যে ব্রিটিশ শাসন অপ্রতিরোধ্য নয়।
তৃতীয়ত, এটি ভারতীয়দের মনে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে যে স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব।
চতুর্থত, এই ঘটনা ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়।
ইম্ফল অভিযানের পরিণতি:-
যদিও আজাদ হিন্দ ফৌজ ও জাপানি বাহিনী প্রথম দিকে সাফল্য অর্জন করেছিল, পরে পরিস্থিতি বদলে যায়।
রসদের অভাব, বর্ষাকাল, রোগব্যাধি এবং মিত্রবাহিনীর শক্তিশালী পাল্টা আক্রমণের কারণে ইম্ফল অভিযান ব্যর্থ হয়।
আজাদ হিন্দ ফৌজকে পিছু হটতে বাধ্য হতে হয়।তবে সামরিক ব্যর্থতা সত্ত্বেও মইরাংয়ের পতাকা উত্তোলন ইতিহাসে অমর হয়ে থাকে।
স্বাধীনতার ওপর প্রভাব:-
আজাদ হিন্দ ফৌজের সামরিক অভিযান এবং পরবর্তী আইএনএ বিচার ভারতীয় সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
১৯৪৫ সালে দিল্লির লালকেল্লায় আইএনএ-র অফিসারদের বিচার শুরু হলে দেশজুড়ে প্রতিবাদ গড়ে ওঠে।
ভারতীয় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর অনেক সদস্যের মধ্যেও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষ করে ১৯৪৬ সালের রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভির বিদ্রোহ ব্রিটিশ সরকারকে বুঝিয়ে দেয় যে ভারতকে আর দীর্ঘদিন দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রভাব ব্রিটিশদের ভারত ছাড়ার সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
কেন শওকত আলি মালিক আলোচনার বাইরে:-
স্বাধীনতার ইতিহাসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নাম সুপরিচিত হলেও তাঁর অনেক সহযোদ্ধার অবদান তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত।
কর্নেল শওকত আলি মালিক তাঁদেরই একজন।
এর কারণ হতে পারে—- স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন আজাদ হিন্দ ফৌজের ইতিহাস পর্যাপ্ত গুরুত্ব না পাওয়া। মূলধারার ইতিহাসচর্চায় সশস্ত্র সংগ্রামের তুলনামূলক কম আলোচনা।
তবুও সাম্প্রতিক সময়ে গবেষকরা তাঁর অবদান নতুন করে তুলে ধরছেন।
মইরাং আজও ইতিহাসের সাক্ষী :-
বর্তমানে মণিপুরের মইরাংয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে।
সেখানে একটি আইএনএ স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘর রয়েছে, যেখানে নেতাজি, আজাদ হিন্দ ফৌজ এবং কর্নেল শওকত আলি মালিকের অবদান তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবছর ১৪ এপ্রিল সেখানে ঐতিহাসিক পতাকা উত্তোলনের স্মরণে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়।
ইতিহাস কেবল বিজয়ীদের গল্প নয়; ইতিহাস সাহস, আত্মত্যাগ এবং আদর্শেরও দলিল।
কর্নেল শওকত আলি মালিকের পতাকা উত্তোলন হয়তো স্বাধীনতা সঙ্গে সঙ্গে এনে দিতে পারেনি, কিন্তু এটি ভারতীয়দের মনে স্বাধীনতার বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছিল।
আজও সেই পতাকা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতার জন্য বহু পরিচিত-অপরিচিত মানুষের আত্মত্যাগ রয়েছে।
১৯৪৪ সালের ১৪ এপ্রিল মণিপুরের মইরাংয়ে কর্নেল শওকত আলি মালিকের হাতে আজাদ হিন্দ সরকারের জাতীয় পতাকা উত্তোলন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। এটি ছিল শুধু একটি সামরিক সাফল্যের প্রতীক নয়; বরং স্বাধীন ভারতের স্বপ্নকে বাস্তবের মাটিতে প্রতিষ্ঠার এক সাহসী ঘোষণা। যদিও পরবর্তী সময়ে সামরিক পরিস্থিতি বদলে যায় এবং আজাদ হিন্দ ফৌজকে পিছু হটতে হয়, তবুও মইরাংয়ের সেই পতাকা ইতিহাসে অম্লান হয়ে আছে।
কর্নেল শওকত আলি মালিকের অবদান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে অসংখ্য বীরের আত্মত্যাগ জড়িয়ে আছে। তাঁদের অনেকের নাম ইতিহাসের পাতায় তুলনামূলকভাবে কম উচ্চারিত হলেও তাঁদের কর্ম ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাই স্বাধীনতার ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নে শওকত আলি মালিকের নাম সম্মানের সঙ্গে উচ্চারণ করা উচিত। তাঁর হাতে উত্তোলিত সেই পতাকা ছিল স্বাধীন ভারতের প্রত্যাশা, সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার এক অমর প্রতীক।










