সান্দাকফুর পাহাড়ে মৃত্যু

9ea309ac-774e-4e40-9fe4-dff67f4eaf49

২৬ বছরের যুবকের শ্বাসকষ্ট এবং নেপাল-ভারতের ট্রেকিং পর্যটন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন

দেশবন্ধু বিশ্বামিত্র

ফিক্কল, ইলাম: “তুমি এত ভারীভাবে শ্বাস নিচ্ছ কেন? আর সামনে যাওয়ার দরকার নেই।”
অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক দিনবন্ধু অধিকারী মঙ্গলবার সকালে তাঁর ২৬ বছরের ছেলে প্রিয়তোষকে ফোনে এই অনুরোধই করেছিলেন। সেটিই তাঁদের শেষ কথোপকথন হয়ে দাঁড়ায়। ছেলে উত্তর দিয়েছিল—“না, আমি উঠতে পারব। আমাকে যেতেই হবে।”
বুধবার সকালে কোচবিহারের তুফানগঞ্জের বাসিন্দা ভারতীয় খাদ্য নিগমের তরুণ কর্মকর্তা প্রিয়তোষকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ সান্দাকফু থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার আগে আলে নামের একটি গ্রামে তাঁর ট্রেকিং দল রাত কাটিয়েছিল। প্রায় ১৪ কিলোমিটার হাঁটার পর জ্বর এসে তিনি আর এগোতে পারছিলেন না। রাতে প্যারাসিটামলের দুটি ট্যাবলেট খেয়ে ঘুমিয়েছিলেন তিনি। পরদিন সকালে তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
এটি শুধু একটি মৃত্যু নয়, একটি সতর্কবার্তা
প্রিয়তোষের মৃত্যু সান্দাকফু এলাকায় ট্রেকিংকারীদের জন্য বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পুরনো প্রস্তাবটিকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। সান্দাকফু অঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১২ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত।
তাঁর মৃত্যুর কারণ অবশ্য এখনও জানা যায়নি। দেহটি ময়নাতদন্তের জন্য দার্জিলিং সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার ময়নাতদন্ত হওয়ার কথা।
পারিবারিক সূত্রের খবর, প্রিয়তোষ ২৭ সেপ্টেম্বর পাঁচজনের একটি দলের সঙ্গে ট্রেক শুরু করেছিলেন। দলে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু এবং কর্মক্ষেত্রের সহকর্মীরা ছিলেন। তাঁরা সিকিমের উত্তরে থেকে ট্রেক শুরু করে সোমবার সকালে ফালুটে পৌঁছেছিলেন। মঙ্গলবার দলটি সান্দাকফুর দিকে রওনা হয়।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বাবা দিনবন্ধু এবং মা পুষ্পা ফোন করলে তাঁরা দেখেন, প্রিয়তোষ ভারী শ্বাস নিতে নিতে হাঁটছেন। বাবা তাঁকে থেমে যেতে বললেও তিনি রাজি হননি।
দার্জিলিংয়ের চিকিৎসক ডা. বিকাশ দেওয়ান বলেন—“দার্জিলিংয়ের মানুষের কাছেও সান্দাকফু ট্রেক অত্যন্ত কঠিন। যাত্রার আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।” তিনি বলেন, ২৬ বছরের মতো কম বয়সেও কারও শরীরে লুকিয়ে থাকা হৃদরোগ থাকতে পারে এবং সেই কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
সূত্রের খবর, সান্দাকফু এলাকায় ট্রেকারদের জন্য বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রস্তাব প্রশাসনিক বৈঠকে বারবার আলোচনা হয়েছে। গত বছর দার্জিলিং জেলা প্রশাসন রাজ্য সরকারের কাছে প্রস্তাবও পাঠিয়েছিল। কিন্তু তা কার্যকর হয়নি।
প্রিয়তোষ ২০২৪ সালে বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হয়ে একই বছর ভারতীয় খাদ্য নিগমে চাকরি পান। বর্তমানে তিনি বিহারের মোতিহারিতে কর্মরত ছিলেন। তাঁর দিদি দীপশিখা কলকাতায় আয়কর বিভাগে কর্মরত। ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি বুধবার কোচবিহারের উদ্দেশে রওনা হন।
সান্দাকফুতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা বারবার কেন ঘটে?
১. রিল ও রোমাঞ্চের মোহ :
আজ ট্রেকিং টিকটক, ইনস্টাগ্রাম এবং ফেসবুক রিলের বিষয় হয়ে উঠেছে। ২৬ বছরের প্রিয়তোষের মতো হাজার হাজার তরুণের মনে হয়—পাহাড় মানেই ছবি তোলার জায়গা। কিন্তু ১২ হাজার ফুট উচ্চতায় অক্সিজেন প্রায় ৪০ শতাংশ কম থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় না বললেও, পাহাড় কাউকে ক্ষমা করে না।
২. প্রস্তুতি ছাড়া, গাইড ছাড়া যাওয়ার প্রবণতা :
দার্জিলিংয়ের চিকিৎসকরাই যখন বলেন, “দার্জিলিংয়ের মানুষের কাছেও এটি কঠিন”, তখন বাইরে থেকে আসা ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়া, পোর্টার-গাইড এবং অক্সিমিটার ছাড়া সেখানে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
৩. প্রশাসনের গাফিলতি :
প্রস্তাবকে ফাইলবন্দি করে রাখার প্রবণতা নেপাল ও ভারত—দুই দেশেই একই রকম। বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ট্রেকিং বিমা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং হেলিকপ্টারে উদ্ধার ব্যবস্থা ছাড়া সান্দাকফুকে শুধুমাত্র পর্যটন থেকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা গুরুতর অপরাধের সামিল। সান্দাকফু নেপাল-ভারত সীমান্তের একটি যৌথ ঐতিহ্য। এর ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের অভিন্ন নিরাপত্তা মানদণ্ড থাকা দরকার।
প্রিয়তোষের শেষ কথা ছিল—“আমাকে যেতেই হবে।”
এই জেদই তাঁর প্রাণ কেড়ে নিল। এখন প্রশ্ন আমাদের সামনে—আমরা কি এখনও “যেতেই হবে” এই জেদের বশে তরুণদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই পাহাড়ে পাঠাতে থাকব?

About Author

Advertisement