কলকাতা(বেবি চক্রবর্ত্তী): কলকাতার শিয়ালদহস্থিত কৃষ্ণপদ মেমোরিয়াল হলে অনুষ্ঠিত হল আন্তর্জাতিক পঞ্চবান কবিতা সংকলনের সপ্তম বর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠান। সাহিত্যপ্রেমী ও কবিদের উপস্থিতিতে এই অনুষ্ঠান পরিণত হয় এক বর্ণময় সাহিত্য উৎসবে। স্বরচিত কবিতা পাঠ, আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনভর জমে ওঠে অনুষ্ঠানের পরিবেশ।
পঞ্চবান কাব্য ঘরানার স্রষ্টা সুশান্ত ঘোষ বলেন, ২০২০ সালে শুরু হওয়া পঞ্চবান কবিতার যাত্রা আজ সপ্তম বর্ষে এসে পৌঁছেছে। প্রথমদিকে সীমিত পরিসরে শুরু হলেও বর্তমানে ভারত, বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পঞ্চবান কবিতার জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবাদ, প্রেম, পরিবেশ, সামাজিক অবক্ষয়, আধ্যাত্মিকতা, সচেতনতা ও মানবিক মূল্যবোধের মতো বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে রচিত হচ্ছে পঞ্চবান কবিতা। তিনি জানান, বর্তমানে অনলাইন ও অফলাইনে মিলিয়ে প্রায় দুই লক্ষাধিক পঞ্চবান কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর লেখা ‘পঞ্চক কাব্যমালা’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে পঞ্চবান কবিতার প্রথম একক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে বহু কবি নিজেদের একক পঞ্চবান কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রায় দুই শতাধিক একক পঞ্চবান কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে বলেও তিনি জানান। এবারের সপ্তম বর্ষের আন্তর্জাতিক সংকলনে তিন শতাধিক কবির প্রায় ছয় শতাধিক পঞ্চবান কবিতা স্থান পেয়েছে, যা বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে আশা করা যায়।
সংকলনের সম্পাদিকা আশা সরকার বলেন, বর্তমান সময় পৃথিবী এক অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে চলেছে। যুদ্ধ, অশান্তি, নৈরাজ্য ও সামাজিক সংকটের আবহে কবিরা তাঁদের লেখনীকে সমাজের প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করছেন। প্রেম, সাহিত্য, মানবতা, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক চেতনার মতো বিষয়গুলিও এবারের সংকলনে গুরুত্ব পেয়েছে। নির্দিষ্ট পাঁচটি লাইন এবং প্রতিটি লাইনে পাঁচটি শব্দ ব্যবহারের অনন্য কাঠামোর মাধ্যমে পঞ্চবান কবিতা আজ বাংলা সাহিত্যের একটি স্বতন্ত্র ধারায় পরিণত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি বিহার, আসাম, উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ড, মহারাষ্ট্র, তেলেঙ্গানা সহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে এবং বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, লন্ডন-সহ বিদেশের বিভিন্ন দেশেও পঞ্চবান কবিতার চর্চা বিস্তৃত হয়েছে। ছোট পরিসরের মধ্যেও গভীর ভাবনার প্রকাশ ঘটানোর ক্ষমতাই পঞ্চবান কবিতাকে পাঠকমহলে জনপ্রিয় করে তুলেছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার কারণে মানুষ এখন অল্প কথার মধ্যেই গভীর ভাবনা খুঁজে নিতে চায়। সেই পরিবর্তিত মানসিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়েই বাংলা সাহিত্যে এসেছে নতুন নতুন কাব্যধারা। বাল্মীকি থেকে মধুসূদনের মহাকাব্যের যুগ অতিক্রম করে বর্তমান সময়ে ক্ষুদ্রায়তন কবিতার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। অণু, পরমাণু ও পঞ্চবানের মতো নতুন ধারার কবিতা বাংলা সাহিত্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে বলেও মন্তব্য করেন দীনবন্ধু সরদার।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন কবির স্বরচিত কবিতা পাঠ উপস্থিত দর্শক ও সাহিত্যপ্রেমীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। পাশাপাশি সংগীত ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনাও অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগামী দিনেও পঞ্চবান কবিতার প্রসার ও সাহিত্যচর্চাকে আরও বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সাহিত্য মহলের একাংশের মতে, স্বল্প শব্দে গভীর অনুভূতি ও ভাবনার প্রকাশ ঘটানোর ক্ষেত্রে পঞ্চবান কবিতা ইতিমধ্যেই বাংলা সাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র স্থান করে নিয়েছে। সপ্তম বর্ষের এই আন্তর্জাতিক সংকলন সেই ধারাকেই আরও সুদৃঢ় করল।
এদিনের অনুষ্ঠানে বিশিষ্টজনদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পঞ্চবান কাব্য ঘরানার স্রষ্টা সুশান্ত ঘোষ, সম্পাদিকা আশা সরকার, সভাপতি দীনবন্ধু সরদার সহ দেশ-বিদেশের বহু কবি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিমনস্ক ব্যক্তি ও সাহিত্যপ্রেমী মানুষজন।











