গর্ভাবস্থায় বিরল হৃদরোগের চিকিৎসায় মা ও যমজ সন্তানের প্রাণ রক্ষা‎

IMG-20260514-WA0082

কলকাতা: সময়ের সঙ্গে লড়াই করে এক অন্তঃসত্ত্বা তরুণীর জীবন বাঁচিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন নজির গড়ল মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাস। জটিল ও বিরল হৃদ্‌রোগজনিত সমস্যায় আক্রান্ত ২৬ বছর বয়সি এক গর্ভবতী মহিলার সফল চিকিৎসা করে শুধু মায়ের জীবনই রক্ষা করা হয়নি, সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হয়েছে তাঁর গর্ভস্থ যমজ সন্তানের জীবনও।
‎ভাগলপুরের বাসিন্দা রোজি কুমারী গর্ভাবস্থার ২৪তম সপ্তাহে গুরুতর হৃদ্‌যন্ত্র বিকলতার সমস্যায় আক্রান্ত হন। তিনি হৃদ্‌রোগের অত্যন্ত সংকটজনক স্তরে পৌঁছে গিয়েছিলেন এবং বিশ্রামের সময়ও মারাত্মক শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। পরীক্ষায় ধরা পড়ে তাঁর হৃদ্‌যন্ত্রের মাইট্রাল ভালভ অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছে, যাকে রিউম্যাটিক মাইট্রাল স্টেনোসিস বলা হয়। পাশাপাশি ফুসফুসের রক্তচাপও বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। ফলে মা ও গর্ভস্থ দুই শিশুর জীবনই চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে।
‎এই অবস্থায় মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাস-এর ডিরেক্টর ক্যাথ ল্যাব ও প্রবীণ ইন্টারভেনশনাল হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ দিলীপ কুমারের নেতৃত্বে বহুবিভাগীয় চিকিৎসক দল জরুরি ভিত্তিতে ‘বেলুন মাইট্রাল ভালভোটমি’ নামে একটি জটিল চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। এই আধুনিক ক্যাথেটার-ভিত্তিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংকীর্ণ হৃদ্‌যন্ত্রের ভালভ প্রসারিত করে স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা হয়।
‎চিকিৎসকরা জানান, যমজ গর্ভাবস্থায় হৃদ্‌যন্ত্রের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। তার সঙ্গে যদি হৃদ্‌যন্ত্রের ভালভ সংকীর্ণ হয়ে যায়, তবে দ্রুত হৃদ্‌যন্ত্র বিকল হওয়া কিংবা ফুসফুসে জল জমার মতো প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সতর্কতা ও নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। গর্ভস্থ দুই শিশুর নিরাপত্তার জন্য বিশেষ বিকিরণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং চিকিৎসার সময় বিকিরণের মাত্রা সর্বনিম্ন রাখা হয়।
‎প্রথমবার বেলুন প্রসারণের পর কিছুটা উন্নতি হলেও সম্পূর্ণ ফল মেলেনি। পরে চিকিৎসক দল অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দ্বিতীয়বার বেলুন প্রসারণ করে ভালভ আরও কার্যকরভাবে খুলতে সক্ষম হয়। এর ফলে হৃদ্‌যন্ত্রে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি হয়। চিকিৎসার পর তাঁর শ্বাসকষ্ট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং স্থিতিশীল অবস্থায় তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
‎পরবর্তী পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গর্ভস্থ দুই শিশুর কোনও ক্ষতি হয়নি এবং অকাল প্রসবের আশঙ্কাও তৈরি হয়নি। পরে ১২ মে ২০২৬ ভাগলপুরে রোজি কুমারী এক পুত্র ও এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। বর্তমানে মা ও দুই নবজাতকই সুস্থ ও স্থিতিশীল রয়েছে।
‎এই সাফল্য সম্পর্কে ডাঃ দিলীপ কুমার বলেন, যমজ গর্ভাবস্থায় গুরুতর মাইট্রাল স্টেনোসিস সামলানো হৃদ্‌রোগ চিকিৎসার অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জ। দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং সময়মতো চিকিৎসা না হলে পরিস্থিতি প্রাণঘাতী হতে পারে। তিনি জানান, কার্ডিওলজি, ইমেজিং, অ্যানাস্থেসিয়া এবং প্রসূতি বিভাগের চিকিৎসকদের নিখুঁত সমন্বয়ের ফলেই এই জটিল চিকিৎসা সফল হয়েছে।
‎রোজি কুমারীর বাবা নন্দকুমার শাহ জানান, প্রথমে ভাগলপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসার পর তাঁদের কলকাতার মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাস-এ পাঠানো হয়। ২৪ এপ্রিল তাঁরা কলকাতায় পৌঁছন এবং ২৬ এপ্রিল সফলভাবে চিকিৎসা সম্পন্ন হয়। তিনি বলেন, এই কঠিন সময়ে হাসপাতাল তাঁদের আর্থিক সহায়তা ও বিশেষ ছাড়ও দিয়েছে। মেয়ের জীবন রক্ষা হওয়ায় তাঁদের পরিবার নতুন আশার আলো দেখেছে।
‎হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, এর আগেও ২০২৩ সালে শিলিগুড়ির এক যমজ সন্তানসম্ভবা মহিলার একই ধরনের জটিল হৃদ্‌রোগের সফল চিকিৎসা করেছিল এই হাসপাতাল। সেই ক্ষেত্রেও মা ও দুই শিশুকে সুস্থ রাখা সম্ভব হয়েছিল।
‎চিকিৎসকদের মতে, এই দুই বিরল ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ যমজ গর্ভাবস্থার হৃদ্‌রোগ চিকিৎসায় সফলতা শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও একটি উল্লেখযোগ্য নজির হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

About Author

Advertisement