আমের রাজধানী মালদা এখন মাদক তৈরির কারখানা

6e2cf3f0-59cb-4359-9c93-fe613b6d0a5f

মিয়ানমার থেকে নেপাল সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত পাচারের ত্রিভুজ, শিশু থেকে নারী—সকলেই অপরাধীদের জালে

দেবেন্দ্র কে. ঢুঙ্গানা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলা একসময় তার রসালো ও মিষ্টি আমের জন্য গোটা বিশ্বে পরিচিত ছিল। পরবর্তীকালে জাল ভারতীয় নোটের কারবারের কারণে এই জেলা নিরাপত্তা সংস্থাগুলির নজরে আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মালদার পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি গুরুতর ও উদ্বেগজনক বিষয়। সেটি হলো শিল্পের আদলে ক্রমশ বিস্তৃত হয়ে ওঠা মাদক উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও পাচারের নেটওয়ার্ক।
গ্রামের মতো দেখতে কুমারপুরের অলিগলিতে কোটি কোটি টাকার অবৈধ মাদক ব্যবসা পরিচালিত হওয়া এবং এর সঙ্গে আন্তঃরাজ্য অপরাধচক্রের যোগসূত্র সামনে আসায় ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলির কাছেও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব শুধু পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। উত্তর-পূর্ব ভারত হয়ে বিহার ও ঝাড়খণ্ড পর্যন্ত বিস্তৃত মাদক পাচারের পথের কারণে নেপালের পূর্ব সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
মালদায় সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের দুটি বড় অভিযানে এই সমস্যার গভীরতা সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইংলিশ বাজার এলাকার অন্তর্গত কুমারপুরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৭ কোটি ভারতীয় টাকা মূল্যের ব্রাউন সুগার উদ্ধার করে। ওই অভিযানে ১৬ কেজি ৯৯৮ গ্রাম ব্রাউন সুগার, ৮ লক্ষ ৭৮ হাজার ৫০০ টাকা নগদ এবং মাদক উৎপাদনে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ও সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় তিন মহিলাসহ মোট পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় যে, কুমারপুরের একটি গ্যারেজকে মাদক উৎপাদন ও মজুতের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, বিহারের পূর্ণিয়া ও সমस्तीপুর থেকেও ব্যবসায়ীরা সেখানে মাদক কিনতে আসতেন। এই ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে, মালদা এখন শুধু মাদক পরিবহণের পথ নয়, বরং উৎপাদন ও সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠছে।
এরপর ২০২৬ সালের ৩১ অক্টোবর রাতে মালদার কালিয়াচক এলাকার মধুঘাটের কাছে ১২ নম্বর জাতীয় সড়কে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান চালায়। সন্দেহজনক একটি গাড়ি আটক করে তল্লাশি চালানোর সময় ২ কেজি ৬৮৮ গ্রাম নিষিদ্ধ মরফিন উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় আন্তঃরাজ্য মাদক চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া মাদকের অবৈধ বাজারমূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা।
এই দুটি ঘটনাকে শুধুমাত্র পৃথক মাদক উদ্ধারের ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। একই জেলায় মাদক উৎপাদন কেন্দ্রের সন্ধান পাওয়া, অন্য একটি এলাকায় বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ মাদকসহ আন্তঃরাজ্য চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার এবং বিভিন্ন রাজ্যের মানুষের সম্পৃক্ততা সামনে আসা—এই সমস্ত বিষয় উৎপাদন, মজুত, বণ্টন ও বাজার ব্যবস্থাপনার মধ্যে সম্ভাব্য যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।
যদিও এই দুটি ঘটনার মধ্যে সরাসরি সাংগঠনিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মতো কোনও প্রকাশ্য প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। তাই তদন্তের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তাদের কাঁচামাল সরবরাহকারী, উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, আর্থিক লেনদেন পরিচালনাকারী এবং শেষ পর্যন্ত বাজারে মাদক পৌঁছে দেওয়া সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ককে চিহ্নিত করা।
