নানা পাটেকর: পর্দার বিদ্রোহী কণ্ঠ নীরব হলে ভারতীয় সিনেমা হারাল এক যুগ

nana-patekar-5-1791446399

দেবেন্দ্র কে. ঢুঙ্গানা

ভারতীয় সিনেমায় এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাঁদের মৃত্যু কেবল একজন অভিনেতার প্রয়াণ নয়; বরং তা অভিনয়ের একটি পরম্পরার অবসানের মতো অনুভূত হয়। নানা পাটেকরের প্রয়াণে আজ ভারতীয় সিনেমা এবং তাঁর অসংখ্য দর্শক একই ধরনের শূন্যতার অনুভূতি করছেন। ৮ অক্টোবর, ২০২৬ সালে গোয়ায় নিজের বাসভবনে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাঁরা সফল হননি।
নানা পাটেকর শুধু ‘বলিউডের অভিনেতা’ ছিলেন না। তিনি ভারতীয় অভিনয়ের সেই ধারার প্রতিনিধি ছিলেন, যে ধারা নায়ককে শুধু সুন্দর মুখ, খলনায়ককে শুধু নিষ্ঠুর চরিত্র এবং সৈনিককে শুধু বন্দুক হাতে থাকা বীর হিসেবে উপস্থাপন করতে অস্বীকার করেছে। তিনি চরিত্রের ভেতরের মানুষটিকে খুঁজে নিয়েছিলেন। তাঁর রাগ, দুর্বলতা, যন্ত্রণা, অনিরাপত্তা, অহংকার, ভালোবাসা, অসহায়ত্ব এবং বিদ্রোহকে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন। তাই নানা পাটেকরের অভিনয় স্মরণ করলে তাঁর চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলোর আগে তাঁর কণ্ঠ, চোখের তীক্ষ্ণতা, মুখের টান এবং সংলাপ বলার অসাধারণ ভঙ্গিই স্মৃতিতে ভেসে ওঠে।
বিশ্বনাথ পাটেকর অর্থাৎ নানা পাটেকরের শিল্পীজীবন মোটেই সহজ ছিল না। মহারাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া নানা ছোটবেলাতেই কঠিন আর্থিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। পরিবারকে সাহায্য করার জন্য কৈশোরেই তাঁকে কাজ করতে হয়েছিল। তাঁর জীবন ছিল সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এক শিল্পীর কাহিনি। চলচ্চিত্রে আসার আগে রঙ্গমঞ্চ ও চিত্রকলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রযাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। এরপর সমান্তরাল সিনেমা, সামাজিক বিষয়ভিত্তিক চলচ্চিত্র, মূলধারার বাণিজ্যিক ছবি এবং হাস্যরসাত্মক চরিত্র—সব ক্ষেত্রেই তিনি তাঁর অভিনয়ের পরিসর বিস্তৃত করেছেন।
কিন্তু নানা পাটেকরকে কোনো একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ করা তাঁর শিল্পীসত্তাকে ছোট করে দেখা হবে। তিনি খলনায়ক হয়েছেন, কিন্তু প্রচলিত খলনায়কের কাঠামোর মধ্যে আটকে থাকেননি। তিনি নায়ক হয়েছেন, কিন্তু ঝলমলে ‘মসালা’ নায়কের আদল গ্রহণ করেননি। তিনি চরিত্রাভিনেতা হয়েছেন, কিন্তু পার্শ্বচরিত্রের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘তিরঙ্গা’, ‘আব তক ছাপ্পান’, ‘ওয়েলকাম’ এবং ‘নটসম্রাট’-এর মতো চলচ্চিত্রে তিনি নিজেকে নানা রঙে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর অভিনয়ের প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে পর্দায় কয়েক মিনিট উপস্থিত থাকা তাঁর কোনো চরিত্রও পুরো চলচ্চিত্রের আবেগঘন কাঠামো বদলে দিতে পারত। প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে হিন্দি ও মারাঠি—উভয় সিনেমাতেই তিনি গভীর ছাপ রেখে গেছেন।
‘ক্রান্তিবীর’-এর বিদ্রোহী প্রতাপ নারায়ণ তিলক হোক কিংবা ‘ওয়েলকাম’-এর হাস্যরসে ভরা চরিত্র—নানা পাটেকর অভিনয়কে শুধু সংলাপ বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর কণ্ঠস্বরই ছিল অভিনয়ের এক শক্তিশালী মাধ্যম। দীর্ঘ সংলাপ বলার সময় তিনি শুধু শব্দ উচ্চারণ করতেন না; শব্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকা রাগ, আবেগ ও অনুভূতিকে দর্শকদের কাছে পৌঁছে দিতেন। এ কারণেই তাঁর সংলাপ চলচ্চিত্রের গণ্ডি পেরিয়ে জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছিল।
