ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের অবসান, নাকি নতুন ভূ-রাজনৈতিক সংকট?
দেবেন্দ্র কে. ঢুঙ্গানা
কাশ্মীর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শুধুমাত্র ভূখণ্ডগত বিরোধ নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি, নিরাপত্তা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গে যুক্ত একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক প্রশ্ন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর শুরু হওয়া ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের প্রায় আট দশক পেরিয়ে গেলেও কাশ্মীরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আজও অনির্ধারিত। এই সময়ের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে অবিশ্বাস গোটা দক্ষিণ এশিয়াকে অনিরাপদ করে তুলেছে।
তাই কাশ্মীরের প্রশ্নকে এখন আর শুধু কোন দেশের ওই ভূখণ্ডের ওপর অধিকার থাকবে, সেই প্রতিযোগিতার দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়। বরং সেখানকার মানুষের প্রকৃত রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক শান্তির দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কাশ্মীর বিরোধের ঐতিহাসিক পটভূমি যেমন সংবেদনশীল, তেমনই নানা বৈপরীত্যে পরিপূর্ণ। ১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবর পাকিস্তান-সমর্থিত উপজাতীয় সশস্ত্র যোদ্ধাদের কাশ্মীরে প্রবেশ, পরবর্তী সময়ে সংঘটিত হিংসা ও লুটপাট এবং ২৭ অক্টোবর শ্রীনগরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর আগমন এই বিরোধকে সামরিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়।
পাকিস্তান ২৭ অক্টোবরকে কাশ্মীরের কালো দিন হিসেবে স্মরণ করে, কিন্তু ২২ অক্টোবরের ঘটনা সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে নীরব থাকে। অন্যদিকে, ভারত রাজ্য সংযুক্তিকরণ সংক্রান্ত দলিলকে তার সার্বভৌমত্বের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। উভয় পক্ষের ঐতিহাসিক দাবি ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ঊর্ধ্বে উঠে কাশ্মীরের মানুষের ইচ্ছা ও অধিকারকে কেন্দ্রে রাখা আজকের সময়ের দাবি।
১৯৪৮ ও ১৯৪৯ সালে জাতিসংঘের গৃহীত প্রস্তাবগুলিতে কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য গণভোটের ধারণা সামনে আনা হয়েছিল। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজনীয় পূর্বশর্ত এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় আজ পর্যন্ত গণভোট অনুষ্ঠিত হয়নি।
এর ফলে কাশ্মীর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে থেকে গেছে। ভারত কাশ্মীরকে নিজের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে, অন্যদিকে পাকিস্তান একে বিতর্কিত অঞ্চল হিসেবে তুলে ধরে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবি জানায়।
কিন্তু এই দুই অবস্থানের মাঝখানে থাকা তৃতীয় কণ্ঠস্বর, অর্থাৎ ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের থেকে পৃথক একটি স্বাধীন কাশ্মীরের আকাঙ্ক্ষাকেও উপেক্ষা করা যায় না।
২০১৯ সালে ভারত সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা প্রত্যাহার করে। এর ফলে বিরোধটি নতুন রাজনৈতিক মাত্রা লাভ করে। ভারত এই সিদ্ধান্তকে উন্নয়ন, সুশাসন ও নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করেছে। অন্যদিকে সমালোচকেরা একে স্থানীয় রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ও পরিচয়ের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন।
অন্যদিকে পাকিস্তান কাশ্মীরের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে এসেছে। কিন্তু নিজের প্রশাসনাধীন পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, প্রতিনিধিত্ব এবং নাগরিক অধিকার সম্পর্কিত প্রশ্নগুলি থেকেও দেশটি সম্পূর্ণ মুক্ত নয়।
তাই কাশ্মীরের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা শুধু ভারতের নীতির সমালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। একই সঙ্গে পাকিস্তানের আচরণেরও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা হওয়া প্রয়োজন।
২০২৫ সালে পহেলগাম হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সৃষ্ট সামরিক উত্তেজনা, সীমান্তপারের হামলা এবং পরবর্তীকালে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি এই অঞ্চলের নিরাপত্তাগত সংবেদনশীলতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি বজায় থাকলেও দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনা বাধাগ্রস্ত রয়েছে। সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ এবং সমুদ্র অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, কাশ্মীর বিরোধ এখন আর শুধুমাত্র সীমিত ভূখণ্ডের প্রশ্নে আবদ্ধ নেই।
পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুটি দেশের মধ্যে সামান্য সামরিক সংঘর্ষও বৃহত্তর যুদ্ধে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে কাশ্মীরের স্বাধীনতাকে শুধু ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া অথবা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার স্লোগান হিসেবে বোঝা যথেষ্ট নয়।
প্রকৃত স্বাধীনতার অর্থ হলো, নাগরিকেরা যেন নির্ভয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারেন, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেন, অর্থনৈতিক সম্পদের ওপর ন্যায্য অধিকার পান এবং নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় অর্থবহ অংশগ্রহণ করতে পারেন।
হিংসাত্মক উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ কখনোই এই ধরনের স্বাধীনতাকে শক্তিশালী করে না। বরং এগুলি সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরকে দুর্বল করে। একইভাবে নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের নামে নাগরিক অধিকার খর্ব করাও স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।
দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভবিষ্যতের জন্য ভারত ও পাকিস্তানকে এখন প্রতিযোগিতামূলক জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে সহাবস্থানের রাজনীতি গ্রহণ করতে হবে।
কাশ্মীরের মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংলাপ, মানবাধিকার রক্ষা, সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের অবসান, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক আস্থা তৈরিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
জাতিসংঘের ভূমিকা, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাকেও গঠনমূলকভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, কাশ্মীর সমস্যার সমাধান শুধু দিল্লি বা ইসলামাবাদের রাজনৈতিক মর্যাদা রক্ষার জন্য করা কোনও সমঝোতা হওয়া উচিত নয়। এর কেন্দ্রে থাকতে হবে কাশ্মীরের মানুষের ইচ্ছা, মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ।
কাশ্মীরে শান্তি প্রতিষ্ঠার অর্থ শুধু দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানো নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং মানবিক নিরাপত্তার নতুন পথ উন্মুক্ত করা।
কাশ্মীরকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শান্তি ও সহাবস্থানের একটি অভিন্ন ভূমিতে রূপান্তরিত করতে পারাই হবে ভারত, পাকিস্তান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রকৃত কৌশলগত সাফল্য।





