নন্দীগ্রামে মমতার সরে দাঁড়ানোয় বাংলায় ফের রাজনৈতিক উত্তাপ, তৃণমূলের ‘নতুন চাল’-এ চ্যালেঞ্জ কার?

PTI07_04_2026_000572B

শিলিগুড়ি(দেবেন্দ্র কে ঢুংগানা): পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ফের একবার নন্দীগ্রামকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনের জন্য তাদের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করার পর রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আগ্রহের বিষয় হল- নন্দীগ্রাম থেকে নিজে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনী ময়দানে নামছেন না। এটিই টিএমসির স্পষ্ট সিদ্ধান্ত।
টিএমসি নন্দীগ্রাম থেকে সঞ্চিতা প্রধান (দে) এবং রেজিনগর থেকে রাবিউল আলম চৌধুরীকে প্রার্থী করেছে। প্রার্থী ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই দল এই বার্তা দিয়েছে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রাম থেকে উপনির্বাচনে লড়বেন না। এই সিদ্ধান্তকে শুধুমাত্র প্রার্থী বাছাই হিসেবে না দেখে টিএমসির পরিবর্তিত রাজনৈতিক কৌশলের ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
নন্দীগ্রাম: একটি বিধানসভা কেন্দ্রের চেয়েও বড় রাজনৈতিক প্রতীক
নন্দীগ্রাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক যাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি এলাকা। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকেই বিজেপি নেতা তথা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরাজিত হয়েছিলেন। তারপর থেকেই নন্দীগ্রাম বাংলার ক্ষমতার লড়াইয়ে একটি প্রতীকী রাজনৈতিক ময়দান হিসেবে থেকে গিয়েছে।
তাই এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নন্দীগ্রাম থেকে নির্বাচনে না লড়ার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে—টিএমসি কি নন্দীগ্রামকে ব্যক্তিগত মর্যাদার লড়াইয়ের পরিবর্তে সাংগঠনিক নির্বাচনী কৌশলের ময়দান হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে?
এটিকে শুধুমাত্র মমতার ‘পিছু হটে যাওয়া’ হিসেবে দেখা তাড়াহুড়োর সিদ্ধান্ত হবে। বরং রাজনৈতিক বিশ্লেষণে মনে করা হচ্ছে, টিএমসি নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি পরীক্ষা করতে চাইছে। মমতা নিজে ময়দানে নামলে উপনির্বাচনের গোটা আলোচনা ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম বিরোধী পক্ষ’-কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হত। কিন্তু দলের প্রার্থীকে সামনে রেখে নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দু টিএমসির সংগঠন, স্থানীয় জনভিত্তি এবং বিরোধীদের প্রভাবের দিকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীর চাপকেও চ্যালেঞ্জ
মমতার সিদ্ধান্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল টিএমসির অভ্যন্তরীণ বিরোধ। দলের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নন্দীগ্রাম থেকে নিজে নির্বাচনে লড়ার জন্য প্রকাশ্যে চাপ দেওয়া হচ্ছিল। তাদের কাছে নন্দীগ্রামে মমতার প্রার্থী হওয়া রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন এবং দলের অভ্যন্তরে নিজেদের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি সুযোগও হতে পারত।
কিন্তু টিএমসির সরকারি গোষ্ঠী প্রার্থী ঘোষণা করে মমতা নিজে নির্বাচনে না লড়ার সিদ্ধান্তকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
এর ফলে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সামনে রাজনৈতিকভাবে দুটি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। প্রথমত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে নির্বাচনী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার তাদের কৌশল তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে না। দ্বিতীয়ত, এখন নন্দীগ্রামের ফলাফলকে টিএমসি নেতৃত্ব নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতার পরীক্ষা হিসেবে তুলে ধরতে পারবে।
শুভেন্দু অধিকারীর প্রভাবের পরীক্ষার ময়দান
নন্দীগ্রামের উপনির্বাচন আরেকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ—এটি শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত বিধানসভা কেন্দ্র।
২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে শুভেন্দু জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছিলেন। এরপর নন্দীগ্রাম তাঁর রাজনৈতিক প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে রয়েছে। এখন মমতা নির্বাচনী ময়দানে না থাকায় নন্দীগ্রামে টিএমসি কেমন ফল করে, সেই প্রশ্ন শুভেন্দু অধিকারীর প্রভাবেরও ফের পরীক্ষা করবে।
