কলকাতা: তৃণমূল জামানার নেতারা কেউ তোলাবাজির জন্য গ্রেফতার, কেউ বা আবার শ্লীলতাহানির মামলায়। সব মিলিয়ে তৃণমূলের অন্দরে বিড়ম্বনার শেষ নেই। তার মধ্যেই সামনে এলে কেজি কেজি সোনার ছবি। রাতভর তল্লাশি চালিয়ে তৃণমূল নেত্রীর বাড়ি থেকে তিন কেজি সোনা উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ সূত্রে খবর, তৃণমূল নেতা তথা বিধাননগর পুরনিগমের চেয়ারপার্সন সব্যসাচী দত্তের বিরুদ্ধে তদন্ত চালাতে গিয়েই উদ্ধার হয়েছে সেই সোনা।
প্রসঙ্গত, গত ৮ জুন তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার হন সব্যসাচী দত্ত। এদিকে মঙ্গলবার তাঁর পুলিশ হেফাজতের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। আর এরই মধ্যে নতুন তথ্য সামনে এল। জানা গিয়েছে, সব্যসাচীকে সঙ্গে নিয়ে নদিয়ার তেহট্ট ও করিমপুরে তল্লাশি চালায় বিধাননগর উত্তর থানার পুলিশ। তল্লাশি চলে তৃণমূল নেত্রী তথা সব্যসাচী ঘনিষ্ঠ টিনা ভৌমিক সাহার বাপের বাড়ি ও শ্বশুর বাড়িতেও।
পুলিশ সূত্রে খবর, দিনকয়েক আগেই ধৃত সব্যসাচীর বাড়ি থেকে ৫০ কেজি সোনা কেনার রশিদ মিলেছে। তারপরই শুরু হয় তল্লাশি। এরপর তদন্তে উঠে আসে সব্যসাচীর টাকাতেই ওই সোনা কিনে রাখা ছিল টিনার বাড়িতে। জিজ্ঞাসাবাদে এই তথ্য জানতে পেরেই সব্যসাচীকে নিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। টিনার দুই বাড়ি থেকে তিন কেজি অর্থাৎ প্রায় ৪ কোটি টাকার থেকে বেশি মূল্যের সোনা উদ্ধার করা হয়। বিধাননগর উত্তর থানার তরফে যে ছবি দেখানো হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, শাঁখা বাঁধানো, পলা বাঁধানো, চওড়া হার, চুড়ি, লকেট, চূড় সবই রয়েছে।এছাড়াও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বেশ কিছু জমির কাগজপত্র। এরপরই বৃহস্পতিবার টিনাকে বিধাননগর থানায় সশরীরে হাজিরার নোটিস দেওয়া হয়।
এই প্রসঙ্গে বলে রাখা শ্রেয়, নদিয়া জেলা পরিষদের সদস্য এই টিনা সাহা ভৌমিক। এছাড়া নদিয়া জেলায় তৃণমূলের বঙ্গজননীর সভানেত্রী ছিলেন তিনি। সব্যসাচীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলে জানা যায়। বিধায়ক তাপস সাহার সঙ্গে টিনার দ্বন্দ্ব ছিল বলেও চর্চা রয়েছে। বিধায়কের অভিযোগ, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে বেশ কয়েকজনকে চাকরি দিয়েছিলেন এই টিনা। তবে এই ঘটনায় তৃণমূল নেত্রীর দাবি, রাজনৈতিক কারণে এই ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। রাজনৈতিক সম্পর্ক ছাড়া সব্যসাচী দত্তর সঙ্গে তাঁদের আর কোনও সম্পর্ক নেই। ২০২৫ সালে পরিচয় বলে জানান টিনা। বার চারেক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়েছেন সব্যসাচী দত্ত। টিনার অভিযোগ, তাঁর মা, ভাইয়ের স্ত্রী সহ পরিবারের সাত মহিলার সব গয়না বাজেয়াপ্ত করেছে। তিনি আইনি পথে হাঁটবেন।
এদিকে সল্টলেকের এক ব্যবসায়ীর কাছে থেকে ১ কোটি টাকার বেশি তোলাবাজির অভিযোগ ওঠে সব্যসাচী দত্তর বিরুদ্ধে। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতেই গ্রেফতার করা হয় বিধাননগর পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যানকে। অভিযোগকারী ব্যবসায়ী মধুসূদন চক্রবর্তী জানিয়েছিলেন, আমার কাছে উনি এই আড়াই লক্ষ টাকার পরে ১ কোটি টাকা ওঁর (সব্যসাচী দত্তর)ওঁর রোজ বায়না ছিল। বাড়ি করতে গেলে টাকা দিতে হবে। বাড়ি ভাঙতে গেলে টাকা দিতে হবে। বাড়ি কিনতে গেলে টাকা দিতে হবে। বেচতে গেলে টাকা দিতে হবে। না দিলে মারবে।’ যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে বিধাননগর পুরসভার ধৃত তৃণমূল নেতা ও প্রাক্তন চেয়ারম্যান সব্যসাচী দত্ত বলেছিলেন, ১ টাকা যদি কোনও দিন আমাকে দিয়ে থাকে, প্রমাণ করতে পারে, আমাকে ফাঁসি কাঠে দিয়ে দিক, আমি রাজি আছি। পুরোটাই ফলস, ফেব্রিকেটেড।’
তোলাবাজিকাণ্ডে প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সব্যসাচী দত্ত গ্রেফতার হতেই খুলে গেছে প্যান্ডোরার বাক্স। বেরিয়ে আসছে একের পর এক অভিযোগ। ইতিমধ্যে একাধিক অডিও সামনে এনেছেন অভিযোগকারী। শুনানিতে সরকারি আইনজীবী বলেন, কিছু অডিও-ভিডিও ক্লিপ পাওয়া গেছে।যেখানে টাকা চেয়ে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে – না দিলে বিপদ হবে। এই ঘটনায় আরও ৫-৬ জড়িত। যাঁরা সব্যসাচীর হয়ে তোলাবাজির টাকা তুলতেন। এদিকে পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃত তৃণমূল নেতা সব্যসাচী দত্তর ৫টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে।ফিক্সড ডিপোজিট সহ সেখানে জমা রয়েছে ৩ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা। হদিশ মেলে ৫ কোটির সম্পত্তির। পুলিশ সূত্রে দাবি, রাজারহাটের যে ফ্ল্যাটে সব্যসাচী দত্ত থাকেন, সেই বহুতলের ১০ তলায় বেনামে নামে কেনা একটি ফ্ল্যাটের হদিশ মিলেছে। তদন্তকারীদের অনুমান, আরও সম্পত্তির হদিশ মিলতে পারে।
এবার বারাসাত থেকে তৃণমূলের হয়ে ভোটে লড়েন সব্যসাচী দত্ত, বিজেপির কাছে পরাজিত হন তিনি।











