কলকাতা(বেবি চক্রবর্ত্তী): ভোরের অন্ধকার ধীরে ধীরে আলোয় মিলিয়ে যেতেই শিয়ালদা রেলস্টেশনে শুরু হয় মানুষের অবিরাম ঢল। শহর তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, কিন্তু শিয়ালদা তখনই কার্যত এক অচল-চঞ্চল জনসমুদ্র। হাতে ব্যাগ, কাঁধে দায়িত্ব, চোখে ক্লান্তি আর তাড়াহুড়োর ছাপ—এই নিত্যযাত্রীরাই প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধে এই স্টেশনের সঙ্গে অদৃশ্যভাবে জড়িয়ে থাকেন।
শিয়ালদায় ট্রেনযাত্রা কোনো সাধারণ যাত্রা নয়, বরং এক প্রতিদিনের কঠিন পরীক্ষা। প্ল্যাটফর্মে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই ভিড়ের ঢেউ শরীরে আছড়ে পড়ে। এতটাই ঘন ভিড় যে অনেক সময় নিজের অস্তিত্বও যেন হারিয়ে যায়। শ্বাস নেওয়ার জায়গা, দাঁড়ানোর স্বস্তি—সবই এখানে বিলাসিতা।
ট্রেন ঢোকার মুহূর্তে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। নামার আগেই ওঠার চেষ্টা, ধাক্কাধাক্কি, চিৎকার, হুড়োহুড়ি—সব মিলিয়ে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। বয়স্ক ও মহিলা যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখে পড়েন। প্ল্যাটফর্ম ও ট্রেনের উচ্চতার ব্যবধান বহুবার দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্টেশনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়েও যাত্রীদের গভীর ক্ষোভ রয়েছে। প্ল্যাটফর্মজুড়ে জমে থাকা আবর্জনা, প্লাস্টিক, খাবারের উচ্ছিষ্ট পরিবেশকে অস্বাস্থ্যকর করে তুলেছে। শৌচাগারের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ এবং পানীয় জলের ব্যবস্থাও অপর্যাপ্ত ও অকার্যকর।
বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থার অভাবে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হন যাত্রীরা। বিশেষ করে প্রবীণ, অসুস্থ ও গর্ভবতী মহিলাদের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত কষ্টকর। অনেকেই বাধ্য হয়ে মেঝেতে বসেন, যা একটি ব্যস্ত মহানগরের প্রধান স্টেশনের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক ছবি।
নিরাপত্তার অভাবও স্পষ্ট। পর্যাপ্ত রেল পুলিশ না থাকায় চুরি, পকেটমারি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রায় নিয়মিত। ভিড়ের সুযোগে সক্রিয় হয়ে ওঠে অসাধু চক্র। একই সঙ্গে মহিলাদের হয়রানির অভিযোগও বারবার সামনে আসে।
স্টেশনের প্রবেশ ও প্রস্থান পথ, ওভারব্রিজ ও সিঁড়িগুলি অনেক ক্ষেত্রেই সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। সন্ধ্যার পর অন্ধকার ও ভাঙাচোরা অবকাঠামো পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। ওভারব্রিজে অতিরিক্ত ভিড় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ায়।
হকারদের অনিয়ন্ত্রিত উপস্থিতিও চলাচলের পথে বাধা সৃষ্টি করে। প্ল্যাটফর্মে দোকান বসার কারণে ভিড় আরও ঘনীভূত হয় এবং যাত্রীদের চলাচল ব্যাহত হয়।
প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ যাত্রীদের জন্য লিফট ও এস্কেলেটর পর্যাপ্ত নয় বা অনেক ক্ষেত্রে অকেজো, ফলে সিঁড়িই তাদের একমাত্র ভরসা।
টিকিট পরিষেবাতেও দুর্ভোগ অব্যাহত। বন্ধ কাউন্টার, দীর্ঘ লাইন এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ে।
এর পাশাপাশি কিছু এলাকায় অসামাজিক কার্যকলাপ, বিশেষ করে নাবালকদের মাদক সেবনের মতো উদ্বেগজনক চিত্রও দেখা যাচ্ছে, যা আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
শিয়ালদা দক্ষিণ শাখায় ট্রেনের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় অফিস টাইমে ভিড় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ক্যানিং, ডায়মন্ড হারবার, লক্ষ্মীকান্তপুর, নামখানা—সব রুটেই অতিরিক্ত ভিড় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। উত্তর শাখায়ও বনগাঁ, বারাসাত, কৃষ্ণনগর, গেদে ও শান্তিপুর রুটে একই চিত্র দেখা যায়।

যাত্রীদের অভিযোগ, ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো এবং সময়সূচি আরও নিয়মিত না করলে এই ভোগান্তি কমবে না। একই সঙ্গে কিছু প্ল্যাটফর্মে ট্রেন ও প্ল্যাটফর্ম উচ্চতার পার্থক্য যাত্রী নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবুও প্রতিদিন এই সমস্ত সমস্যাকে সঙ্গী করেই চলতে থাকে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনযাত্রা। শিয়ালদা যেন এক বিশাল প্রতিচ্ছবি—সাধারণ মানুষের সংগ্রাম, ক্লান্তি ও বেঁচে থাকার নিরন্তর লড়াইয়ের।
প্রশ্ন একটাই থেকে যায়—কবে বদলাবে এই চিত্র? কবে শিয়ালদা সত্যিকারের যাত্রীবান্ধব স্টেশনে পরিণত হবে? নিত্যযাত্রীদের এই নীরব আর্তনাদ কবে শোনা যাবে?










