সিকিমের জীবনরেখা এনএইচ-১০-এ ৯৯৩.৬৪ কোটি টাকার বিনিয়োগ

14c552e2-05ba-435e-845d-4d4315991643

গডকরির ঘোষণার সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ

নয়াদিল্লি(দেবেন্দ্র কে ঢুংগানা): ভারতের কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রী নিতিন গডকরি তাঁর ফেসবুকে সিকিমের প্রধান মহাসড়ক সম্পর্কে যে ঘোষণা করেছেন, তা হলো
“সিকিমে আমরা রংপো থেকে রানিপুল পর্যন্ত এনএইচ-১০-কে পাকা শোল্ডারসহ দুই-লেনের মহাসড়ক হিসেবে উন্নীত করার জন্য ৯৯৩.৬৪ কোটি টাকা অনুমোদন করেছি। এর মধ্যে সুড়ঙ্গ, ভায়াডাক্ট নির্মাণ এবং ভূমিধস ও ধসে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলির প্রতিকারের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই প্রকল্প গ্যাংটক এবং সমগ্র সিকিমে নিরাপদ, দ্রুত ও স্থিতিস্থাপক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। এর মধ্যে দুর্গম হিমালয়ী ভূপ্রকৃতির উপযোগী সুড়ঙ্গ, ভায়াডাক্ট, সেতু, কাট-অ্যান্ড-কভার অংশ এবং ব্যাপক ঢাল-সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকবে।
উন্নত করিডরটি পর্যটন, কৃষি, উদ্যানপালন এবং অত্যাবশ্যকীয় পণ্য পরিবহণকে উৎসাহিত করবে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা কর্মী ও সরবরাহের যাতায়াতের জন্য কৌশলগত যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করে সিকিমের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখবে।
“প্রগতির হাইওয়ে, গতিশক্তি”
সংশ্লেষণমূলক পর্যালোচনা ১. কেন এনএইচ-১০ সিকিমের জীবনরেখা?
সিকিমকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করা একমাত্র নির্ভরযোগ্য প্রধান সড়কপথ হলো এনএইচ-১০। শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটক পর্যন্ত বিস্তৃত এই মহাসড়কটি প্রতি বছর বর্ষাকালে তিস্তা নদীর বন্যা ও ভূমিধসের কারণে বহু সময় কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত বন্ধ থাকে। ২০২৩ সালের তিস্তা বন্যার পর সিকিম কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশের অন্যান্য অংশ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।
তাই ৯৯৩.৬৪ কোটি টাকার এই বিনিয়োগ শুধু রাস্তা প্রশস্ত করার কাজ নয়; বরং সিকিমের যোগাযোগ ও সরবরাহ ব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা-কবচ। ২. প্রযুক্তির নতুন চিন্তা: পাহাড় কাটা নয়, পাহাড়ের ভিতর দিয়ে পথ তৈরি
আগে পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করার ফলে পাহাড়ের ঢালের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতো এবং ভূমিধসের আশঙ্কা বেড়ে যেত। গডকরির ঘোষণায় উল্লেখ করা সুড়ঙ্গ, ভায়াডাক্ট এবং কাট-অ্যান্ড-কভার-এর মতো প্রযুক্তি হিমালয় অঞ্চলের জন্য তুলনামূলকভাবে উপযোগী নির্মাণ-পদ্ধতি হতে পারে।
পাহাড়ের ভিতর দিয়ে সুড়ঙ্গ নির্মাণ এবং গভীর উপত্যকায় সেতুর মতো ভায়াডাক্ট তৈরি করার ফলে পাহাড়ের ঢালের ওপর হস্তক্ষেপ কমানো সম্ভব এবং ভূমিধসের ঝুঁকি হ্রাসে সহায়তা করতে পারে। এই প্রযুক্তি নেপালের পার্বত্য মহাসড়কগুলির ক্ষেত্রেও শিক্ষণীয় হতে পারে। ৩. তিন স্তরে সম্ভাব্য সুফল
ক. অর্থনৈতিক সুফল:
সিকিমের অর্থনীতি পর্যটনের পাশাপাশি এলাচ, আদা, কমলালেবু ইত্যাদি কৃষি ও উদ্যানপালনজাত পণ্যের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। নিরাপদ দুই-লেনের সড়ক তৈরি হলে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাতে পারবে। উন্নত সড়ক যোগাযোগ পর্যটনকেও উৎসাহিত করতে পারে।
খ. কৌশলগত গুরুত্ব:
এই সড়কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জাতীয় নিরাপত্তা। সিকিমের উত্তর সীমান্ত চিনের তিব্বত অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত। নাথু লা ও ডোকলাম-এর মতো সংবেদনশীল এলাকায় সেনা এবং প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সড়ক যোগাযোগের বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। তাই এনএইচ-১০-এর শক্তিশালীকরণ ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
গ. গতিশক্তি পরিকল্পনার গতি:
এই প্রকল্প প্রধানমন্ত্রী গতিশক্তি পরিকল্পনার বৃহত্তর ধারণার সঙ্গে যুক্ত। এর উদ্দেশ্য হলো সড়ক, রেল ও বিমান পরিষেবাসহ বিভিন্ন পরিবহণ ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করে উন্নয়নের গতি বাড়ানো। “প্রগতির হাইওয়ে” ধরনের স্লোগান এই ভাবনারই প্রতীক।
উপসংহার
গডকরির এই ঘোষণা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে কেন্দ্রীয় সরকার সিকিমের মতো একটি হিমালয়ী রাজ্যকে শুধু একটি দূরবর্তী রাজ্য হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখছে।
৯৯৩.৬৪ কোটি টাকার এই সুড়ঙ্গ ও ভায়াডাক্ট-ভিত্তিক প্রকল্পটি যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে, প্রযুক্তিগত মানদণ্ড এবং প্রয়োজনীয় পরিবেশগত সতর্কতা বজায় রেখে সম্পন্ন হয়, তাহলে সিকিমের উন্নয়ন ও উন্নত সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি নতুন পথ খুলে দিতে পারে।

About Author

Advertisement