তাঁর অভিনয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—নীরবতা। নানা পাটেকর শুধু চিৎকার করে প্রভাব সৃষ্টি করা অভিনেতা ছিলেন না। অনেক সময় তাঁর নীরব মুখ যে কথা বলত, তা শত শত শব্দের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠত। চোখে ফুটে ওঠা ক্রোধ, ঠোঁটের কাঁপন, মুখে জমে থাকা যন্ত্রণা এবং সংলাপের মাঝের দীর্ঘ বিরতির মাধ্যমে তিনি তাঁর চরিত্রের মনস্তত্ত্ব নির্মাণ করতেন। এ কারণেই তাঁর অভিনয়ে নাটকীয়তা থাকলেও কৃত্রিমতা কম অনুভূত হতো।
‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ তাঁর অভিনয় ও পরিচালনা—উভয় দিক থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি। সৈনিকজীবনকে পর্দায় বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরার জন্য তিনি মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রির সঙ্গে কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। এই প্রশিক্ষণ চলচ্চিত্রের সৈনিক চরিত্রকে শুধু পোশাক ও অস্ত্রের প্রদর্শনের মধ্যে আটকে রাখেনি; বরং তাকে শৃঙ্খলা, ভয়, কর্তব্য এবং মানসিক চাপের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
‘প্রহার’-এর মেজর ভি. এস. চভান কেবল দেশের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত এক আদর্শ সৈনিক নন। তিনি কঠোর, রাগী, শৃঙ্খলাপরায়ণ এবং নিজের কর্তব্যের প্রতি অবিচল। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর একজন সৈনিকের জীবন কোন পথে এগোয়—সেই প্রশ্নও চলচ্চিত্রটি তুলে ধরে। এখানেই নানা পাটেকরের অভিনয় এবং চলচ্চিত্রটির সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়। সৈনিককে শুধু জাতীয়তাবাদী স্লোগানের বাইরে এনে পরিবার, সম্পর্ক, আর্থিক চাপ এবং সামাজিক অবহেলার মধ্যে বেঁচে থাকা একজন মানুষ হিসেবে তুলে ধরা ‘প্রহার’-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
কিন্তু নানা পাটেকরের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক শুধু পর্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় তিনি সৈনিকদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে চেয়েছিলেন। তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজের কাছে অনুমতি চেয়ে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়েছিলেন। তাঁর পরবর্তী বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি প্রায় ৬০ দিন সৈনিকদের সঙ্গে ছিলেন এবং দ্রাস, লেহ, কুপওয়াড়া, বারামুলা ও সোপোরের মতো এলাকায় গিয়েছিলেন। তিনি কুইক রিঅ্যাকশন টিমের সঙ্গেও কাজ করার কথা জানিয়েছিলেন।
এই প্রসঙ্গ নানা পাটেকরের পর্দায় অভিনীত সৈনিক চরিত্র এবং বাস্তব জীবনে সৈনিকদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধার সম্পর্ককে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। চলচ্চিত্রের জন্য নেওয়া সামরিক প্রশিক্ষণ ছিল তাঁর অভিনয়ের প্রস্তুতি; কিন্তু কার্গিলের অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে। যুদ্ধক্ষেত্রে থাকার সময় তাঁর ওজনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল বলে তিনি জানিয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক পরবর্তী সময়ে টেরিটোরিয়াল আর্মি এবং মানদ লেফটেন্যান্ট কর্নেলের ভূমিকার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিল।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, নানা পাটেকরের প্রয়াণের সঙ্গে ভারতীয় সিনেমা শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতাকে হারায়নি; হারিয়েছে অভিনয়ের একটি স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি। আজকের ভারতীয় চলচ্চিত্রশিল্প অত্যন্ত বিশাল, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বাণিজ্যিক হয়ে উঠেছে। চলচ্চিত্র নির্মাণে ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট, ডিজিটাল প্রযুক্তি, বিপুল বাজেট এবং বৈশ্বিক বাজারের প্রভাব বেড়েছে। নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা অভিনয়ের নতুন নতুন শৈলীও তৈরি করছেন। কিন্তু নানা পাটেকরের প্রজন্ম অভিনয়ে যে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন, সংলাপের ওজন এবং চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা প্রতিষ্ঠা করেছিল, তা প্রতিস্থাপন করা সহজ হবে না।