মালদার জেলা পুলিশ সুপার সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মণিপুর, বিহার, ঝাড়খণ্ডসহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে অভিযুক্তদের গ্রেফতার এবং স্থানীয় স্তরে মাদক বিক্রির বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
পুলিশি তদন্তে এমন আশঙ্কাও সামনে এসেছে যে, উত্তর-পূর্ব ভারতের অসম, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম ও নাগাল্যান্ড থেকে কাঁচামাল মালদায় পৌঁছায়। এরপর সেখান থেকে বিভিন্ন ধরনের মাদক তৈরি করে পূর্ব ভারতের বাজারে পাঠানো হয়। এর ফলে উত্তর-পূর্ব ভারত, বাংলা ও বিহারের মধ্যে সক্রিয় সম্ভাব্য সরবরাহ নেটওয়ার্কের বিস্তারিত তদন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমার-সংযুক্ত আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ডের আশপাশে অবস্থিত গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল অঞ্চল থেকে উৎপাদিত হেরোইন এবং কৃত্রিম মাদক ভারতে প্রবেশ করে আসছে। ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলির বিভিন্ন প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, মণিপুর ও মিজোরামের সীমান্তবর্তী অঞ্চল দিয়ে মাদক ভারতে প্রবেশ করে এবং অসমসহ অন্যান্য রাজ্যের পথ ধরে বিভিন্ন বাজারে পৌঁছায়।
ভারতের রাজস্ব গোয়েন্দা অধিদপ্তর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত অভিযানসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার সীমান্তবর্তী মিজোরাম দিয়ে ভারতে আনা ২৬ কেজি মেথামফেটামিন অসমের কাছাড় জেলা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অবৈধ বাজারে এর আনুমানিক মূল্য ছিল প্রায় ২৬ কোটি ভারতীয় টাকা।
একইভাবে ২০২৫ সালের জুন মাসে মণিপুরের চূড়াচাঁদপুর এলাকায় একটি যৌথ অভিযানে প্রায় ৭ কেজি ৭৫৫ গ্রাম হেরোইন এবং ৬ কেজি ৭৩৬ গ্রাম আফিম উদ্ধার করা হয়েছিল। এই ঘটনাগুলি প্রমাণ করে যে, উত্তর-পূর্ব ভারতে মাদকের সমস্যা শুধু স্থানীয় অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সরবরাহ নেটওয়ার্কেরও যোগসূত্র রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে মালদার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে পশ্চিমবঙ্গের দিকে আসা পরিবহণ ও বাণিজ্যিক পথগুলি মাদক পাচারের কাজে অপব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। মালদা বিহার ও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভৌগোলিক অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় নিরাপত্তার দিক থেকেও এই জেলার অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল।
এখানে উৎপাদিত, প্রক্রিয়াজাত বা মজুত করা মাদক অন্য রাজ্যের বাজারে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। তবে কোন মাদক কোন পথ দিয়ে কোন জেলা বা দেশে পৌঁছেছে, তা গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্য, আর্থিক নথিপত্র, যোগাযোগের তথ্য এবং উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ভিত্তিতেই নিশ্চিত করা উচিত।
এই ঘটনার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো মাদক পাচারের কাজে শিশু ও মহিলাদের ব্যবহার করার অভিযোগ। মালদা পুলিশের সূত্র উল্লেখ করে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সি নাবালকদের মাদক পরিবহণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিক্রির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
কিছু মহিলাকেও পাচারের কাজে লাগানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি সদ্যোজাত শিশুর মা এমন মহিলাদের শিশুখাদ্য বা শিশুদের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর আড়ালে মাদক বহনের কাজে ব্যবহার করার অভিযোগও সামনে এসেছে। অপরাধচক্রের হাত থেকে উদ্ধার হওয়া এক নাবালক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে বলে প্রকাশিত খবরে উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের টাকা দেওয়ার পরিবর্তে মাদক দেওয়া হতো।
