দেবেন্দ্র কিশোর
নেপালের রাজনীতি আবারও এক তীব্র মেরুকরণের মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সংসদের বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনেই সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে সংঘাত দেখা গেছে, তা কেবল প্রক্রিয়াগত মতভেদ নয়; বরং এটি পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নতুন রাজনৈতিক দাবির মধ্যকার আদর্শিক সংঘর্ষেরও ইঙ্গিত। অধ্যাদেশ, সাংবিধানিক পরিষদ, সুকুম্বাসী বসতিতে উচ্ছেদ অভিযান, বিচারব্যবস্থা ও সংসদের ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলো দেখাচ্ছে যে দেশ এখন শুধু ক্ষমতার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং শাসনব্যবস্থার পুনঃসংজ্ঞায়নের বিতর্কেও প্রবেশ করেছে।
বিরোধী দলগুলো সরকারের বিরুদ্ধে সংসদকে পাশ কাটিয়ে অধ্যাদেশের মাধ্যমে শাসন চালানোর অভিযোগ তুলেছে। তাদের মতে, এটি গণতান্ত্রিক চর্চার ওপর আঘাত। অন্যদিকে, সরকারপন্থী মহল এবং নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীদের যুক্তি ভিন্ন। তাদের মতে, দশকের পর দশক ধরে পুরনো রাজনৈতিক দলগুলো যে জটিল, ধীরগতির ও স্বার্থনির্ভর প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করেছে, তা দেশকে নিষ্ক্রিয়তা, দুর্নীতি এবং সিদ্ধান্তহীনতার চক্রে আটকে ফেলেছে। তাই বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
এই প্রেক্ষাপটে “জেন জি আন্দোলন” যে শাসন সংস্কারের বিতর্ক সামনে এনেছে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই আন্দোলন কেবল নতুন মুখের দাবি নয়; বরং এটি রাষ্ট্র পরিচালনার পুরনো মানসিকতা, রাজনৈতিক ভাগবাটোয়ারা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার ধীরগতির অবসান চাওয়া এক প্রজন্মের অভিব্যক্তি। জনগণ এখন আর শুধু ভাষণ নয়, বাস্তব ফলাফল চায়। তারা স্থিতিশীলতা, সুশাসন, কার্যকর সেবা এবং দ্রুত উন্নয়ন প্রত্যাশা করছে। সেই প্রত্যাশা থেকেই বর্তমান সরকার কেন্দ্র, প্রদেশ ও স্থানীয় স্তরের প্রশাসনিক কাঠামোয় “ফাস্ট ট্র্যাক” সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
বাস্তবে নেপালের প্রশাসনিক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই সংস্কারের অপেক্ষায় রয়েছে। নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে দূরত্ব, মন্ত্রণালয়গুলোর দ্বৈত ভূমিকা, সাংবিধানিক সংস্থাগুলোর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্থানীয় স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত প্রশাসনিক ধীরগতি—এসব কারণে রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার যদি অধ্যাদেশের মাধ্যমে কিছু কাঠামোগত সংস্কার এগিয়ে নিতে চায়, তবে সেটিকে সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখার যুক্তিকে পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—সংস্কারের নামে কি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করা যায়? এখানেই বর্তমান বিতর্ক জটিল হয়ে ওঠে। গণতন্ত্র শুধু ফলাফলের ব্যবস্থা নয়; এটি প্রক্রিয়া ও অংশগ্রহণেরও ব্যবস্থা। সংসদকে পাশ কাটিয়ে করা সংস্কার স্বল্পমেয়াদে গতি আনতে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদে বৈধতা ও ঐকমত্যের ভিত্তিকে দুর্বল করার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। তাই সরকারের উচিত সংস্কারের গতি এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা।
