যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম জিন থেরাপি শ্রবণশক্তির ওষুধ: দৌড়ে ভারতও

IMG-20260506-WA0055

নয়াদিল্লি(দেবেন্দ্র কে ঢুংগানা): যুক্তরাষ্ট্রে জেনেটিক (বংশগত) শ্রবণশক্তি হারানোর সমস্যার চিকিৎসার জন্য বিশ্বের প্রথম জিন থেরাপি ওষুধ ‘ওটারমেনি (Otarmeni)’ ২৩ এপ্রিল নিয়ন্ত্রক অনুমোদন পেয়েছে। এই ওষুধটি আমেরিকান বায়োফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি রেজেনেরন (Regeneron) তৈরি করেছে। এই সাফল্যকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটি বড় বিপ্লব হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এটি প্রথমবারের মতো কিছু ধরনের বংশগত বধিরতা নিরাময়ের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে।
ওটারমেনি কীভাবে কাজ করে?
এই ওষুধটি মূলত ওটিওএফ জিনে হওয়া পরিবর্তন (মিউটেশন) জনিত শ্রবণ সমস্যার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় এই জিন “অটোফেরলিন” নামক প্রোটিন তৈরি করে, যা কান থেকে আসা শব্দ সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। কিন্তু জিনটি বিকল হলে কান শব্দ অনুভব করলেও সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছায় না, ফলে ব্যক্তি শুনতে অক্ষম হয়ে পড়ে।
ওটারমেনি কানের ভেতরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সরাসরি প্রবেশ করানো হয়। এতে অ্যাডেনো-অ্যাসোসিয়েটেড ভাইরাস ব্যবহার করে সুস্থ ওটিওএফ জিন কানের ভেতরে পৌঁছে দেওয়া হয়। বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে “ডাবল AAV প্রযুক্তি” বলেন, যেখানে জিনের দুইটি অংশ যুক্ত করে সক্রিয় করা হয়।
ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৮০ শতাংশ রোগীর শ্রবণশক্তিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে। কিছু শিশু প্রথমবার তাদের মায়ের কণ্ঠ শুনতে পেরেছে, সংগীতে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে এবং স্বাভাবিক জীবনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
বিশ্ব ও ভারতে শ্রবণ সমস্যা:
বিশ্বজুড়ে জন্মগত শ্রবণহানির প্রায় ২–৮ শতাংশ ঘটনা ওটিওএফ জিনের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা প্রায় ২ লক্ষ মানুষকে প্রভাবিত করে।
ভারতে প্রায় ৬.৩ কোটি মানুষ শ্রবণ সমস্যায় আক্রান্ত। এখানে প্রতি ১,০০০ জন্মে ৪–৬ জন শিশু জন্মগত বধিরতা নিয়ে জন্মায়, যা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে ৫০–৬০ শতাংশ জন্মগত শ্রবণহানির কারণ জেনেটিক।
এখানে জিজেবি২ জিনও বধিরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিছু অঞ্চলে আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ (কনসাঙ্গুইনিয়াস ম্যারেজ) এর কারণে জেনেটিক রোগের হার বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভারতে পরীক্ষা ও চ্যালেঞ্জ:
ভারতে এখনও নবজাতক শিশুদের শ্রবণ পরীক্ষা জাতীয় পর্যায়ে বাধ্যতামূলক নয়। কেবল কর্ণাটক, তামিলনাড়ু ও মহারাষ্ট্রের মতো কিছু রাজ্যে আংশিকভাবে এই কর্মসূচি চালু আছে। ফলে দেশে স্ক্রিনিং কভারেজ ২০ শতাংশেরও কম, যেখানে আমেরিকা ও ইউরোপে এটি ৮৫–৯৭ শতাংশ পর্যন্ত।
শ্রবণ পরীক্ষার জন্য অটোঅ্যাকোস্টিক এমিশন এবং বেরা (ব্রেনস্টেম ইভোকড রেসপন্স অডিওমেট্রি) প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। তবে প্রকৃত জেনেটিক কারণ নির্ধারণ করতে জিন পরীক্ষা প্রয়োজন, যার খরচ ৮,০০০ থেকে ৪০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এটি গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
জিন থেরাপির সম্ভাবনা ও ভারতের অবস্থা:
বিশেষজ্ঞদের মতে, জিন থেরাপি সব ধরনের শ্রবণ সমস্যার জন্য কার্যকর নয়। এটি মূলত ওটিওএফ-এর মতো নির্দিষ্ট জিন সমস্যায় বেশি কার্যকর। অন্যান্য জিন সম্পর্কিত জটিলতা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।
ভারতে জিন থেরাপি বর্তমানে প্রধানত রক্তজনিত রোগ—থ্যালাসেমিয়া, হিমোফিলিয়া ও সিকেল সেল অ্যানিমিয়া—কেন্দ্রিক। সিকেল সেল রোগ দেশে একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা হওয়ায় এই ক্ষেত্রে গবেষণা দ্রুত এগোচ্ছে।
সিএমসি ভেল্লোরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি হিমোফিলিয়া এ-এর জন্য সফল জিন থেরাপি পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। অন্যদিকে সিএসআইআর-আইজিআইবি ‘বিরসা-১০১’ নামে সিকেল সেল রোগের জন্য ক্রিস্পার-ভিত্তিক থেরাপি তৈরি করেছে, যা এখনও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্যায়ে রয়েছে।
উপসংহার:
ওটারমেনির সাফল্য চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে, যেখানে জেনেটিক বধিরতা চিকিৎসার আশা জেগেছে। তবে ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখনও প্রাথমিক স্ক্রিনিং, জিন পরীক্ষার সহজলভ্যতা এবং গবেষণা অবকাঠামোর উন্নয়ন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক নীতি, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে গুরুত্ব দিলে ভারতও ভবিষ্যতে জিন থেরাপির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করতে পারবে।

About Author

Advertisement