অরুণাচল: জলবিদ্যুৎ উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং হারিয়ে যেতে থাকা ‘হোয়াইট-বেলিড হেরন’-এর কণ্ঠস্বর

IMG-20260509-WA0063

ইটানগর: অরুণাচল প্রদেশ-এ প্রস্তাবিত ১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন টিএইচডিসি ইন্ডিয়া লিমিটেড-এর অধীন কলাই–২ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এখন আর শুধুমাত্র শক্তি উৎপাদনের বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই। এই প্রকল্পটি উন্নয়ন ও জৈব অস্তিত্বের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংবেদনশীল সংঘাতের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ভারত–চীন সীমান্তঘেঁষা অঞ্জাও জেলার লোহিত নদীতে প্রস্তাবিত এই প্রকল্প একদিকে উত্তর-পূর্ব ভারতের শক্তি ভবিষ্যতকে নতুন দিশা দেওয়ার দাবি করছে, অন্যদিকে বিশ্বের অতি বিরল প্রজাতির মধ্যে অন্যতম হোয়াইট-বেলিড হেরন-এর অস্তিত্ব নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার আনুমানিক ব্যয়যুক্ত এই প্রকল্পের জন্য ৮৬৯ হেক্টরেরও বেশি আধা-চিরসবুজ বনভূমি ডাইভারশন করার প্রস্তাব কেন্দ্রীয় সরকারের বন উপদেষ্টা কমিটির কাছে জমা পড়েছে। কিন্তু প্রকল্প মূল্যায়ন নথিতে লোহিত নদী এলাকাকে হোয়াইট-বেলিড হেরনের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হিসেবে উল্লেখ না করা এখন বড় বিতর্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, যৌথ স্থল পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে “কোনো বিরল বা বিপন্ন প্রজাতির উপস্থিতি নেই” বলে দাবি করা হয়েছে, যদিও এই একই এলাকায় এই পাখিটির উপস্থিতি ইতিমধ্যেই সরকারি ও স্বাধীন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে।
এই ঘটনা ভারতের উন্নয়ন নীতির ভেতরে লুকিয়ে থাকা একটি পুরনো প্রশ্ন আবারও সামনে নিয়ে এসেছে—শক্তি উন্নয়নের নামে কি জৈব বৈচিত্র্যের ধারাবাহিক অবহেলা চলতেই থাকবে?
অরুণাচল প্রদেশ জলসম্পদের দিক থেকে ভারতের অন্যতম সম্ভাবনাময় রাজ্য হিসেবে বিবেচিত। ব্রহ্মপুত্র নদী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত দ্রুত প্রবাহমান নদীগুলো এখানে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রাখে। বর্তমানে ভারত কয়লা-নির্ভর শক্তি থেকে সরে এসে পরিষ্কার শক্তির দিকে অগ্রসর হচ্ছে, এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোকে “সবুজ শক্তি” হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে কলাই–২-এর মতো প্রকল্পগুলোকে জাতীয় শক্তি নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হচ্ছে।
কিন্তু যদি “সবুজ শক্তি”-র নামে বিরল বন্যপ্রাণীর আবাস ধ্বংস করা হয়, তবে সেটিকে কতটা সবুজ বলা যায়? এই প্রশ্নই এখন পরিবেশবিদদের কণ্ঠে উঠে আসছে। হোয়াইট-বেলিড হেরন শুধু একটি পাখি নয়, এটি পূর্ব হিমালয়ের সূক্ষ্ম পরিবেশগত ভারসাম্যের সূচক প্রজাতি। বিশ্বজুড়ে এর সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত এবং এর অস্তিত্ব লোহিত নদীর মতো পরিষ্কার ও অবিচ্ছিন্ন নদী ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। বাঁধ নির্মাণ, নদীর প্রবাহ পরিবর্তন, বিস্ফোরণ কার্যক্রম এবং বন উজাড় এর প্রজনন ও খাদ্যচক্রে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে—এমন সতর্কতা বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে দিয়ে আসছেন।
এই পুরো ঘটনার মূল উদ্দেশ্য উন্নয়ন ও সংরক্ষণের সংঘাতকে তুলে ধরা। এর ভাষা গবেষণাভিত্তিক ও প্রশ্নমূলক, যেখানে তথ্যের মাধ্যমে সরকারি দাবির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষত যখন বন বিভাগ আগেই এই পাখির উপস্থিতি নথিভুক্ত করেছে, তখন চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তার উল্লেখ না থাকা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
এই ঘটনা শুধু অরুণাচল প্রদেশের নয়, বরং পুরো দক্ষিণ এশীয় উন্নয়ন মডেলের গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে আসে। উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন প্রায়শই কাগুজে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়, স্থানীয় পরিবেশগত বাস্তবতাকে অবমূল্যায়ন করা হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি জৈব ক্ষতিকে অর্থনৈতিক লাভের তুলনায় কম গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আজ বিশ্ব জলবায়ু সংকটের মুখোমুখি। এমন সময়ে পরিষ্কার শক্তির প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সবুজ শক্তি উৎপাদনের নামে যদি জৈব ঐতিহ্য ধ্বংস করা হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে। অরুণাচল প্রদেশের কলাই–২ প্রকল্প সেই সতর্কবার্তাই দিচ্ছে—শক্তি উন্নয়ন জরুরি, কিন্তু প্রকৃতির নীরব কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করে নয়।
যদি বিরল প্রজাতির অস্তিত্বকে উপেক্ষা করে প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে নদীগুলো শুধুমাত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঠামো হয়ে উঠবে, জীবনের ভিত্তি নয়।

About Author

Advertisement