অর্থাৎ, এই উপনির্বাচন শুধুমাত্র একটি খালি আসন পূরণের নির্বাচন নয়। এর ফলাফল টিএমসির সাংগঠনিক শক্তি, বিজেপির স্থানীয় প্রভাব এবং নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে।
দুই গোষ্ঠী, একই দলের দাবি: টিএমসির সংকটের আরও একটি অধ্যায়
উপনির্বাচনের প্রস্তুতির পাশাপাশি টিএমসির অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব রাজনৈতিক জটিলতা আরও বাড়িয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকারি পক্ষ এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী পক্ষের মধ্যে দলের নাম এবং দুই ফুলের নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে অধিকার সংক্রান্ত বিরোধ নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত গড়িয়েছে।
দুই পক্ষই নিজেদের প্রকৃত টিএমসি বলে দাবি করছে। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই দুই পক্ষের শুনানি করেছে এবং বিদ্রোহী পক্ষের কাছে অতিরিক্ত নথিপত্রও চেয়েছে। কিন্তু মনোনয়নের সময় ঘনিয়ে এলেও বিরোধ পুরোপুরি মিটে না যাওয়ায় নির্বাচনী পরিবেশে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রার্থী ঘোষণা টিএমসির একটি কৌশলগত রাজনৈতিক বার্তাও হতে পারে, দলের অভ্যন্তরে বিরোধ থাকলেও নির্বাচনী ময়দানে তাদের সংগঠন সক্রিয় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখনও অটুট রয়েছে, এই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা।
রেজিনগরেও সাংগঠনিক পরীক্ষা
রেজিনগর থেকে রাবিউল আলম চৌধুরীকে প্রার্থী করে টিএমসি নন্দীগ্রামের পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। নন্দীগ্রামের নির্বাচন তুলনামূলকভাবে বেশি প্রতীকী এবং উচ্চ রাজনৈতিক উত্তাপের হতে পারে। অন্যদিকে, রেজিনগরের ফলাফল টিএমসির ঐতিহ্যগত সামাজিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী, তারও ইঙ্গিত দিতে পারে।
দুই উপনির্বাচনেই দলের ফলাফল দুর্বল হলে বিরোধীরা সেটিকে টিএমসির অভ্যন্তরীণ সংকটের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করতে পারে। কিন্তু টিএমসি ভালো ফল করলে মমতার নেতৃত্বে দলের সংগঠন এখনও কার্যকর, এই বার্তা দেওয়ার সুযোগ পাবে।
মমতার কৌশল : ব্যক্তিগত লড়াই থেকে সাংগঠনিক লড়াইয়ের দিকে?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নন্দীগ্রাম থেকে নির্বাচনে না লড়ার সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অর্থ সম্ভবত এটাই। নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্বের পরীক্ষা দিতে নিজে নির্বাচনী ময়দানে নামার পরিবর্তে তিনি দলীয় সংগঠনকে সামনে এগিয়ে দিয়েছেন।
বিশেষ করে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মমতা নিজে প্রার্থী হলে বিরোধীদের পক্ষে ‘মমতার হার-জিত’-এর কাহিনি তৈরি করা সহজ হত। কিন্তু দলের প্রার্থীর মাধ্যমে নির্বাচনে লড়লে টিএমসি এটিকে স্থানীয় জনমত এবং সংগঠনের পরীক্ষার বিষয় হিসেবে তুলে ধরতে পারবে।
তবে এই কৌশলে ঝুঁকিও সমানভাবে রয়েছে। টিএমসি দুর্বল ফল করলে বিরোধীরা ‘মমতা নন্দীগ্রামে ময়দানে নামতে ভয় পেয়েছেন’, এই রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে পারে। তাই মমতার অনুপস্থিতি টিএমসির জন্য যেমন কৌশলগত সুযোগ, তেমনই রাজনৈতিক ঝুঁকিও।
৬ অক্টোবরের ভোট দেবে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে ৬ অক্টোবর ভোটগ্রহণ এবং ৯ অক্টোবর গণনা হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগে দলের নাম ও নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে বিরোধ মেটে, নাকি আরও জটিল হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অবশ্য একটি বিষয় স্পষ্ট- নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে নির্বাচনী ময়দানে না থাকলেও নন্দীগ্রামের রাজনীতি থেকে মমতা আলাদা থাকবেন না।
বরং এই উপনির্বাচন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য সরাসরি প্রার্থী না হয়েও তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় সংগঠন এবং নেতৃত্বের সক্ষমতার পরীক্ষা হয়ে উঠবে। অন্যদিকে, বিরোধীদের জন্য নন্দীগ্রামে টিএমসিকে দুর্বল করার একটি সুযোগ তৈরি হবে।
তাই নন্দীগ্রামের আসন্ন উপনির্বাচনকে শুধুমাত্র দুই প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখা যথেষ্ট হবে না। এটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব, শুভেন্দু অধিকারীর প্রভাব, টিএমসির অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে একটি বহুমাত্রিক শক্তি পরীক্ষায় পরিণত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নন্দীগ্রামে মমতা নেই, কিন্তু রয়েছে মমতার রাজনৈতিক ছায়া—আর এই কারণেই বাংলার এই উপনির্বাচন ফের একবার জাতীয় রাজনীতির নজরে এসেছে।

About Author

Advertisement