নয়াদিল্লি: সংসদ ভবনের দিকে এগিয়ে চলেছে বিশাল এক বিক্ষোভ মিছিল, বাতাসে ভাসছে টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়া, আর রাস্তায় ক্ষুব্ধ তরুণদের ভিড়। সোমবার নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর এলাকার এই দৃশ্যটি কেবলই কোনো সাধারণ বিক্ষোভ ছিল না; এটি ছিল ভারতীয় গণমাধ্যমের বর্তমান পরিস্থিতিরও এক প্রতিফলন।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র আয়োজিত ‘পার্লামেন্ট মার্চ’-এর সময় মূলধারার কিছু সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকের বিরুদ্ধে স্লোগান তোলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের জগতে এক তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে: মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদক এবং স্টুডিও-ভিত্তিক উপস্থাপক—যাঁরা মূলত আলোচনার বিষয়বস্তু বা ‘এজেন্ডা’ নির্ধারণ করেন—তাঁদের মধ্যকার পার্থক্য সাধারণ মানুষ কীভাবে দেখেন? পাশাপাশি, সংবাদমাধ্যমের প্রতি এই ক্ষোভের যৌক্তিকতা—কিংবা এর সম্ভাব্য বিপদ—নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
গত বছর নেপালে ‘জেন-জি’ আন্দোলনের সময় ‘কান্তিপুর’ পত্রিকা অফিসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা হোক কিংবা বাংলাদেশে ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর ওপর হামলা—দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে সংবাদমাধ্যমগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর বিষয়টি আর কোনো নতুন ঘটনা নয়। দিল্লির যন্তর মন্তরের ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেয় যে, ভারতেও এই প্রবণতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের ওপর হামলার পর, ভারতীয় সাংবাদিকতা জগৎ যেন দুটি ভিন্ন শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ছে।
সাংবাদিক পুনম পান্ডে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন যে, গণমাধ্যমের ওপর ক্ষোভ থাকাটা স্বাভাবিক হলেও, তীব্র গরম ও বৃষ্টির মধ্যে মাঠে-ময়দানে কঠোর পরিশ্রম করা সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করা অনুচিত; বরং এই ক্ষোভ সঠিক মহলের দিকেই নির্দেশ করা উচিত। এর জবাবে ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য হিন্দু’-র ডেপুটি এডিটর বিজয়তা সিং যুক্তি দিয়েছেন যে, ঘৃণা ছড়ানো প্রবীণ টিভি উপস্থাপক এবং রাস্তায় কঠোর পরিশ্রম করা সাংবাদিকদের মধ্যে পার্থক্য করাটা জরুরি। তবে ‘দ্য প্রিন্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রবীণ সাংবাদিক শেখর গুপ্ত এই যুক্তি খারিজ করে দিয়ে বলেছেন যে, কোন সাংবাদিককে পছন্দ বা অপছন্দ করা হবে—সেই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই উগ্র জনতা বা ‘মব’-এর ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।
তিনি উল্লেখ করেন যে, কর্মরত অবস্থায় সাংবাদিকদের—তাঁরা জ্যেষ্ঠ বা কনিষ্ঠ যা-ই হোন না কেন—পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করা আবশ্যক; কারণ এক দলের কাছে যিনি ‘নায়ক’, অন্য দলের কাছে তিনি ‘খলনায়ক’ হতে পারেন। গুপ্ত দাবি করেন যে, এই প্রবণতার সূচনা হয়েছিল ২০১১ সালের ‘আন্না আন্দোলন’ থেকে। ‘অল্ট নিউজ’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা প্রতীক সিনহা শেখর গুপ্তের যুক্তির সাথে একমত বলে মনে হয়নি। সিনহা বলেন, কেউ যখন কোনো কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা বা প্রচার-যন্ত্রের অংশ হয়ে ওঠেন, তখন তাঁকে সেই সিদ্ধান্তের সামাজিক ও নৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়—ঠিক যেমন লাঠিধারী কোনো পুলিশ কনস্টেবলকে তাঁর কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হয়।
এরই মধ্যে, ‘নিউজলন্ড্রি’-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা অভিনন্দন সেখরি এবং প্রবীণ সাংবাদিক অভিসার শর্মাও ভারতীয় গণমাধ্যমের বর্তমান পরিস্থিতি ও ক্ষমতাসীনদের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠতার প্রসঙ্গ তুলে মূলধারার গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
অন্যদিকে, ‘আজ তক’-এর রাজনৈতিক সম্পাদক মৌসুমি সিং সাংবাদিকদের ওপর যেকোনো ধরনের সহিংসতার নিন্দা করেছেন; তিনি উল্লেখ করেছেন যে, শবরীমালা ও কৃষক আন্দোলনের সময় তিনিও নিজে হুমকি ও দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছিলেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের গণমাধ্যমগুলো স্পষ্টভাবে দুটি মেরুতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে: ‘সরকার-ঘেঁষা’ এবং ‘সরকার-বিরোধী’।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শাসনামলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের অনানুষ্ঠানিক প্রবেশাধিকার সীমিত হওয়া, টেলিভিশন বিতর্কের মান কমে যাওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষোদগারের ফলে সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রবীণ কলামিস্ট তাভলিন সিং তো এ কথাও বলেছেন যে, আজকের তথাকথিত স্বাধীন টিভি চ্যানেলগুলোর দিকে তাকালে তাঁর লজ্জা হয় এবং তাদের উচিত নিজেদের ‘দূরদর্শন ২.০’ হিসেবে ঘোষণা করা।
যন্তর মন্তরের এই বিক্ষোভ কেবল নিট পরীক্ষার অনিয়ম ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিকেই সামনে আনেনি, বরং ভারতীয় গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের মধ্যকার গভীর সংকট ও মেরুকরণকেও পুরোপুরি উন্মোচিত করেছে। ন্যায়বিচার ও সত্য প্রতিষ্ঠার ভার জনতা নিজের হাতে তুলে নেওয়ার যে চেষ্টা করছে তা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা হারিয়ে ক্ষমতাসীনদের হাতিয়ারে পরিণত হওয়াটা আরও অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। দিল্লির রাস্তায় যে সংঘাত দেখা গেছে, তা ভারতীয় গণমাধ্যমকে এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে—যা গভীর আত্মসমালোচনার দাবি রাখে।