সুকুম্বাসী বসতিতে উচ্ছেদ অভিযানও এই বিতর্কের আরেকটি সংবেদনশীল দিক হয়ে উঠেছে। সরকারপন্থীদের মতে, সরকারি জমি দখলমুক্ত করা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জরুরি। বিশেষ করে কাঠমান্ডু মহানগর কর্তৃপক্ষের অবৈধ বসতি, নদীর তীর দখল এবং অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানকে অনেক নাগরিক নগর সংস্কারের সাহসী সূচনা হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। অতীতে রাজনৈতিক আশ্রয়ের কারণে যেখানে আইন কার্যকর করা সম্ভব হয়নি, সেখানে এখন রাষ্ট্র সক্রিয় হয়েছে—এমন অনুভূতি জনমনে তৈরি হয়েছে।
তবে আরেকটি বাস্তবতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সুকুম্বাসী সমস্যা শুধু অবৈধ বসতির প্রশ্ন নয়; এটি দারিদ্র্য, বেকারত্ব, ভূমি সংস্কারের ব্যর্থতা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অবহেলার সঙ্গে জড়িত একটি মানবিক সংকট। উন্নয়নের নামে গরিব মানুষের ওপর বুলডোজার চালানো হলে, পুনর্বাসন, বিকল্প আবাসন এবং সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকলে রাষ্ট্রের সংবেদনশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। তাই এখানেও আইনের শাসন ও মানবিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য অপরিহার্য।
বিরোধী দলগুলোর ভিন্নমত রাজনৈতিকভাবে স্বাভাবিক। গণতন্ত্রে সরকারের সমালোচনা করা এবং প্রশ্ন তোলা বিরোধী দলের দায়িত্ব। কিন্তু বর্তমানে জনগণের অসন্তোষ শুধু বর্তমান সরকারের প্রতি নয়, বরং দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা পুরনো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রতিও কেন্দ্রীভূত। এই কারণেই জনমনে “পুরনো রাজনৈতিক ধারা দিয়ে দেশ বদলানো সম্ভব নয়” — এমন ধারণা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। জনগণ এখন পরিবর্তনের ভাষণ নয়, বাস্তব ফলাফলসহ পরিবর্তন চায়।
নেপাল বর্তমানে অর্থনৈতিক মন্দা, যুবসমাজের বিদেশমুখী হওয়া, দুর্বল উৎপাদন ব্যবস্থা, দুর্নীতি, প্রশাসনিক জড়তা এবং রাজনৈতিক অবিশ্বাসের মতো বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। তবে সেই সিদ্ধান্তগুলো হতে হবে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনকেন্দ্রিক। সংস্কারের নামে যদি ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঘটে, তবে তা নতুন এক ভারসাম্যহীনতার জন্ম দিতে পারে। আবার সংস্কারের ভয় দেখিয়ে কোনো পরিবর্তনই না করা দেশের জন্য সমান ক্ষতিকর হবে।
আজকের নেপালের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো রাজনৈতিক সাহস এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রজ্ঞার সমন্বয়। সরকারের দ্রুত সংস্কার আনার অধিকার আছে, তবে সেই অধিকার জনগণের আস্থা এবং সাংবিধানিক সীমারেখার মধ্যে প্রয়োগ করতে হবে। বিরোধীদের সমালোচনার অধিকার আছে, কিন্তু শুধু বাধা দেওয়ার জন্য বাধা সৃষ্টি করার রাজনীতি জনগণ আর সহজে গ্রহণ করবে না।
সবশেষে, বর্তমান রাজনৈতিক সংঘাতকে শুধুমাত্র ক্ষমতার লড়াই হিসেবে দেখলে যথেষ্ট হবে না। এটি নেপাল কোন পথে এগোবে, সেই নির্ধারক বিতর্কেরও সূচনা। পুরনো কাঠামোর ধারাবাহিকতা নাকি নতুন ব্যবস্থার পরীক্ষা—এই প্রশ্ন এখন শুধু সংসদের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়, জনপরিসরেও আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। যদি সরকার জনআকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী ফলাফল দিতে সক্ষম হয়, তবে বর্তমান বিরোধিতা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে। কিন্তু যদি সংস্কারের নামে অসামঞ্জস্য, দমন বা অসংবেদনশীলতা বাড়ে, তবে এই অসন্তোষই ভবিষ্যতে আরেকটি বড় রাজনৈতিক বিস্ফোরণের কারণ হয়ে উঠতে পারে।











