গ্লাসগো: ২০২৬ সালের কমনওয়েলথ গেমসে রৌপ্যপদক জিতে ভারতীয় ভারোত্তোলক রাজা মুথুপান্ডি প্রমাণ করেছেন যে, পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন—শৃঙ্খলা, কঠোর পরিশ্রম ও দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে নিজের স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব।
তিনি লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীর মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দিয়েছেন। পুরুষদের ৬৫ কেজি বিভাগে, মুথুপান্ডি মোট ২৮৬ কেজি (স্ন্যাচে ১২৬ কেজি এবং ক্লিন অ্যান্ড জার্কে ১৬০ কেজি) ওজন তুলে রৌপ্য পদক জয় করেন। এই ইভেন্টে স্বর্ণপদকটি জিতে নেন মালয়েশিয়ার মোহাম্মদ আজনিল বিন বিদিন, যিনি মোট ২৯৯ কেজি ওজন তোলেন; অন্যদিকে, পাপুয়া নিউ গিনির মোরিয়া বারু ২৮২ কেজি ওজন তুলে ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত করেন।
রাজা মুথুপান্ডি ২০০০ সালের ১২ই জানুয়ারি তামিলনাড়ুর কোভিলপট্টিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং অত্যন্ত কষ্টের মধ্য দিয়ে তাঁর শৈশব অতিবাহিত করেন। তাঁর বাবা একটি দিয়াশলাই কারখানায় শ্রমিকের কাজ করতেন এবং মা একটি মিষ্টির দোকানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে দিনে দুবেলা অন্নসংস্থান করাও ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। শুরুতে মুথুপান্ডির বড় ভাই-ই ভারোত্তোলনের প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেছিলেন।
পরবর্তীতে মুথুপান্ডিও তাঁর ভাইয়ের সাথে জিমে যাওয়া শুরু করেন। তবে পারিবারিক দায়িত্বের কারণে তাঁর ভাইকে সেই স্বপ্ন ত্যাগ করতে হয়েছিল। এরপর মুথুপান্ডি নিজের কাঁধে তুলে নেন তাঁর ভাই ও পরিবারের সেই স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব।
২০১৭ সালের কমনওয়েলথ ইয়ুথ অ্যান্ড জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপে পদক জিতে মুথুপান্ডি নিজের পরিচিতি গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে, মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ২০১৮ সালের গোল্ড কোস্ট কমনওয়েলথ গেমসে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেন।
ক্যারিয়ারের ঠিক যখন তিনি সাফল্যের চূড়ায় ছিলেন, তখনই বড় ধরনের এক বিপর্যয়ের মুখে পড়েন এবং ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তাঁকে তিনটি অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। প্রথমে তাঁর বাম কনুইয়ের লিগামেন্টে গুরুতর চোট লাগে এবং পরবর্তীতে অ্যাপেন্ডিসাইটিসের কারণে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়। এই সময়ে তিনি দুবার ডেঙ্গু ও একবার জন্ডিসে আক্রান্ত হন, যার ফলে তাঁর ওজন ও শারীরিক ফিটনেস—উভয়ের ওপরই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। খেলাধুলায় ফেরার চেষ্টার সময় জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে তাঁর বাম হাঁটুর লিগামেন্টে চোট লাগে এবং তাঁকে আরও একটি অস্ত্রোপচার করাতে হয়।
ভারতীয় রেলে চাকরি পাওয়ার পর তিনি খেলাধুলা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন; কিন্তু ভুবনেশ্বরে ‘স্ট্রেন্থ অ্যান্ড কন্ডিশনিং’ বিষয়ক একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নেওয়ার সময় অন্য ক্রীড়াবিদদের অনুশীলন করতে দেখে তাঁর ভেতরের খেলোয়াড় সত্তাটি আবার জেগে ওঠে। কোচ ও সতীর্থদের উৎসাহে তিনি পুনরায় ভারোত্তোলন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন।
মুথুপান্ডি জাতীয় কোচ বিজয় শর্মার তত্ত্বাবধানে পুনরায় প্রশিক্ষণ শুরু করেন এবং ২০২৫ সালের কমনওয়েলথ ভারোত্তোলন চ্যাম্পিয়নশিপে রৌপ্যপদক জিতে অসাধারণভাবে ফিরে আসেন। এরপর, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত সিনিয়র জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি মোট ৩০২ কেজি ওজন তুলে জাতীয় রেকর্ড গড়েন এবং গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসের জন্য যোগ্যতা অর্জন করেন।










