দেবেন্দ্র কিশোর
মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতিকে “লাইফ সাপোর্টে” বলে উল্লেখ করায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে গভীর সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রায় এক মাস ধরে চলা যুদ্ধবিরতিকে “অত্যন্ত নাজুক” অবস্থায় রয়েছে বলে ট্রাম্প যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, তা শুধু কূটনৈতিক মন্তব্য নয়, সম্ভাব্য সামরিক সংঘর্ষের পূর্বাভাস বলেও মনে করা হচ্ছে। এর জবাবে ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার Mohammad Bagher Ghalibaf বলেছেন, ইরানের সেনাবাহিনী “যেকোনো হামলার জবাব দিতে এবং শিক্ষা দিতে প্রস্তুত।” এতে স্পষ্ট যে দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস এখনো গভীরভাবে বিদ্যমান।
এই পুরো ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের পাঠানো যুদ্ধ সমাপ্তির প্রস্তাব। ওই প্রস্তাবে সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধের দাবি, মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের ওপর ভবিষ্যতে আর হামলা না করার নিরাপত্তা নিশ্চয়তা অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এটিকে “সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য” বলে প্রত্যাখ্যান করায় যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ আবারও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এই উত্তেজনা শুধু দুটি দেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নয়; এর বৈশ্বিক প্রভাবও অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রশ্নটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশ্বের বড় অংশের তেল সরবরাহ এই সমুদ্রপথের মাধ্যমে হয়ে থাকে। সেখানে উত্তেজনা বৃদ্ধি বা পথ অবরুদ্ধ হলে আন্তর্জাতিক তেলবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। যুদ্ধ আবার শুরু হলে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিও বাড়তে পারে, যার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর।
অন্যদিকে, ইরান তার প্রস্তাবে ইসরায়েল–লেবানন ফ্রন্টকে যুক্ত করায় বোঝা যায় যে সংঘাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক জোট ও প্রতিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে তার কৌশলগত শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। ফলে আমেরিকা–ইরান উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেন পর্যন্ত অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে পুরো মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত ও অনিরাপত্তার সময়ে প্রবেশ করতে পারে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে একটি রাজনৈতিক কৌশলের ইঙ্গিতও স্পষ্ট। তিনি যুদ্ধবিরতিকে “নাজুক” বলে উল্লেখ করে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছেন, তবে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দিকে এগোনোর সরাসরি ইঙ্গিত দেননি। মনে হচ্ছে, তিনি কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে নমনীয় করতে চাইছেন। তবে এই কৌশল ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে, কারণ ইরান বহু বছর ধরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ মোকাবিলা করে আসছে এবং প্রতিরোধকে জাতীয় গৌরবের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
সামগ্রিকভাবে দেখলে বর্তমান পরিস্থিতি অস্থায়ী শান্তি ও স্থায়ী অস্থিতিশীলতার মধ্যবর্তী এক সংকটময় অবস্থার প্রতিচ্ছবি। যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো বহাল থাকলেও দুই পক্ষের বক্তব্যে উত্তেজনা কমার বদলে বাড়ার ইঙ্গিত মিলছে। দ্রুত কার্যকর কূটনৈতিক সংলাপ শুরু না হলে যেকোনো ছোট সামরিক ঘটনা বড় যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিও গভীর সংকটে পড়তে পারে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শক্তি প্রদর্শনের নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্য সংলাপ এবং পারস্পরিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তার। অন্যথায় “লাইফ সাপোর্টে” থাকা এই যুদ্ধবিরতি যেকোনো মুহূর্তে পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে।











