নেপালে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তর নিয়ে ক্রমবর্ধমান বিতর্ক

c7d33105-506c-4e81-9f8c-bfaf69c6dc45

জাতীয় পরিচয়, নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মীয় স্বাধীনতার সামনে চ্যালেঞ্জ

দেশবন্ধু বিশ্বামিত্র

নেপালের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিচয় হাজার হাজার বছরের সভ্যতাগত বিকাশ, আধ্যাত্মিক চিন্তাভাবনা এবং নিজস্ব ঐতিহ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। হিন্দু ও বৌদ্ধ দর্শনের ঐতিহাসিক ভূমি নেপালে কিরাত, প্রকৃতিপূজক, ইসলাম, খ্রিস্টধর্মসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়েরও উপস্থিতি রয়েছে। মঠ-মন্দির, বৌদ্ধবিহার, ধর্মীয় শোভাযাত্রা, উৎসব, লোকসংগীত, সাহিত্য, শিল্পকলা ও আচার-অনুষ্ঠান নেপালি সভ্যতার স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করেছে। এমন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে গত কয়েক দশকে খ্রিস্টধর্মের প্রসার, বিদেশি ধর্মপ্রচারকদের সক্রিয়তা এবং ধর্মান্তর-সংক্রান্ত বিতর্ক জাতীয় আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এর ফলে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ ও জাতীয় পরিচয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
এই প্রসঙ্গে মোরং জেলার কানে পোখরি গ্রামপালিকা–৭, বরগাছিতে বিদেশি নাগরিকদের অংশগ্রহণে আয়োজিত একটি স্বাস্থ্যশিবির সম্পর্কে প্রকাশিত সংবাদ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সংবাদ অনুযায়ী, ‘মার্সি ডেভেলপমেন্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যশিবিরে ব্রাজিল, কানাডা ও আমেরিকার মোট দশজন বিদেশি নাগরিক অংশ নিয়েছিলেন। পর্যটক ভিসায় নেপালে আসা এই নাগরিকেরা প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া স্বাস্থ্যশিবির পরিচালনার কাজে যুক্ত ছিলেন বলে সন্দেহ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁদের নথিপত্র অভিবাসন বিভাগের কাছে পাঠিয়েছে বলে জানা যায়। স্থানীয় পর্যায়ে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্দেশ্যে তৈরি বলে উল্লেখ করা ভবনগুলো ধর্মীয় কার্যকলাপের জন্যও ব্যবহৃত হওয়া নিয়ে বিতর্কের কথা সংবাদে উঠে এসেছে।
নেপাল দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি নাগরিকদের যাতায়াতের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা একটি দেশ ছিল। বিশেষ করে রানা শাসনামলে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত ছিল। ১৯৫০ সালের পর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক পরিষেবার ক্ষেত্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে। নেপালের ঐতিহাসিক পরিচয় দীর্ঘকাল হিন্দু রাজতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমান সংবিধান নেপালকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। এই ব্যবস্থা সব নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঐতিহাসিক ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সংরক্ষণের গুরুত্বও স্বীকার করে।
নেপালে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ২০২৩ সালে বিবিসি নেপালে দক্ষিণ কোরীয় খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের সক্রিয়তা এবং ধর্মান্তর-সংক্রান্ত বিতর্ক নিয়ে একটি প্রামাণ্য প্রতিবেদন সম্প্রচার করেছিল। এই প্রতিবেদন বিদেশি ধর্মপ্রচারকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও নেপালে খ্রিস্টধর্মের প্রসারকে কেবল বহিরাগত প্রভাবের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না। জাতিগত বৈষম্য, অস্পৃশ্যতা, অর্থনৈতিক দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগের অভাব এবং সামাজিক মর্যাদা অর্জনের আকাঙ্ক্ষার মতো অভ্যন্তরীণ কারণও মানুষের ধর্মীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই এই বিষয়ের পর্যালোচনা করতে গেলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকলাপের পাশাপাশি নেপালি সমাজের বিদ্যমান দুর্বলতাগুলোকেও চিহ্নিত করা জরুরি।
ধর্মীয় প্রচার ও সামাজিক পরিষেবার মধ্যকার সম্পর্ক এই বিতর্কের একটি সংবেদনশীল দিক। স্বাস্থ্যশিবির, ত্রাণ বিতরণ, বৃত্তি এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ মানবকল্যাণের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু এসব পরিষেবার বিনিময়ে কাউকে কোনো ধর্ম গ্রহণের জন্য চাপ দেওয়া হলে অথবা আর্থিক প্রলোভনের মাধ্যমে কারও ধর্মীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা হলে তা গুরুতর নৈতিক ও আইনি প্রশ্নের জন্ম দেয়। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থের উৎস, কর্মসূচির উদ্দেশ্য, ভিসার অবস্থা এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
নেপালের সংবিধানের ধারা ২৬ ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। তবে কাউকে ধর্মান্তরিত করা অথবা অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাসে বিঘ্ন ঘটানোর মতো কাজকেও আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য করা হয়েছে। তাই রাষ্ট্রকে উভয় দিকের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। বেআইনি প্রলোভন, চাপ বা প্রতারণার মাধ্যমে ধর্মান্তর ঘটানোর কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা যেমন জরুরি, তেমনি নিজের ইচ্ছায় ধর্ম পালন করা কিংবা নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তন করা ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্য হওয়া মাত্রই অপরাধের প্রমাণ হতে পারে না।
খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরের ফলে নেপালি সংস্কৃতি, শিল্পকলা ও সাহিত্যের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়েও পর্যালোচনা প্রয়োজন। দশৈঁ, তিহার, ছট, লোসার, উধৌলি-উভৌলি, মাঘি এবং বিভিন্ন স্থানীয় উৎসব নেপালি সমাজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। লোকসংগীত, ভজন, কীর্তন, দেউড়া, মারুনি, লাখে নৃত্য, পৌভা ও মিথিলা চিত্রকলা এবং মৌখিক সাহিত্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নেপালি পরিচয়কে জীবন্ত রেখেছে। ধর্মীয় পরিবর্তনের ফলে কিছু মানুষ ঐতিহ্যগত আচার-অনুষ্ঠান পরিত্যাগ করতে পারেন, যার প্রভাব পারিবারিক ও সামাজিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার ওপর পড়তে পারে। তবে ধর্মান্তরিত সব মানুষ নেপালি সংস্কৃতিকে প্রত্যাখ্যান করেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও যথাযথ নয়। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করা সমগ্র সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।
পরিশেষে, নেপালে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তর-সংক্রান্ত বিতর্ককে ধর্মীয় বিদ্বেষ বা অন্ধবিরোধের বিষয় করে তোলা উচিত নয়। মোরংয়ের ঘটনায় আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে নিরপেক্ষভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে, পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলে কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা উচিত নয়। বিদেশি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকলাপে স্বচ্ছতা, আইনের সমান প্রয়োগ, সামাজিক বৈষম্যের অবসান এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অন্য সম্প্রদায়কে নিষিদ্ধ করে নয়, বরং নিজেদের সভ্যতার প্রতি সচেতনতা ও শ্রদ্ধাবোধকে শক্তিশালী করার মাধ্যমেই নেপালি ধর্ম, সংস্কৃতি, শিল্পকলা ও সাহিত্যকে রক্ষা করা সম্ভব। ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক সংরক্ষণকে পাশাপাশি এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই নেপালের জাতীয় পরিচয়কে সুদৃঢ় করার দায়িত্বশীল পথ।

About Author

Advertisement