১৮টি রাজ্যে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কতা, পাহাড়ে ধস ও সমতলে বন্যার আশঙ্কা

heavy-rain-in-odisha-560-villages-affected-in-malkangiri-and-koraput-districts-1122x1122

নয়াদিল্লি: ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (আইএমডি) ভারতের বিভিন্ন অংশে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানিয়ে গুরুতর আবহাওয়া সতর্কতা জারি করেছে। সক্রিয় মৌসুমি অক্ষরেখা এবং বঙ্গোপসাগরের উপর তৈরি নিম্নচাপের প্রভাবে দেশের ১৮টি রাজ্যে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়ার পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে ওঠায় একাধিক রাজ্যে রেড ও অরেঞ্জ অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, ত্রাণ ও উদ্ধারকারী দল এবং দুর্যোগ মোকাবিলা সংস্থাগুলিকে উচ্চ সতর্কতায় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইএমডি-র মতে, উত্তর ভারতের পার্বত্য অঞ্চল, গঙ্গার সমতলভূমি, মধ্য ভারত এবং পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় এই আবহাওয়া ব্যবস্থার ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে। ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া, বজ্রপাত এবং বিদ্যুৎ চমকানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
হিমালয় অঞ্চলে ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা~
উত্তরাখণ্ড ও হিমাচল প্রদেশের পার্বত্য এলাকায় লাগাতার ভারী বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। বৃষ্টির ফলে দুর্বল পাহাড়ি রাস্তা এবং ঢালু এলাকায় ভূমিধস, মাটি ধসে পড়া এবং পাথর গড়িয়ে পড়ার ঘটনা বাড়তে পারে।
নদী ও নালার জলস্তর হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় আকস্মিক বন্যা এবং মেঘভাঙা বৃষ্টির মতো দুর্যোগের আশঙ্কাও রয়েছে। আবহাওয়া দফতর চারধাম যাত্রাপথ এবং গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে যাওয়া পর্যটকদের অপ্রয়োজনীয় যাত্রা এড়িয়ে চলার পাশাপাশি প্রশাসন ও আবহাওয়া দফতরের সরকারি নির্দেশিকা মেনে চলার আবেদন জানিয়েছে।
দিল্লি থেকে মুম্বই- জলমগ্নতার আশঙ্কা~
সমতল অঞ্চল এবং বড় শহরগুলিতেও ভারী বৃষ্টির কারণে জনজীবন ব্যাহত হতে পারে। দিল্লি, লখনউ, নয়ডা, গাজিয়াবাদ, পাটনা, ভোপাল এবং মুম্বইয়ের মতো শহরের নিচু এলাকায় জল জমে যাওয়া এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভারী বৃষ্টির কারণে নিকাশি ব্যবস্থার উপর চাপ বাড়তে পারে এবং রাস্তায় দৃশ্যমানতা কমে যেতে পারে। এর ফলে সড়ক ও রেল যোগাযোগেও প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নাগরিকদের জলমগ্ন রাস্তা, খোলা নর্দমা এবং জরাজীর্ণ ভবন বা কাঠামো থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কেন সক্রিয় হয়েছে মৌসুমি বায়ু ব্যবস্থা?
আবহাওয়াবিদদের মতে, বর্তমানে মৌসুমি অক্ষরেখা তার স্বাভাবিক অবস্থানের তুলনায় দক্ষিণ দিকে সক্রিয় রয়েছে। এর পাশাপাশি উত্তর বঙ্গোপসাগর এবং সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় তৈরি শক্তিশালী ঘূর্ণাবর্ত নিম্ন বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প টেনে আনছে।
এর সঙ্গে উত্তর-পশ্চিম হিমালয় অঞ্চলে সক্রিয় পশ্চিমী ঝঞ্ঝা এবং পূর্ব দিক থেকে আসা আর্দ্র মৌসুমি বায়ুর মধ্যে পারস্পরিক প্রভাব বেড়েছে। এর ফলে বায়ুমণ্ডলীয় অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ভারী বৃষ্টিবাহী মেঘ তৈরি হচ্ছে। এই কারণেই অল্প সময়ের মধ্যে প্রবল ও মুষলধারে বৃষ্টির পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন।
উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও দিল্লি-এনসিআরে কেমন থাকবে আবহাওয়া?
উত্তরপ্রদেশের পূর্ব ও পশ্চিম—দুই অংশেই মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। লখনউ, কানপুর, গোরখপুর, বারাণসী, প্রয়াগরাজ, বেরেলি এবং মেরঠ-সহ একাধিক এলাকায় বজ্রবিদ্যুৎসহ দফায় দফায় ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমে যেতে পারে। তবে খোলা এলাকায় বজ্রপাতের আশঙ্কা থাকায় কৃষক ও সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিহারের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের পাটনা, মুজফ্ফরপুর, গয়া, ভাগলপুর এবং পূর্ণিয়া-সহ একাধিক জেলায় আগামী ২৪ ঘণ্টায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। নেপালের তরাই অঞ্চলে বৃষ্টির কারণে গণ্ডক, কোসি এবং বাগমতী নদীর জলস্তরও বাড়তে পারে।
দিল্লি-এনসিআরে আকাশ ঘন মেঘে ঢাকা থাকতে পারে এবং বিভিন্ন সময়ে ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে প্রবল বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে থাকতে পারে। তবে অফিসে যাওয়া-আসার সময় রাস্তায় জল জমে যান চলাচল ব্যাহত হতে পারে।
১৮টি রাজ্যে বৃষ্টির সতর্কতা~
আইএমডি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনাযুক্ত প্রধান রাজ্যগুলির মধ্যে উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিল্লি-এনসিআর, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, অসম, মেঘালয়, মহারাষ্ট্রের কোঙ্কণ অঞ্চল, গুজরাট এবং উপকূলীয় কর্ণাটককে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
এই এলাকাগুলিতে স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া, বজ্রবিদ্যুৎ এবং বজ্রপাতের আশঙ্কা বজায় থাকতে পারে।
কৃষকদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ~
ভারী বৃষ্টি ধানের মতো খরিফ ফসলের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে পর্যাপ্ত জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকলে ডালশস্য, তৈলবীজ এবং সবজি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা কৃষকদের জমিতে অতিরিক্ত জল জমতে না দেওয়ার এবং আবহাওয়া খারাপ থাকাকালীন কীটনাশক ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ না করার পরামর্শ দিয়েছেন।
সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপত্তা পরামর্শ~
ভারতীয় আবহাওয়া দফতর এবং জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ (এনডিএমএ) বজ্রবিদ্যুৎ, বজ্রপাত এবং ভারী বৃষ্টির সময় সাধারণ মানুষকে নিম্নলিখিত সতর্কতা অবলম্বনের আবেদন জানিয়েছে:

