ইরান-আমেরিকা উত্তেজনা: হরমুজ প্রণালী অবরোধ ও কূটনীতির মাঝে জটিল পরিস্থিতি

USA vs Iran

নয়াদিল্লি: ইরান ও আমেরিকার মধ্যে চলমান সামরিক ও কূটনৈতিক সংঘাত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একদিকে যুদ্ধবিরতির আশা রয়েছে, অন্যদিকে ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও নৌ সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় দূরদর্শনে এসে দেশের অবস্থান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
হরমুজ প্রণালী: সংঘর্ষের নতুন কেন্দ্র
এই পুরো সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালী, যার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেল পরিবাহিত হয়। আমেরিকা ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে এখানে নৌ অবরোধ জারি করেছে। এর জবাবে গালিবাফ স্পষ্টভাবে জানান, যদি ইরানের জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করতে না পারে, তবে অন্য কোনো দেশের জাহাজকেও এখানে চলতে দেওয়া হবে না। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজে গুলিবর্ষণের ঘটনা এই আশঙ্কাকে আরও বাস্তব করে তুলেছে।
সামরিক ক্ষেত্রে ‘অসম যুদ্ধ’ কৌশল
গালিবাফ দাবি করেন, ইরান প্রচলিত যুদ্ধের পরিবর্তে ‘অসম যুদ্ধ’ কৌশল গ্রহণ করেছে। তাঁর মতে, প্রায় ১৮০টি মানববিহীন উড়োজাহাজের মাধ্যমে আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত দাবি হলো একটি আমেরিকান যুদ্ধবিমানকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার মাধ্যমে জরুরি অবতরণে বাধ্য করার ঘটনা। যদিও আমেরিকার পক্ষ থেকে এটিকে প্রযুক্তিগত ত্রুটি বলা হয়েছে, ইরান এটিকে তাদের কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে।
ইসলামাবাদ আলোচনা ও বক্তব্য
পাকিস্তানের ইসলামাবাদে এক শীর্ষ মার্কিন নেতার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। তবুও প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রপতির সাম্প্রতিক বক্তব্য—“ইরান সব বিষয়ে সম্মত হয়েছে”—আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তাঁর দাবি, ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর ও পারমাণবিক সমৃদ্ধিকরণ বন্ধ করতে প্রস্তুত। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি এবং তারা কোনো চূড়ান্ত চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।
ইরানের শর্ত ও ‘প্রতিরোধের অক্ষ’
ইরানের কৌশল শুধু নিজেদের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। গালিবাফ স্পষ্ট করে বলেন, লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনে হুতি এবং গাজায় হামাস—যাদের ইরান ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ বলে অভিহিত করে—তাদের স্বার্থ অন্তর্ভুক্ত না করে কোনো চুক্তি গ্রহণযোগ্য হবে না। তাঁর মতে, এই গোষ্ঠীগুলি ইরানের সুরক্ষার জন্য লড়াই করেছে, তাই শান্তি প্রক্রিয়ায় তাদের অন্তর্ভুক্তি অপরিহার্য।
ভবিষ্যতের পথ: মধ্যস্থতা না বড় সংঘাত?
বর্তমানে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সেতুবন্ধনের ভূমিকা পালন করছেন। ১৭ এপ্রিল লেবাননে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি কিছুটা স্বস্তি দিলেও, হরমুজ প্রণালীর অবরোধ ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অচলাবস্থা যে কোনো সময় বৃহৎ আঞ্চলিক সংঘাতের দিকে গড়াতে পারে।
ইরানের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক মতভেদ তীব্র। কট্টরপন্থী গোষ্ঠী আমেরিকার সঙ্গে কোনো আলোচনাকেই আত্মসমর্পণ মনে করছে, অন্যদিকে নেতৃত্ব এটিকে সম্মানজনক কূটনীতির মাধ্যমে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। আগামী কয়েক দিনেই নির্ধারিত হবে, বিশ্বের এই সংবেদনশীল অঞ্চল শান্তির পথে এগোবে নাকি নতুন এক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও সংঘাতের দিকে।

About Author

Advertisement