বর্তমান আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ভারতের অবস্থান

IMG-20260328-WA0003(1)

বেবি চক্রবর্ত্তী

বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতি কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, কূটনীতি এবং ভূরাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশ্বায়নের ফলে একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি অন্য দেশগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত আজ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিশাল জনসংখ্যা, দ্রুত বর্ধনশীল বাজার, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী পরিষেবা খাত ভারতের অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ গুরুত্ব এনে দিয়েছে।
গত দুই দশকে ভারতের অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধশিল্প, মহাকাশ গবেষণা, ডিজিটাল অবকাঠামো, স্টার্টআপ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ভারত আগামী বছরগুলোতেও বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর একটি হিসেবে থাকবে।
আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ভারতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব:-
বর্তমানে ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। যদিও মুদ্রার বিনিময় হার ও পরিসংখ্যানগত সংশোধনের কারণে নামমাত্র জিডিপি অনুযায়ী অবস্থানে পরিবর্তন হতে পারে, তবুও ভারতের অর্থনৈতিক ভিত্তি ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, দক্ষ মানবসম্পদ এবং দ্রুত নগরায়ন ভারতের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করছে।
ভারতের অর্থনীতির অন্যতম শক্তি হলো এর অভ্যন্তরীণ চাহিদা। বিশ্বের অনেক দেশ যেখানে রপ্তানিনির্ভর, সেখানে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশ দেশীয় ভোগব্যয় ও পরিষেবা খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সময়ও ভারত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে।
বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারতের অবস্থান:-
ভারত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা, ওষুধ, বস্ত্র, প্রকৌশল পণ্য, রাসায়নিক দ্রব্য, হীরা ও গয়না, কৃষিপণ্য এবং অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ রপ্তানির ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান উল্লেখযোগ্য।
ভারতের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর এবং অস্ট্রেলিয়া। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করার চেষ্টা করছে।
তথ্যপ্রযুক্তি ও পরিষেবা খাতে ভারতের নেতৃত্ব:-
বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো তথ্যপ্রযুক্তি ও পরিষেবা খাত। বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, পুনে, চেন্নাই ও গুরগাঁওয়ের মতো শহরগুলো আন্তর্জাতিক আইটি শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংক, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, উৎপাদন ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সফটওয়্যার, ক্লাউড কম্পিউটিং, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং তথ্য বিশ্লেষণ সংক্রান্ত সেবা প্রদান করছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি ভারতের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মর্যাদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
উৎপাদন শিল্প ও “মেক ইন ইন্ডিয়া”:-
ভারত উৎপাদন শিল্পে বৈশ্বিক কেন্দ্র হওয়ার লক্ষ্যে “মেক ইন ইন্ডিয়া” উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্পায়ন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইলেকট্রনিক্স, মোবাইল ফোন, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, অটোমোবাইল, সেমিকন্ডাক্টর, সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য আধুনিক শিল্পে ভারত দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করছে। বিশ্বের বহু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ভারতে উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করছে, যা আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ভারতের ভূমিকা বৃদ্ধি করছে।
বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই):-
গত কয়েক বছরে ভারত বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আর্থিক পরিষেবা, উৎপাদন শিল্প এবং ই-কমার্স খাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সরকার ব্যবসাবান্ধব নীতি, কর সংস্কার, ডিজিটাল প্রশাসন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ আরও অনুকূল করার চেষ্টা করছে। যদিও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কারণে আরও সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।
ডিজিটাল অর্থনীতিতে ভারতের সাফল্য:-
ভারতের ডিজিটাল বিপ্লব আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা, ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস (ইউপিআই), ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা, অনলাইন ব্যাংকিং এবং ই-গভর্ন্যান্স বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে।
বর্তমানে কোটি কোটি মানুষ ডিজিটাল আর্থিক সেবা ব্যবহার করছে। ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্টার্টআপ এবং সাধারণ নাগরিকেরা ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছে। ডিজিটাল অবকাঠামোর এই উন্নয়ন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও ভারতকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থায় ভারতের ভূমিকা:-
ভারত বর্তমানে জি-২০, ব্রিকস, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বিশ্ব অর্থনীতির বিভিন্ন নীতি নির্ধারণে ভারতের মতামত ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় ভারত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে এবং বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ব্রিকসের সম্প্রসারণ এবং নতুন অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ভারতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
যদিও ভারতের অর্থনীতি দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে, তবুও কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
প্রথমত, বেকারত্ব এখনও একটি বড় সমস্যা। প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
দ্বিতীয়ত, অবকাঠামোগত উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন। উন্নত সড়ক, বন্দর, রেলপথ, বিদ্যুৎ এবং লজিস্টিক ব্যবস্থার উন্নয়ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ভারতের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।
তৃতীয়ত, বৈশ্বিক রাজনৈতিক উত্তেজনা, তেলের মূল্যবৃদ্ধি, যুদ্ধ, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিরোধ ভারতের অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী ভারতের শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা এই ধরনের বৈশ্বিক ধাক্কা সামলাতে সহায়তা করে।
ভারতের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। তরুণ জনসংখ্যা, দ্রুত প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, মহাকাশ গবেষণা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগ ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা মনে করছে যে আগামী দশকে ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে, যদি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
বর্তমান আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং ক্রমবর্ধমান শক্তি। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শক্তিশালী পরিষেবা খাত, ডিজিটাল উদ্ভাবন, বৈদেশিক বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মাধ্যমে ভারত বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। যদিও বেকারত্ব, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের নানা চ্যালেঞ্জ এখনও বিদ্যমান, তবুও ভারতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অত্যন্ত ইতিবাচক।
সঠিক নীতি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে ভারত ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। তাই বলা যায়, বর্তমান আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ভারতের অবস্থান শুধু শক্তিশালীই নয়, বরং আগামী দশকগুলোতে তা আরও প্রভাবশালী হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল।

About Author

Advertisement