– ঝড়-বৃষ্টি বা বজ্রপাতের সময় উঁচু গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি, টিনের ছাউনি বা ধাতব কাঠামোর নিচে আশ্রয় নেবেন না।

– বাড়ির ভিতরে থাকলে সম্ভব হলে বৈদ্যুতিক যন্ত্রের প্লাগ খুলে রাখুন এবং পানির কলের মতো বিদ্যুৎ পরিবাহী জিনিসের সরাসরি সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন।

– ভারী বৃষ্টির সময় গাড়ি চালালে নিরাপদ স্থানে গাড়ি থামিয়ে রাখুন। জলমগ্ন আন্ডারপাস বা ভূগর্ভস্থ পথ দিয়ে গাড়ি চালাবেন না।

– পশুপাখিকে খোলা মাঠে বা গাছের নিচে না রেখে নিরাপদ ও মজবুত আশ্রয়ে রাখুন।

– স্থানীয় প্রশাসন, আবহাওয়া দফতর এবং দুর্যোগ মোকাবিলা সংস্থার জারি করা সরকারি নির্দেশ ও তাৎক্ষণিক সতর্কতাকে অগ্রাধিকার দিন।


আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, উপগ্রহ ও আবহাওয়া রাডারের মাধ্যমে এই আবহাওয়া ব্যবস্থার উপর লাগাতার নজরদারি চালানো হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী জেলা স্তরেও তাৎক্ষণিক আবহাওয়া সতর্কতা জারি করা হবে। যে কোনও জরুরি পরিস্থিতি এড়াতে নাগরিকদের শুধুমাত্র সরকারি ও নির্ভরযোগ্য আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্যের উপর নির্ভর করার আবেদন জানানো হয়েছে।

About Author

Advertisement