সাংবিধানিক পরিষদ, বিচারব্যবস্থা ও ক্ষমতার ভারসাম্যের সংকট, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর বাড়তে থাকা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ

IMG-20260510-WA0009

দেবেন্দ্র কিশোর

নেপালের সমসাময়িক রাজনীতি আবারও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে। নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (ইউএমএল)-এর মহাসচিব শঙ্কর পোখরেল সম্প্রতি যে মত প্রকাশ করেছেন, তা শুধু বিরোধী রাজনৈতিক মন্তব্য নয়; বরং এটি নেপালের রাজনৈতিক কাঠামো কোন দিকে এগোচ্ছে, সেই বিষয়ে এক গুরুতর প্রশ্নও উত্থাপন করেছে। সংসদের অধিবেশন স্থগিত রেখে অধ্যাদেশের মাধ্যমে সাংবিধানিক পরিষদের বৈঠক ডাকা, এরপর বিচারব্যবস্থার নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়ায় জ্যেষ্ঠতার প্রথা ভঙ্গের অভিযোগ ওঠা, এবং বিচারব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ পাওয়া—এই সব ঘটনাই গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিকে ঘিরে গভীর বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
নেপালের সংবিধান ক্ষমতার পৃথকীকরণ ও ভারসাম্যকে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচারব্যবস্থা—প্রত্যেকেরই নিজ নিজ সীমা ও দায়িত্বের মধ্যে স্বাধীনভাবে পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির অভিযোগ ক্রমাগত উঠছে। বিশেষ করে সাংবিধানিক পরিষদ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ এবং তার ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে যে, সংবিধানের “আত্মা”-র চেয়ে “প্রক্রিয়া”-কেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শঙ্কর পোখরেল উত্থাপিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। আদালতকে যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শেষ ভরসা হিসেবে গণ্য করা হয়। যখন বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা, ক্ষমতার সমীকরণ বা স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব দেখা দিতে শুরু করে, তখন তা শুধু বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই দুর্বল করে না, বরং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর নাগরিকদের আস্থাও কমিয়ে দেয়। জ্যেষ্ঠ বিচারপতিদের উপেক্ষা করে প্রধান বিচারপতির সুপারিশ করা হয়েছে—এমন অভিযোগকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এই আশঙ্কাকে আরও গভীর করেছে।
নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাস দেখলে বিচারব্যবস্থা ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে টানাপোড়েন নতুন কোনো বিষয় নয়। অতীতে সংসদ ভেঙে দেওয়া, সরকার গঠন, দল বিভাজন এবং সাংবিধানিক ব্যাখ্যার মতো বিষয়গুলোতে নেপালের সুপ্রিম কোর্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কিছু ক্ষেত্রে আদালতের সক্রিয়তাকে গণতন্ত্র রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, আবার কেউ কেউ একে “বিচারিক হস্তক্ষেপ” বলেও আখ্যা দিয়েছেন। তবে বর্তমান বিতর্কের প্রকৃতি ভিন্ন। এখন প্রশ্ন এই নয় যে বিচারব্যবস্থা সরকারকে চ্যালেঞ্জ করছে কি না; বরং প্রশ্ন হলো, সরকার নিজেই কি বিচারব্যবস্থাকে নিজের প্রভাবক্ষেত্রের মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে না?
যদি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অঙ্গগুলো ধীরে ধীরে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে চলে যায়, তাহলে গণতন্ত্রের রূপ কেবল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। নির্বাচন চলতে থাকলেও যদি প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে শাসনব্যবস্থা ধীরে ধীরে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার দিকে এগোতে পারে। বিশ্ব রাজনীতিতেও এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে নির্বাচিত সরকারগুলো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে গণতান্ত্রিক আবরণের মধ্যেই কর্তৃত্ববাদ চর্চা করেছে। নেপালেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শঙ্কর পোখরেল উল্লেখিত “ভাদ্র ২৩ ও ২৪”-এর প্রসঙ্গ তৎকালীন রাজনৈতিক ঘটনাবলির প্রতি ইঙ্গিত করে, যেখানে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার চেয়ে ক্ষমতার সমীকরণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। সেই সময় রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং বুদ্ধিজীবী মহলের বিরুদ্ধে এই সমালোচনা শোনা গিয়েছিল যে তারা সময়মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্যুতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠ তুলতে পারেনি। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, সেই একই দুর্বলতা আবারও পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সমস্যা শুধু একটি নিয়োগ, একটি অধ্যাদেশ বা একটি সরকারের আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মূল সমস্যা রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে নিহিত। ক্ষমতায় আসার পর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসার প্রবণতা নেপালের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের মধ্যেই দেখা গেছে। পার্থক্য শুধু পদ্ধতি ও সুযোগের। এই কারণেই নেপালের গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক হওয়ার পরিবর্তে আরও বেশি ব্যক্তি-কেন্দ্রিক ও ক্ষমতা-কেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে।
আজ প্রয়োজন শুধু অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। সাংবিধানিক পরিষদের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও ঐকমত্যভিত্তিক করা অত্যন্ত জরুরি। বিচারব্যবস্থার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব কমানো না গেলে ভবিষ্যতে আদালতের প্রতি জনগণের আস্থা গুরুতরভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
নেপাল দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে ফেডারেল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। তাই গণতন্ত্র রক্ষা শুধু নির্বাচন সম্পন্ন করার মাধ্যমে সম্ভব নয়; বরং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, দায়িত্বশীল নির্বাহী বিভাগ এবং কার্যকর সংসদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার মাধ্যমেই তা সম্ভব। যদি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে রাজনৈতিক স্বার্থের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তাহলে গণতন্ত্রের বাহ্যিক কাঠামো হয়তো টিকে থাকবে, কিন্তু তার আত্মা ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়বে। বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্ক সেই গভীর সতর্কবার্তাই বহন করছে।

About Author

Advertisement