কলকাতা(বেবি চক্রবর্তী): ঔপনিবেশিক শাসনকালে ভারতবর্ষে জুতো ছিল বিলাসবহুল সামগ্রী। অধিকাংশ মানুষ খালি পায়েই চলাফেরা করতেন, কারণ বিদেশ থেকে আমদানি হওয়া জুতো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। সেই সময় এক মানবিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে এক বিদেশি উদ্যোক্তা ভারতীয়দের জন্য সস্তায় জুতো তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন- তিনি টমাস বাটা।
এক শীতের সকালে কলকাতার চিতপুর রোডে এক রক্তাক্ত পায়ের বৃদ্ধ রিকশাচালককে দেখে গভীরভাবে প্রভাবিত হন তিনি। মানুষের কষ্ট লাঘবের লক্ষ্যেই তাঁর মনে জন্ম নেয় ভারতে জুতো উৎপাদনের পরিকল্পনা। পরবর্তীতে হুগলির কোন্নগরে একটি পরিত্যক্ত তেলকল ভাড়া নিয়ে শুরু হয় সেই ঐতিহাসিক যাত্রা।
প্রথমদিকে বিদেশ থেকে জুতো আমদানি করা হলেও দ্রুতই তিনি উপলব্ধি করেন, দেশের মানুষের আর্থিক অবস্থার কথা মাথায় রেখে এখানেই উৎপাদন করতে হবে। সেই ভাবনা থেকেই কোন্নগরে গড়ে ওঠে আধুনিক জুতো কারখানা। ভাষাগত সমস্যা, বাজারে গ্রহণযোগ্যতার অভাব এবং আর্থিক ক্ষতি—সব বাধা পেরিয়ে ১৯৩৩ সালের ১ মে তৈরি হয় ভারতের প্রথম আধুনিক জুতো।
এরপর দ্রুতই দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে এই সংস্থার বিক্রয়কেন্দ্র। জাপানি জুতোর একচেটিয়া বাজারকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দেশীয় উৎপাদন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। যদিও প্রথমদিকে নানা গুজব, প্রতিবাদ ও ধর্মীয় আপত্তির মুখোমুখি হতে হয়েছিল সংস্থাটিকে, তবুও উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে কোন্নগরের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে।
১৯৩২ সালে এক দুর্ঘটনায় টমাস বাটার মৃত্যু হলেও তাঁর পুত্র থমাস জে বাটা নতুন উদ্যমে কাজ এগিয়ে নিয়ে যান। কোন্নগরের কারখানাকে আরও বিস্তৃত করে পরবর্তীতে বাটানগরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংস্থা শুধু ভারতে নয়, বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠা পায়। প্রখ্যাত সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিজ্ঞানী প্রফুল্ল চন্দ্র রায়-ও তাঁর জীবনদর্শনে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। টমাস বাটার সেই বিখ্যাত ভাবনা—কম দামে উন্নতমানের পণ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া—আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
বর্তমানে সারা ভারতজুড়ে অন্যতম জনপ্রিয় জুতো ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত বাটা। ১৯৩৪ সাল থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজও মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে রয়েছে। কোন্নগরের সেই প্রথম উদ্যোগই ভারতীয় জুতো শিল্পে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল।