আজ ভারতীয় সিনেমার সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জও এখানেই—তারকা-নির্ভর ব্যবস্থা থেকে কীভাবে শিল্পী-নির্ভর ব্যবস্থার দিকে এগোনো যায়? দর্শকদের শুধু বড় পর্দা, বড় বাজেট এবং বড় প্রচারের মাধ্যমে নয়, শক্তিশালী চরিত্র ও বিশ্বাসযোগ্য অভিনয়ের মাধ্যমে কীভাবে ধরে রাখা যায়? নানা পাটেকরের কর্মজীবন এর একটি সম্ভাব্য উত্তর দেয়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, একজন শিল্পীর জনপ্রিয়তা শুধু পর্দায় তাঁর উপস্থিতির সময়ের ওপর নির্ভর করে না; বরং দর্শকের স্মৃতি ও আবেগে তিনি কতটা গভীর ছাপ রেখে যেতে পারেন, তার ওপরও নির্ভর করে।
তাঁর মৃত্যুর পর ভারতীয় সিনেমায় যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে, তা তাই শুধু একজন শিল্পীর প্রতি আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়। এটি দর্শক ও শিল্পীর মধ্যে কয়েক দশক ধরে তৈরি হওয়া সম্পর্কের প্রকাশ। তাঁর চলচ্চিত্র দেখে বড় হয়ে ওঠা প্রজন্মের কাছে নানা পাটেকর শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন সংলাপের এক কণ্ঠস্বর, ক্রোধের এক মুখ এবং ভারতীয় সমাজের অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোকে পর্দায় তুলে ধরার এক মাধ্যম।
তিনি কখনও খলনায়কের অন্ধকার দিক তুলে ধরেছেন, কখনও নায়কের বিদ্রোহ, কখনও সৈনিকের শৃঙ্খলা, কখনও সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব এবং কখনও হাস্যরসের স্বাভাবিকতা। জাতীয় পুরস্কারের তিনটি সম্মান থেকে পদ্মশ্রী পর্যন্ত তাঁর অর্জন তাঁর শিল্পীজীবনের আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন করে, কিন্তু তাঁর প্রকৃত পুরস্কার হলো দর্শকের স্মৃতিতে বেঁচে থাকা সেইসব চরিত্র, যেগুলোকে তিনি জীবন্ত করে তুলেছিলেন।
নানা পাটেকর একবার শিল্পীর সৃজনশীল প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে নিজের ভেতরে প্রবেশ করতে দিতে হয়, কিছু সময় তাকে নিজের মধ্যে থাকতে দিতে হয় এবং পরে যখন তা চিন্তা ও অনুভূতির রূপ নেয়, তখন তাকে প্রকাশ করতে হয়। তাঁর অভিনয় দেখলে এই প্রক্রিয়াটিই যেন অনুভব করা যায়। তিনি চরিত্রকে বাইরে থেকে সাজাতেন না; চরিত্রকে নিজের ভেতরে প্রবেশ করতে দিতেন এবং তারপর তাকে পর্দায় তুলে ধরতেন।
ভারতীয় সিনেমাকে এখন নানা পাটেকরের অনুপস্থিতির সঙ্গে একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে—তিনি অভিনয়ের যে মানদণ্ড তৈরি করে গেছেন, নতুন প্রজন্ম কীভাবে তাকে আত্মস্থ করবে? তাঁর অনুকরণ করে নয়, বরং তাঁর মতো নিজের মৌলিক কণ্ঠস্বর খুঁজে নিয়ে। কারণ নানা পাটেকরের সবচেয়ে বড় অবদান শুধু তিনি কীভাবে অভিনয় করেছেন, তা নয়; তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হলো তিনি ভারতীয় সিনেমাকে দেখিয়েছেন, অভিনয়ের অর্থ কতটা গভীর ও বিস্তৃত হতে পারে।
পর্দায় গর্জে ওঠা তাঁর কণ্ঠস্বর আর শোনা যাবে না। কিন্তু ‘ক্রান্তিবীর’-এর বিদ্রোহ, ‘প্রহার’-এর সামরিক শৃঙ্খলা, ‘পরিন্দা’-র উত্তেজনা, ‘ওয়েলকাম’-এর হাস্যরস এবং তাঁর অসংখ্য চরিত্রের মধ্যে বেঁচে থাকা সেই স্বতন্ত্র অভিনয় ভারতীয় সিনেমার স্মৃতিতে দীর্ঘদিন জীবন্ত থাকবে। একজন শিল্পীর মৃত্যু তাঁর শরীরকে নীরব করে দিতে পারে; কিন্তু তাঁর শিল্প দর্শকের স্মৃতিতে কথা বলে যেতে থাকে। নানা পাটেকরের ক্ষেত্রেও এই সত্যই তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি হয়ে বেঁচে থাকবে।

About Author

Advertisement