বীরগঞ্জের প্রতি রাষ্ট্রের সৎমা-সুলভ আচরণ: রাজস্বের মেরুদণ্ডকে বুলডোজার দিয়ে পিষে দেওয়াই কি উন্নয়ন?

3f1e880e-ed22-4d86-8683-c8052ef1fec1

– সুনিতা সাহ
নেপালের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী শিল্প ও বাণিজ্যিক নগরী বীরগঞ্জ আজ তার অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য সংগ্রাম করতে বাধ্য হচ্ছে। দেশের রাজস্ব সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই শহরকে উন্নয়ন ও অবকাঠামোর নামে ধারাবাহিকভাবে উপেক্ষা করা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। সড়ক সম্প্রসারণের নামে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিকদের বাড়িঘর ও বিভিন্ন স্থাপনার ওপর চালানো বুলডোজার দেখে প্রশ্ন উঠছে—উন্নয়নের নামে কি ধ্বংসের নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে? মিতেরি সেতু থেকে সিমরা, জিতপুর হয়ে হেটৌঁডা পর্যন্ত সংযুক্ত একই বাণিজ্যিক মহাসড়কে রাষ্ট্রের ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করা আরও গুরুতর বিষয়। একই মহাসড়কের অন্তর্ভুক্ত হেটৌঁডা এলাকায় সড়কের প্রস্থসংক্রান্ত মানদণ্ডে তুলনামূলকভাবে নমনীয়তা দেখানো হয়, অথচ বীরগঞ্জের ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চলে ২৫/২৫ মিটার সড়ক সম্প্রসারণের নামে বাড়িঘর, ব্যবসা এবং নাগরিকদের জীবিকার ওপর সরাসরি আঘাত হানা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এই নীতির কারণ কী? একই দেশ, একই মহাসড়ক এবং একই আইনের শাসনের অধীনে দুটি শহরের জন্য ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড কেন? আজ বীরগঞ্জবাসী রাষ্ট্রের কাছে এই প্রশ্নই রাখছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বীরগঞ্জের প্রধান শুল্ক এলাকা অবস্থিত আইসিপি থেকে ত্রিভুবন রাজপথ পরিচালনার বিষয়ে নেপাল সরকারের মন্ত্রিসভা ২০৭২ সালেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং উক্ত সড়ককে জাতীয় মহাসড়ক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল—এমন দাবি রয়েছে। সেই অনুযায়ী ২৫/২৫ মিটার, অর্থাৎ প্রায় ১৬৫ ফুট প্রশস্ত ত্রিভুবন রাজপথের বিকল্প ব্যবস্থা আগে থেকেই বিদ্যমান থাকা অবস্থায় ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চলে আবারও একই মানদণ্ড প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একইভাবে, বীরগঞ্জ মহানগরের প্রবেশপথ গণ্ডক চৌক থেকে শুল্ক এলাকা পর্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে তৎকালীন নগরপ্রধান বিমল প্রসাদ শ্রীবাস্তবের কার্যকালে ১৫/১৫ মিটার প্রশস্ত বাইপাস সড়ক নির্মাণ করা হয়েছিল। যদি বিকল্প সড়ক অবকাঠামো এবং আইনি ভিত্তি আগে থেকেই বিদ্যমান থাকে, তাহলে নাগরিকদের বাড়িঘর, ব্যবসা ও কর্মসংস্থান উচ্ছেদের মতো সড়ক সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে সেই বিকল্পগুলোর গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয় না কেন? উন্নয়ন প্রয়োজন, কিন্তু উন্নয়নের অর্থ নাগরিকদের উচ্ছেদ করে একটি শহরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ধ্বংস করা নয়। আজ সড়ক সম্প্রসারণের সরাসরি প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ১,৫০০টি পরিবার এই প্রশ্নকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। বাড়িঘর ভেঙে যাওয়ার পর তাদের খাদ্য, বাসস্থান, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে? রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করে, তখন