অভিবাসীরা ক্রমবর্ধমান সংকটের মুখে পড়ায় স্থানীয়দের উদ্বেগ বাড়ছে
নয়াদিল্লি: জাপানের রাজধানী টোকিও থেকে প্রায় এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত উপকূলীয় শহর ফুজি সাওয়ায় প্রথম মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জনসংখ্যা হ্রাস ও বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ফলে তীব্র শ্রমিক সংকটের মুখে পড়া জাপান ক্রমশ বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে; এই পরিবর্তনের ফলে দেশটিতে ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক আরও জোরদার হয়েছে।
ফুজিসাওয়ায় একটি ইসলামি ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কেউ কেউ এটিকে বহু-সাংস্কৃতিক সমাজের পথে একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও, অনেক স্থানীয় বাসিন্দা তাঁদের সামাজিক কাঠামো ও পরিচিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
স্থানীয় বাসিন্দা নোরিকো ইজুমিজাওয়া বলেন, “এর ফলে আমাদের সমাজ কীভাবে বদলে যেতে পারে, তা নিয়ে আমি চিন্তিত।” ইজুমিজাওয়ার মতোই শহরের আরও অনেক বাসিন্দা মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। এ বছরের শুরুর দিকে, স্থানীয় রেলওয়ে স্টেশনের কাছে একটি মসজিদ নির্মাণের প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছিল।
যারা এই প্রকল্পের বিরোধিতা করছেন, তাদের যুক্তি হলো—কাছাকাছি অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী জাপানি শিন্তো মন্দিরের তুলনায় অনেক বড় আকারের একটি মসজিদ নির্মাণ স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের শামিল। জাপানের সোশ্যাল মিডিয়ায় এ বিষয়ে বিদ্বেষপূর্ণ কথাবার্তা ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে এবং এমন খবরও পাওয়া গেছে যে, বিভিন্ন মসজিদে গালিগালাজপূর্ণ ফোন কল ও ইমেল পাঠানো হচ্ছে।
তবে সবাই যে এই নির্মাণের বিরোধী, তা কিন্তু নয়।
মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাবিত স্থানের কাছে একটি কফি শপ পরিচালনাকারী হিরোকি সুজুকা মনে করেন, পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমেই এই বিরোধের সমাধান সম্ভব। তিনি বলেন, “আমি এর তীব্র বিরোধিতা বা প্রকাশ্য সমর্থন—কোনোটাই করছি না। প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত খোলা মনে তাদের এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করা।”
মুসলিম সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতা ও ক্রমেই বেড়ে চলা দূরত্ব
দীর্ঘদিন ধরে জাপানে বসবাসরত মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরা স্থানীয়দের মনোভাবের সাম্প্রতিক পরিবর্তনে উদ্বিগ্ন। ৩৯ বছর বয়সী শ্রীলঙ্কান ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন যে, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি আগের চেয়ে অনেক বেশি নেতিবাচক হয়ে উঠেছে।
মহিউদ্দিন উল্লেখ করেন, “সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই এমন অসংখ্য মন্তব্য চোখে পড়ে যেখানে মানুষকে ‘জাপান ছেড়ে চলে যাওয়ার’ কথা বলা হয়। ইদানীং মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের লক্ষ্য করে মৌখিক হেনস্তার ঘটনাও বেড়ে গেছে।” তিনি আরও বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে শান্ত থাকা এবং ভুল ধারণা দূর করতে নম্রভাবে কথা বলা প্রয়োজন।
এদিকে, সাইতামা প্রিফেকচারের ইয়াসিও মসজিদের প্রতিনিধিত্বকারী ৬১ বছর বয়সী শাকিল মোহাম্মদের মতে, জাপানে বসবাসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো স্থানীয় আইন মেনে চলা।
তিনি বলেন, “আমরা জাপানের রীতিনীতি ও বিধিবিধানকে পূর্ণ শ্রদ্ধা করি। এমনকি যদি কোনো ব্যক্তি অসদাচরণও করেন, তবুও গুটিকয়েক মানুষের কারণে পুরো সম্প্রদায়কে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়।”
জাপানের জনমিতি-সংক্রান্ত সংকট ও অভিবাসন নীতি
জাপান বর্তমানে এক বড় ধরনের জনমিতি-সংক্রান্ত সংকটের মুখোমুখি।
২০২৫ সালের মধ্যে জাপানে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ৪০ লাখের (৪ মিলিয়ন) গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়; এদের মধ্যে অধিকাংশই চীন, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপাইনের নাগরিক। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ২৫ লাখ ৭০ হাজার জন জাপানে কর্মসংস্থানে নিয়োজিত রয়েছেন।
বিদেশি জনগোষ্ঠীর এই ক্রমবর্ধমান সংখ্যার পরিপ্রেক্ষিতে জাপান সরকার ভিসা ও অভিবাসন সংক্রান্ত নিয়মকানুন কঠোর করতে শুরু করেছে। ২০২৬ সালের জুন মাসে সরকার বিদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা ফি প্রায় পাঁচ গুণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়—প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
পাশাপাশি, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে অবস্থানরত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ জোরদার করার লক্ষ্যে অভিবাসন সংস্থার জনবল বাড়ানো হচ্ছে।
সামাজিকভাবে অভিবাসী জনগোষ্ঠীর দৃশ্যমানতা ক্রমশ বেড়ে চলার প্রেক্ষাপটে, জাপান তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক সত্তা অক্ষুণ্ণ রেখে বৈচিত্র্যকে আপন করে নেওয়ার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। ফুজি সাওয়ার বাসিন্দা ইজুমিজাওয়াও স্বীকার করেন, “সত্যি বলতে, আমরা হয়তো সেসব বিষয়কেই ভয় পাই, যা সম্পর্কে আমাদের ভালো ধারণা নেই।”










