ইরান থেকে তেল না কেনা ভারতও কেন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সংকট এড়াতে পারছে না?

IMG-20260827-WA0085

দক্ষিণ এশিয়ায় বাড়তে থাকা জ্বালানি ঝুঁকি ও সমাধানের সম্ভাবনা

দেবেন্দ্র কে. ঢুঙ্গানা

আমেরিকা ইরানের ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তৈরি হওয়া ঝুঁকির সরাসরি প্রভাব ইরান থেকে অপরিশোধিত তেল না কেনা ভারতের ওপরও পড়তে পারে। প্রথম দৃষ্টিতে ভারতের সঙ্গে এই সংকটের সরাসরি সম্পর্ক নেই বলে মনে হতে পারে। কারণ, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকির কারণে ভারতীয় শোধনাগারগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ইরানি অপরিশোধিত তেল কেনা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী তেলের বাজার পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদক দেশের সরবরাহ কমে গেলে তার প্রভাব অন্য উৎস থেকে তেল কেনা দেশগুলোর ওপরও পড়ে। এই কারণেই ভারতের জন্য সংকটটি সরাসরি না হয়ে পরোক্ষ ও দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
ভারত তার অপরিশোধিত তেলের চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে গেলে তা ভারতের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ইরানের তেল রপ্তানিতে আরও বাধা সৃষ্টি হলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে চীনের ওপর। কারণ, চীন ইরানি অপরিশোধিত তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতা। চীন যদি ইরান থেকে প্রয়োজনীয় তেল সংগ্রহ করতে না পারে, তাহলে তাকে রাশিয়া, সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য উৎপাদক দেশের কাছ থেকে অতিরিক্ত তেল কিনতে হবে। তখন ভারত ও চীনের মধ্যে একই উৎসের তেলের জন্য প্রতিযোগিতা বেড়ে যাবে। চাহিদা বাড়লে আন্তর্জাতিক তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারতের আমদানি ব্যয়ের ওপর।
এই সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরবরাহব্যবস্থা। ইরানের রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন এবং হরমুজ প্রণালীর আশপাশে অস্থিতিশীলতা অব্যাহত থাকলে বিশ্ববাজারে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিশ্ববাজারে যাওয়া বিপুল পরিমাণ তেল এই সমুদ্রপথের সঙ্গে যুক্ত। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে এখানে কোনো ধরনের বাধা বা নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বজায় থাকলে শুধু তেলের দামই নয়, পরিবহন ও বিমা খরচও বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে ভারতকে একই পরিমাণ তেল কিনতেও আগের তুলনায় বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হবে।
ভারতের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানির বর্তমান নির্ভরতা। গত কয়েক বছরে ভারত রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের ওপর তার নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। কিন্তু ইরানের ওপর মার্কিন চাপ আরও বিস্তৃত হলে নিষেধাজ্ঞার আওতা রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত লেনদেন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে ভারতকে তুলনামূলক সস্তা রুশ তেলের বিকল্প খুঁজতে হতে পারে। এতে জ্বালানি ব্যয় ও কৌশলগত অনিশ্চয়তা—দুই-ই বাড়বে।
এর প্রভাব শুধু তেলের দামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে পেট্রোল, ডিজেল, বিমান জ্বালানি, পেট্রোকেমিক্যাল এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ভারতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য মুদ্রানীতি পরিচালনাও আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। আমদানি ব্যয় বাড়লে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়তে পারে এবং মার্কিন ডলারের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে ভারতীয় রুপির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
এই সংকট শুধু ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোও আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এসব দেশ তাদের জ্বালানি চাহিদা পূরণের জন্য বিপুল পরিমাণে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ভারত দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি এবং গুরুত্বপূর্ণ পেট্রোলিয়াম শোধন ও বাণিজ্যকেন্দ্র হওয়ায় দেশটিতে জ্বালানির ব্যয় বেড়ে গেলে তার প্রভাব আঞ্চলিক বাজারেও পড়তে পারে। বিশেষ করে নেপালের মতো স্থলবেষ্টিত দেশের ক্ষেত্রে ভারতীয় বাজার ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরতার কারণে জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, উৎপাদন, কৃষি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
তবে এই সংকটের কোনো সমাধান নেই—এমন নয়। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ভারতকে অপরিশোধিত তেল আমদানির উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকাসহ বিভিন্ন উৎস থেকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে তেল আমদানি করা গেলে কোনো একটি দেশ বা অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো সম্ভব। দ্বিতীয়ত, ভারতকে কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুতের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে সরবরাহে হঠাৎ বিঘ্ন ঘটলে কিছু সময়ের জন্য বাজারকে স্থিতিশীল রাখা যায়।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হলো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো। ভারত সৌর ও বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং সবুজ হাইড্রোজেনের মতো খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে আন্তর্জাতিক তেলবাজারের ধাক্কা থেকে অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে সুরক্ষিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকেও আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা, বিদ্যুৎ বাণিজ্য এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
শেষ পর্যন্ত ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ভারতের জন্য শুধু ইরান থেকে তেল কিনতে না পারার সমস্যা নয়; এটি বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ও মূল্য কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত একটি বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি। ভারত ইরান থেকে তেল না কিনলেও চীনের চাহিদার পরিবর্তন, উপসাগরীয় অঞ্চলে সরবরাহে বিঘ্ন, আন্তর্জাতিক তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য আর্থিক নিষেধাজ্ঞা তার তেল আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ, কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি, জ্বালানি দক্ষতা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরকে এগিয়ে নিতে হবে। এমন বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করলেই ভারত ভবিষ্যতের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করতে এবং সেই সংকটের ঢেউয়ে প্রভাবিত দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিগুলোকেও তুলনামূলকভাবে নিরাপদ রাখতে পারবে।

About Author

Advertisement