দেবেন্দ্র কিশোর
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত তেল নিষেধাজ্ঞার প্রভাব দুর্বল করার দিকে স্পষ্ট ও কঠোর অবস্থান নিয়েছে চীন। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২ মে যে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে, তা আন্তর্জাতিক জ্বালানি রাজনীতি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
মার্কিন চাপ ও ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা কৌশল:
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন OFAC (Foreign Assets Control Office) এর মাধ্যমে চীনসহ বিভিন্ন দেশের কোম্পানিকে লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের “ম্যাক্সিমাম প্রেসার” নীতির লক্ষ্য ছিল ইরানের তেল রপ্তানি প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা। এই কৌশলের অংশ হিসেবে চীনা রিফাইনারিগুলোকেও নজরদারি ও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র পাঁচটি চীনা রিফাইনারিকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে, যার মধ্যে রয়েছে হেংলি পেট্রোকেমিক্যাল (দালিয়ান), শানডং জিনচেং পেট্রোকেমিক্যাল গ্রুপ, হেবেই সিনহাই কেমিক্যাল গ্রুপ, শোগুয়াং লুকিং পেট্রোকেমিক্যাল এবং শানডং শেংশিং কেমিক্যাল। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠান ইরান থেকে তেল কিনছে, কখনও গোপন শিপিং ব্যবস্থার মাধ্যমে।
চীনের আইনগত প্রতিক্রিয়া: নিষেধাজ্ঞা অস্বীকার নীতি:
এই চাপের জবাবে চীন নতুন আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২১ সালে প্রণীত “বিদেশি নিষেধাজ্ঞা-বিরোধী আইন” ব্যবহার করে চীন স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে—মার্কিন নিষেধাজ্ঞা চীনের ভেতরে কার্যকর হবে না।
এর অর্থ হলো, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভিত্তিতে চীনা কোম্পানির ব্যবসা বন্ধ করা যাবে না। বরং কোনো কোম্পানি যদি বিদেশি চাপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে চীন তাকে আইনি সুরক্ষা দেবে।
এই পদক্ষেপ শুধু কূটনৈতিক প্রতিবাদ নয়, বরং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের সরাসরি ঘোষণা। চীন ইরানের সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্যকে কৌশলগতভাবে সুরক্ষিত রাখতে চায়।
ইরানি তেল: সস্তা সরবরাহ ও কৌশলগত প্রয়োজন:
তুলনামূলকভাবে সস্তা হওয়ায় ইরানের তেল চীনের বেসরকারি রিফাইনারিগুলোর জন্য আকর্ষণীয় উৎস। এতে চীন শুধু জ্বালানি খরচ কমাচ্ছে না, বরং বিকল্প সরবরাহও নিশ্চিত করছে।
অন্যদিকে, ইরানের জন্য চীন একটি বড় বাজার। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও এই বাণিজ্য ইরানের অর্থনীতির জন্য জীবনরেখা হয়ে আছে।
‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ ব্যবস্থার সরাসরি চ্যালেঞ্জ:
যুক্তরাষ্ট্রের সেকেন্ডারি স্যাংশন (দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা) ব্যবস্থা অন্যান্য দেশের কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে—যদি তারা নিষিদ্ধ দেশের সঙ্গে ব্যবসা করে, তাহলে তাদের মার্কিন বাজার হারাতে হতে পারে।
চীন এই ব্যবস্থাকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নিজের আইনি কাঠামো প্রয়োগ করেছে। এটি বিদেশি কোম্পানিগুলোকে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—মার্কিন চাপের কারণে তারা যদি চীনা কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তবে চীনে আইনি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ডলার নির্ভরতা কমানোর ইঙ্গিত:
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে চীনকে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর পথে নিয়ে যেতে পারে। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রা বা বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা ব্যবহারের সম্ভাবনা বাড়ছে।
বিশ্ব জ্বালানি রাজনীতির জটিলতা বাড়ছে:
তবে বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো এখনও সতর্ক অবস্থান নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের চাপের কারণে তারা দ্বৈত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে আরও জটিল করে তুলবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা প্রমাণ করছে যে জ্বালানি বাণিজ্য এখন শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক শক্তি প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
উপসংহার: নতুন বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের ইঙ্গিত:
চীনের এই পদক্ষেপ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে দেশটি এখন আর শুধু মার্কিন নীতির প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। বরং নিজস্ব আইন ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত।
ইরানি তেল ইস্যু এখন আর শুধু দুই দেশের বিষয় নয়, বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থা ও ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার দিকে এগোচ্ছে।










