কণ্ঠের ক্ষণস্থায়ী জীবন থেকে চিরস্থায়ী সুরের পথে

IMG-20260328-WA0003

বেবি চক্রবর্ত্তী

শব্দেরও জন্ম হয় মৃত্যু হয় কিন্তু কিছু মানুষ আছেন যারা শব্দকে মৃত্যুর হাত থেকে তুলে এনে সময়ের ভেতর স্থায়ী করে দেন, যখন গান ছিল ক্ষণিকের – সভাঘরের দেওয়ালে আটকে থাকা এক সন্ধ্যার স্মৃতি তখন শিল্পীর কন্ঠ বাতাসে মিলিয়ে গেলে আর ফেরার পথ থাকতনা। তিনি চেয়েছিলেন শিল্পীর কন্ঠকে ধরে রাখতে। যেমন ভাবনা তেমন কাজ – নিজের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে তিনি পাড়ি দিলেন জার্মানিতে। ইউরোপের উন্নত রেকর্ডিং স্টুডিও, ডিস্ক কাটিং প্রযুক্তি এবং শব্দ সংরক্ষণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। প্রচার বিমুখ এই মানুষটি হলেন কলকাতার আধুনিক সংগীত রেকর্ডিং শিল্পে অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে একজন সি.সি. সাহা বা চন্ডীচরণ সাহা।উনিশ শতকের শেষ ভাগে এক মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন চণ্ডীচরণ সাহা। ছোটবেলা থেকেই যন্ত্রবিদ্যা, শব্দ এবং সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ ছিল। তিনি জার্মানিতে গিয়ে আধুনিক সাউন্ড রেকর্ডিং প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন। এরপর ১৯৩২ সালে তিনি কলকাতায় ফিরে প্রতিষ্ঠা করেন হিন্দুস্থান মিউজিক্যাল প্রোডাক্টস লিমিটেড-যা পরে পরিচিত হয় হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানি নামে। এর পূর্বে তিনি জার্মানির বিখ্যাত নিউম্যান সংস্থার রেকর্ডিং ও ডিস্ক কাটিং যন্ত্র সংগ্রহ করেন, যা পরবর্তীকালে ভারতের রেকর্ডিং ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ভূমিকা নেয়। ভারতীয় সংগীত ইতিহাসের এমন কিছু নাম আছে যাঁরা মঞ্চের আলোয় দাঁড়িয়ে গান গেয়ে খ্যাতি অর্জন করেননি অথচ যাঁদের অবদান ছাড়া সেই আলোই জ্বলে উঠতনা। তেমনি এক নীরব স্থপতি, ভারতীয় আধুনিক রেকর্ডিং শিল্পের পথিকৃৎ এবং বাংলার সংগীত ঐতিহ্য সংরক্ষণের এক অবিস্মরণীয় রূপকার চণ্ডীচরণ সাহা। বিদেশি কোম্পানির একচেটিয়া আধিপত্যের বিরুদ্ধে ভারতীয় সংগীত সংরক্ষণের একটি সাংগঠনিক কাঠামো এবং ভারতে প্রথম স্বদেশী মালিকানাধীন রেকর্ড কোম্পানি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভারতে পেশাদার রেকর্ডিং শিল্পে সূচনা করেন তিনি।চণ্ডীচরণ সাহার জীবনের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত আসে যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং হিন্দুস্থান রেকর্ডে গান রেকর্ড করতে সম্মত হন। রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে রেকর্ড হওয়া গানগুলি শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যই নয়, ভারতীয় সঙ্গীত রেকর্ডিংকে সামাজিক স্বীকৃতিও এনে দেয়। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, চণ্ডীচরণ সাহার ওপর শিল্পীসমাজের আস্থা কতটা গভীর ছিল। এরপর তাঁকে আর পিছনের দিকে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখানে শিল্পী ও সংগীত ধারার বিস্তার দেখা দিয়েছিল। হিন্দুস্থান রেকর্ডের মাধ্যমে যাঁদের কণ্ঠ ও সুর চিরস্থায়ী হয়ে উঠেছে, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন পঙ্কজ কুমার মল্লিক, সাচিন দেব বর্মন, কুন্দনলাল সাইগাল, দেবব্রত বিশ্বাস, উস্তাদ ফৈয়াজ খান, উস্তাদ বদে গুলাম আলি খান প্রমুখ। রবীন্দ্রসঙ্গীত, আধুনিক বাংলা গান, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, ঠুংরি, খেয়াল – সব ধারাকেই সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন চণ্ডীচরণ সাহা। তাঁর কাছে রেকর্ড কেবল পণ্য নয়, এটি ছিল সময়ের সাক্ষ্য, একটি সংস্কৃতিক দলিল এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত উত্তরাধিকার। তিনি বিশ্বাস করতেন,“সঙ্গীত ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু রেকর্ড তাকে অমর করে।চণ্ডীচরণ সাহা ছিলেন প্রচারের বাইরে থাকা মানুষ।তিনি কোনো মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাততালি নেননি, কোনো পোস্টারে তাঁর মুখ ছাপা হয়নি। তিনি বিশ্বাস করতেন – “শিল্পী সামনে থাকুক, আমি থাকব শব্দের পেছনে।” তাঁর কাছে রেকর্ড ছিল ব্যবসা নয়, ছিল ইতিহাসের দলিল। চণ্ডীচরণ সাহা চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর তৈরি শব্দের ঘর আজও দাঁড়িয়ে। হিন্দুস্থান রেকর্ডের উত্তরাধিকার বহন করে পরবর্তীকালে গড়ে ওঠে আইএনআরইসিও। আজ ডিজিটাল যুগে,যখন পুরনো রেকর্ড নতুন ফরম্যাটে ফিরে আসে, তখন প্রতিটি বাজতে থাকা সুরের আড়ালে নীরবে য়ে থাকেন চণ্ডীচরণ সাহা।যাঁরা গান গেয়ে ইতিহাস তৈরি করেন, তাঁরা আমাদের মনে থাকেন। কিন্তু যাঁরা সেই গানকে সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করান – তাঁদের স্মরণ করাই ইতিহাসের ঋণ। চণ্ডীচরণ সাহা শব্দকে অমর করেছিলেন। আর তাই, তিনি নিজেই অমর।

About Author

Advertisement