কাঠমান্ডু(দেবেন্দ্র কিশোর): নেপালে অর্থনৈতিক ও আর্থিক খাত সম্পর্কিত সমস্যা নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া সাধারণ নাগরিকরা দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ সুদের হার, অসম আচরণ, নিলাম প্রক্রিয়া, আইনি জটিলতা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থার উদাসীনতার কারণে ভোগান্তি সহ্য করে আসছেন। এই ভোগান্তিকেই সংগঠিত কণ্ঠে রূপ দিয়ে “রाष्ट्र, জাতীয়তা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও নাগরিক বাঁচাও মহাঅভিযান নেপাল” আবারও সরকারের ওপর পুরনো চুক্তি বাস্তবায়নের চাপ সৃষ্টি করেছে।
আজ কাঠমান্ডুর প্রধান জেলা কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে প্রদান করা স্মারকলিপিটি শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক নথি নয়, বরং রাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দেওয়া একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক সতর্কবার্তাও। অভিযানের কেন্দ্রীয় সভাপতি দুর্গা প্রসাই এবং বাগমতি অঞ্চল ও কাঠমান্ডু জেলা কমিটির প্রতিনিধিদের স্বাক্ষরিত এই স্মারকলিপিতে পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে করা চুক্তি বাস্তবায়ন এবং আর্থিক–বৈতনিক শোষণ বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে।
স্মারকলিপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো “১২ দফা চুক্তি”-র পুনরায় স্মরণ। সুসীলা কার্কি নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে করা ওই চুক্তিকে এই আন্দোলন তাদের সংগ্রামের একটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচনা করছে। এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—নেপালে কি সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতিও পরিবর্তিত হয়? যদি একটি সরকার নাগরিকদের সঙ্গে করা চুক্তি অন্য সরকার বাস্তবায়ন না করে, তবে জনগণের রাষ্ট্রের ওপর আস্থা কীভাবে বজায় থাকবে?
আন্দোলনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো “আর্থিক ও ব্যাংকিং শোষণ”। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা গেছে। ঋণগ্রহীতা নাগরিকদের অভিযোগ, ব্যাংকগুলো অস্বাভাবিক সুদের হার, জরিমানা এবং আইনি চাপের মাধ্যমে তাদের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে। তবে এই বিষয়টির আরেকটি দিকও রয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে গেলে তা পুরো অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সমাধান আবেগনির্ভর স্লোগানে নয়, বরং ন্যায্য ভারসাম্যের মাধ্যমে খুঁজতে হবে।
এখানেই রাষ্ট্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সরকার কেবল ব্যাংকের রক্ষক বা ঋণগ্রহীতার পক্ষের অবস্থানে থাকতে পারে না; তাকে উভয় পক্ষের মধ্যে ন্যায্য ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। ভুক্তভোগী নাগরিকদের বাস্তব সমস্যার মূল্যায়ন করে নীতি সংস্কার, সুদের হার পুনর্মূল্যায়ন, ঋণ পুনর্গঠন এবং মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আন্দোলনটি স্মারকলিপিতে “শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি”র হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাগরিকদের অসন্তোষ প্রকাশের অধিকার রয়েছে। তবে আন্দোলন সবসময় শেষ বিকল্প হওয়া উচিত। সরকার সময়মতো সংলাপে না বসলে অসন্তোষ রাস্তায় বিস্ফোরণের রূপ নিতে পারে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে।
এই ঘটনার মাধ্যমে আরেকটি রাজনৈতিক বার্তাও স্পষ্ট হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সংগঠন ও আন্দোলন থেকে “রাষ্ট্র জনগণের কথা শুনছে না”—এই অভিযোগ ক্রমাগত উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার যদি জনমত বুঝতে ব্যর্থ হয়, তবে অসন্তোষ বড় রাজনৈতিক রূপ নিতে পারে। তাই এই স্মারকলিপিকে শুধু চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে উপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
সমগ্রভাবে বলা যায়, এই আন্দোলন শুধু ঋণ বা ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা, ন্যায়ের অনুভূতি এবং নাগরিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত একটি বিষয়। সরকারের সঙ্গে করা চুক্তি বাস্তবায়ন গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার অংশ। যদি চুক্তিগুলো কেবল সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে ভবিষ্যতে যে কোনো সংলাপ ও সমঝোতার প্রতি জনগণের আস্থা কমে যাবে।
অতএব, বর্তমান সরকারের উচিত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে গুরুতর সংলাপ করে বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা। না ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাগামছাড়া হতে দেওয়া যায়, না পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলার মতো আবেগনির্ভর রাজনীতি গ্রহণযোগ্য। প্রয়োজন—ন্যায়, সংবেদনশীলতা এবং দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় আচরণ। এ পথেই ভুক্তভোগী নাগরিকদের আস্থা এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা উভয়ই রক্ষা করা সম্ভব।