তাদের পুনর্বাসন, যথাযথ ক্ষতিপূরণ এবং বিকল্প ব্যবস্থার বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা কি প্রকাশ করা উচিত নয়? দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা একটি শহরের নাগরিকদের উচ্ছেদ করে কী ধরনের উন্নয়ন মডেল প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হচ্ছে? বীরগঞ্জের আরেকটি বড় কষ্ট হলো—রাজস্ব সংগ্রহে অবদান রাখার সময় তাকে অগ্রসারিতে রাখা হয়, কিন্তু অবকাঠামো, অধিকার, সম্মান ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন উঠলে তাকে উপেক্ষা করা হয়। রাষ্ট্র বীরগঞ্জকে শুধুমাত্র শুল্ক ও রাজস্ব সংগ্রহের কেন্দ্র হিসেবে দেখতে পারে না। এটি ইতিহাস, শিল্প, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং লাখ লাখ নাগরিকের জীবনের সঙ্গে জড়িত একটি শহর। ‘সমৃদ্ধ বীরগঞ্জ’ বা ‘বৈভব বীরগঞ্জ’-এর মতো স্লোগান তখনই অর্থবহ হবে, যখন বীরগঞ্জবাসীর বাড়িঘর, ব্যবসা, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ নিরাপদ থাকবে। স্থানীয় সরকারকেও উন্নয়নের নামে নাগরিকদের দুর্ভোগ উপেক্ষা না করে তাদের অধিকার ও কণ্ঠস্বরের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সামনে আসতে হবে। তাই মহানগর নেতৃত্বকেও সড়ক সম্প্রসারণের বিষয়ে তাদের সুস্পষ্ট অবস্থান, বিকল্প পরিকল্পনা এবং নাগরিকদের পুনর্বাসনের বিষয়ে নিজেদের দায়িত্ব প্রকাশ্যে জানানো প্রয়োজন। আমরা উন্নয়নের বিরোধী নই। আমরা বৈষম্যমূলক উন্নয়নের বিরোধী। সড়ক প্রশস্ত করা প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু এর জন্য বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা, অভিন্ন মানদণ্ড, বিকল্প সড়ক, যথাযথ ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। যদি একটি শহরে এক ধরনের মানদণ্ড এবং অন্য শহরে ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি ও যৌক্তিকতা রাষ্ট্রকে অবশ্যই স্পষ্ট করতে হবে। বীরগঞ্জকে উন্নয়নের নামে উজাড় করা নয়, বরং পরিকল্পিত, নিরাপদ, আধুনিক ও সমৃদ্ধ শহর হিসেবে গড়ে তোলার নীতি প্রয়োজন। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে সড়ক সম্প্রসারণসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং তার বাস্তবায়ন পুনর্বিবেচনা করতে হবে। বিদ্যমান বিকল্প সড়ক, আইনি ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত সম্ভাবনাগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করে নাগরিকদের বাড়িঘর, জমি ও কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত ও উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর জন্য স্বচ্ছ ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা দিতে হবে। যদি বীরগঞ্জ রাষ্ট্রের রাজস্বের মেরুদণ্ড হয়, তাহলে বীরগঞ্জের নাগরিকরাও এই রাষ্ট্রের সমান অধিকারসম্পন্ন নাগরিক। রাষ্ট্রকে বীরগঞ্জকে কেবল কর ও রাজস্ব আদায়ের অঞ্চল হিসেবে নয়, বরং সমান অধিকার, সম্মান ও উন্নয়নের দাবিদার একটি শহর হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। অন্যথায় উন্নয়নের নামে চালানো প্রতিটি বুলডোজার শুধু একটি বাড়ি নয়—বীরগঞ্জবাসীর বিশ্বাস, ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎকেও ধ্বংস করবে। (লেখিকা নারী অধিকারকর্মী। তিনি নেপাল সমতা পার্টির কেন্দ্রীয় ভাইস-চেয়ারপারসন।)

About Author

Advertisement