১৩ অক্টোবর: ইতিহাসের একটি দিন

images (3)

নয়াদিল্লি: ১৩ অক্টোবর তারিখটি ইতিহাসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ঘটনার জন্য পরিচিত। এই দিনেই যুক্তরাষ্ট্রে হোয়াইট হাউসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল, মার্কিন নৌবাহিনী গঠনের বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, আঙ্কারাকে তুরস্কের রাজধানী ঘোষণা করা হয়েছিল এবং চিলির একটি খনিতে আটকা পড়া ৩৩ জন খনিশ্রমিককে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছিল।
আসুন ১৩ই অক্টোবরের উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ঘটনা, বিখ্যাত ব্যক্তিদের জন্ম ও মৃত্যু এবং এই দিনটির বিশেষ তাৎপর্য সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক:
৫৪ খ্রিস্টাব্দ: রোমান সম্রাট ক্লডিয়াস মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর নিরো রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট হন।
১৩০৭ সাল: ফ্রান্সের রাজা চতুর্থ ফিলিপের নির্দেশে ‘নাইটস টেম্পলার’-এর সদস্যদের গ্রেপ্তার করা শুরু হয়। মধ্যযুগীয় ইউরোপের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
১৭৭৩: ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী চার্লস মেসিয়ার তাঁর জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তালিকায় ‘হোয়ার্লপুল গ্যালাক্সি’-কে (Whirlpool Galaxy) অন্তর্ভুক্ত করেন। সর্পিলাকার এই গ্যালাক্সিটি ‘এম৫১’ নামেও পরিচিত।
১৭৭৫: আমেরিকান কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস একটি নৌবাহিনী গঠনের লক্ষ্যে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তটিকেই মার্কিন নৌবাহিনী প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। মার্কিন নৌবাহিনী প্রতি বছর ১৩ অক্টোবর তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করে।
১৭৯২: যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির বাসভবন ‘হোয়াইট হাউস’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে এটি মার্কিন রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন ও কার্যালয়ে পরিণত হয়।
১৮৮৪: ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গ্রিনউইচের ওপর দিয়ে অতিক্রমকারী দ্রাঘিমা রেখাকে বিশ্বের ‘প্রধান দ্রাঘিমা রেখা’ হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ফলে বিশ্বব্যাপী সময় ও দ্রাঘিমাংশ গণনার ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়।
১৯০৩: আমেরিকার প্রথম ‘ওয়ার্ল্ড সিরিজ’ বেসবল প্রতিযোগিতায় পিটসবার্গ পাইরেটসকে পরাজিত করে বোস্টন আমেরিকানস শিরোপা জয় করে।
১৯২৩: আঙ্কারাকে তুরস্কের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে এটি দেশটির প্রধান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।
১৯৪৩: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ইতালি জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
১৯৮৭: মধ্য আমেরিকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার জন্য কোস্টারিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট অস্কার আরিয়াস সানচেজকে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয়।
১৯৯৯: আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা বিশ্লেষণ এবং অর্থনীতিতে অবদানের জন্য অর্থনীতিবিদ রবার্ট মান্ডেলকে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয়।
১৯৯৯: অটল বিহারি বাজপেয়ী তৃতীয়বারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন।
২০০০: ঘোষণা করা হয় যে, দক্ষিণ কোরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কিম ডে-জং-কে কোরিয় উপদ্বীপে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং শান্তি ও পুনর্মিলন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান করা হবে।
২০০৩: যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে মিশরের যমজ ভাই আহমেদ ও মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে আলাদা করার জন্য একটি জটিল অস্ত্রোপচার করা হয়; শিশু দুটির জন্ম হয়েছিল মাথা জোড়া লাগানো অবস্থায়।
২০০৫: ঘোষণা করা হয় যে, ব্রিটিশ নাট্যকার হ্যারল্ড পিন্টারকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হবে।
২০০৬: দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে ক্ষুদ্রঋণ ধারণার বিকাশ ও প্রসারে অবদানের জন্য বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংককে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয়।
