চীনের সামরিক নেতৃত্বে ‘শুদ্ধি অভিযান’

IMG-20260829-WA0018

শি চিনফিংয়ের ক্ষমতা, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বিশ্ব কৌশলের নতুন দিক

দেশবন্ধু বিশ্বমিত্র

চীনের সর্বোচ্চ সামরিক কাঠামো সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন (সিএমসি) থেকে জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা ঝাং ইউশিয়া এবং লিউ ঝেনলিকে অপসারণের সিদ্ধান্ত চীনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় দীর্ঘদিন ধরে তদন্তের আওতায় থাকা এই দুই কর্মকর্তাকে ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে পদচ্যুত করার পর চীনের সামরিক নেতৃত্বের ভেতরে চলমান ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

ঝাং ইউশিয়া চীনা সামরিক বাহিনীর অন্যতম জ্যেষ্ঠ ইউনিফর্মধারী কর্মকর্তা ছিলেন, আর লিউ ঝেনলি ছিলেন জয়েন্ট স্টাফ ডিপার্টমেন্টের প্রধান। দুজনেরই দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা ছিল এবং তাঁরা চীনা সামরিক বাহিনীতে অত্যন্ত প্রভাবশালী হিসেবে বিবেচিত হতেন। তাঁদের পদচ্যুতিকে শুধু শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখলে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা হয় না। এর মাধ্যমে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ওপর সামরিক বাহিনী তথা পিপলস লিবারেশন আর্মির পূর্ণ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার প্রেসিডেন্ট শি চিনফিংয়ের প্রচেষ্টারও প্রতিফলন ঘটে।
শি চিনফিং ২০১২ সালে পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণের পর থেকেই দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, রকেট ফোর্স এবং উচ্চপর্যায়ের সামরিক নেতৃত্বে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে চীনা সামরিক বাহিনীতে শুধু দুর্নীতিই নয়, ক্ষমতার ভারসাম্য ও রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রশ্নও গুরুতর হয়ে উঠেছে। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ধারাবাহিকভাবে অপসারণ থেকে বোঝা যায়, শি সামরিক বাহিনীর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করতে চাইছেন।
তবে এর আরেকটি দিকও রয়েছে। চীনের মতো একটি পরাশক্তির সামরিক নেতৃত্বে বারবার উচ্চপর্যায়ের রদবদল সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সাময়িক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর, যুক্তরাষ্ট্র-চীন কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে সামরিক নেতৃত্বের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নেতৃত্ব পরিবর্তনের ফলে চীনের সামরিক কৌশলে তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো পরিবর্তন নাও আসতে পারে; তবে আগামী দিনে কমান্ড কাঠামো, সামরিক আধুনিকীকরণ এবং পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন অগ্রাধিকার দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে, এই ঘটনা শি চিনফিংয়ের ক্ষমতা কতটা কেন্দ্রীভূত হয়ে উঠছে, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। সিএমসিতে শি নিজে এবং শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা ঝাং শেংমিন ছাড়া অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতির পরিস্থিতি সামরিক নেতৃত্বে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। স্বল্পমেয়াদে এটি শিকে আরও শক্তিশালী করলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য এবং সমষ্টিগত নেতৃত্বের ঐতিহ্য নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্ব রাজনীতির জন্য এর তাৎপর্য আরও বিস্তৃত। চীনের সামরিক নেতৃত্বে চলমান পুনর্গঠন কেবল অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি চীনের কৌশলগত আচরণকেও প্রভাবিত করবে—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে। শি যদি সামরিক কাঠামোকে আরও রাজনৈতিকভাবে একীভূত করে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন, তাহলে তাইওয়ান এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে চীন আরও দৃঢ় ও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর নিরাপত্তা কৌশলের ওপর পড়তে পারে।
পরিশেষে, ঝাং ইউশিয়া এবং লিউ ঝেনলির পদচ্যুতি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি চীনের ক্ষমতার রাজনীতির ভেতরে চলমান গভীর পুনর্গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। শি চিনফিংয়ের জন্য এটি সামরিক বাহিনীকে ‘পরিষ্কার’ করার এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করার একটি সুযোগ হতে পারে। তবে চীনের জন্য এটি সামরিক নেতৃত্বের স্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত দিকনির্দেশনা নিয়ে নতুন প্রশ্নও তৈরি করেছে। আগামী দিনে চীনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও সামরিক পুনর্গঠন বিশ্বশক্তির ভারসাম্যে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে থাকবে।

About Author

Advertisement