২০১০: চিলির সান হোসে খনিতে ৬৯ দিন ধরে আটকা পড়ে থাকা ৩৩ জন খনিশ্রমিককে সফলভাবে উদ্ধার করা হয়। এই উদ্ধার অভিযানটি মানবিক সাহস, প্রযুক্তি এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে ওঠে।
২০১৩: ভারতের মধ্যপ্রদেশের রতনগড় মাতা মন্দিরের কাছে একটি সেতুতে তীর্থযাত্রীদের বিশাল ভিড়ের মধ্যে পদদলনের ঘটনা ঘটে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় বহু মানুষ প্রাণ হারান।
২০১৬: ঘোষণা করা হয় যে, মার্কিন গায়ক ও গীতিকার বব ডিলানকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হবে। মার্কিন গানের ধারায় নতুন কাব্যিক শৈলী সৃষ্টির জন্য তিনি এই সম্মাননা লাভ করেন।
২০২১: মার্কিন অভিনেতা উইলিয়াম শ্যাটনার মহাকাশ ভ্রমণ করেন। ৯০ বছর বয়সে মহাকাশে পৌঁছানোর কারণে তিনি বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।
২০২৩: ইসরায়েল গাজা উপত্যকার উত্তরাঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় ১১ লাখ মানুষকে দক্ষিণের দিকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে স্বল্প সময়ের মধ্যে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সৃষ্ট জটিলতা এবং সম্ভাব্য মানবিক সংকট নিয়ে জাতিসংঘ উদ্বেগ প্রকাশ করে।
২০২৫: গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় হামাস জীবিত ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি দেয়। একই দিনে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা মিশরের শার্ম আল-শেখে আয়োজিত একটি শান্তি সম্মেলনে অংশ নেন। এই ঘটনাগুলো যুদ্ধবিরতি ও মানবিক সহায়তা বৃদ্ধির বিষয়ে আশার সঞ্চার করলেও, এগুলোকে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পূর্ণ নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যায়নি।
১৩ অক্টোবর জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ~
১৮৭৭: ভুলাভাই দেশাই, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একজন বিশিষ্ট নেতা এবং প্রখ্যাত আইনজীবী।
১৮৯৫: সি. কে. নাইডু, ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম প্রারম্ভিক ও বিখ্যাত খেলোয়াড়।
১৯১১: অশোক কুমার, ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত অভিনেতা।
১৯২৫: মার্গারেট থ্যাচার, ব্রিটেনের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি ১৯৭৯ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং ‘আয়রন লেডি’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
১৯৪১: পল সাইমন, মার্কিন গায়ক ও গীতিকার।
১৯৪৮: নুসরাত ফতেহ আলি খান, পাকিস্তানের বিখ্যাত কাওয়ালি গায়ক।
১৯৮০: মার্কিন গায়িকা ও অভিনেত্রী আশান্তি।
১৯৮৯: মার্কিন রাজনীতিবিদ আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ।
১৯৯৫: দক্ষিণ কোরীয় গায়ক এবং বিটিএস-এর সদস্য জিমিন।
১৩ অক্টোবর যেসব বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব মৃত্যুবরণ করেন
৫৪ খ্রিস্টাব্দ: রোমান সম্রাট ক্লডিয়াস।
১৯১১: সিস্টার নিবেদিতা; তিনি ভারতে শিক্ষা ও সমাজসেবার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছিলেন।
১৯৮৭: ভারতীয় গায়ক, অভিনেতা ও সুরকার কিশোর কুমার।
২০১৬: থাইল্যান্ডের রাজা ভূমিবল আদুলিয়াদেজ। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে থাইল্যান্ডের সিংহাসনে আসীন ছিলেন।
২০১৮: ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রখ্যাত সুরবাহার বাদক অন্নপূর্ণা দেবী।
দিনটির তাৎপর্যপূর্ণ উপলক্ষ ও পালনীয় বিষয়সমূহ~
আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দিবস: জাতিসংঘ প্রতি বছর ১৩ অক্টোবর এই দিবসটি পালন করে। এর উদ্দেশ্য হলো দুর্যোগজনিত প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস, দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার, নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণ এবং জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতায়নের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
বিশ্ব দৃষ্টি দিবস: এই দিবসটি প্রতি বছর ১৩ই অক্টোবর পালন করা হয় না। এটি অক্টোবরের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার উদযাপিত হয়; তাই প্রতি বছর এর তারিখ পরিবর্তিত হয়।
১৩ই অক্টোবর ইতিহাসের পাতায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন—যা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, সাংস্কৃতিক অবদান, মানবিক উদ্ধারকাজ এবং আন্তর্জাতিক শান্তি প্রচেষ্টার মতো ঘটনায় চিহ্নিত হয়ে আছে। এই দিনের ঘটনাবলি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ইতিহাস কেবল তারিখ ও নামের সমষ্টি নয়; বরং তা মানবসমাজের অর্জন, সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতার এক দলিল।

About Author

Advertisement