এই অভিযোগগুলি তদন্তে প্রমাণিত হলে বিষয়টি আর শুধু মাদক পাচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। অপরাধীরা শিশুদের দারিদ্র্য, অশিক্ষা, পারিবারিক অনিরাপত্তা এবং মাদকাসক্তিকে নিজেদের ব্যবসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে—এটি একটি গুরুতর সামাজিক অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
প্রথমে শিশুদের অল্প পরিমাণ মাদক পরিবহণের কাজে ব্যবহার করা, পরে তাদের মাদকাসক্ত করে তোলা এবং শেষ পর্যন্ত তাদেরই স্থানীয় পর্যায়ে মাদক বিক্রির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপদ। এর ফলে বিদ্যালয়, পরিবার এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সামাজিক কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়ে।
মালদার এই ঘটনা নেপালের সামনেও কয়েকটি গুরুতর প্রশ্ন তুলে ধরেছে। বিশেষ করে কোশি প্রদেশের ঝাপা, মোরং ও সুনসারির মতো ভারতীয় সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে মাদক পাচার, বিক্রি এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাড়তে থাকা মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে নিরাপত্তা সতর্কতা বাড়ানো প্রয়োজন।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং নেপালের পূর্বাঞ্চলের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক, যাতায়াত, পারিবারিক যোগাযোগ ও পরিবহণ ব্যবস্থা রয়েছে। তাই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সক্রিয় মাদক চক্রগুলি সীমান্তবর্তী বাজারকে সম্ভাব্য ক্রেতা এলাকা অথবা মাদক পরিবহণের পথ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে—এই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে মালদায় গ্রেফতার হওয়া অপরাধচক্রের নেটওয়ার্ক নেপাল পর্যন্ত বিস্তৃত, এমন কোনও প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ নেপালে এই চক্রের ব্যবসা বা মাদক সরবরাহের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও তথ্য প্রকাশ করেছে বলেও জানা যায়নি। সুতরাং মালদার অপরাধচক্রের সঙ্গে নেপালের মাদক ব্যবসার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই তাড়াহুড়ো হবে।
তবুও ভারতীয় তদন্তের পরিধি বাড়লে বিহার, পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যুক্ত সম্ভাব্য সরবরাহ ও বণ্টন সম্পর্কের তদন্তে নেপালের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ভারতের নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরোর ২০২৩-২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলিতে মাদক পরিবহণের প্রধান মাধ্যম স্থলপথ। একই প্রতিবেদনে ভারত-নেপাল সীমান্ত দিয়েও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গাঁজা পাচারের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, নেপাল ও ভারতের মধ্যে উন্মুক্ত সীমান্ত ব্যবস্থার অপব্যবহার অপরাধীরা করতে পারে। তাই বিষয়টিকে নিরাপত্তা নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অনুযায়ী, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ২০২৬ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত বিবরণে জানিয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে উত্তর-পূর্ব ভারতে ৪,৬২৬ কেজি কৃত্রিম উত্তেজক মাদক এবং ২,৬৫২ কেজি হেরোইন উদ্ধার করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান উত্তর-পূর্ব ভারতে মাদক পাচারের সমস্যার ব্যাপকতা তুলে ধরে।
নেপালের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু সীমান্তে মাদকসহ ধরা পড়া ব্যক্তিদের গ্রেফতার করা নয়। এর পেছনে থাকা আর্থিক নেটওয়ার্ক, স্থানীয় সরবরাহকারী, যোগাযোগ রক্ষাকারী ব্যক্তি এবং তরুণদের মাদকাসক্ত করে তোলার কাজে যুক্ত গোষ্ঠীগুলিকে চিহ্নিত করাও সমান জরুরি।
মালদায় উৎপাদিত মাদক নেপাল পর্যন্ত পৌঁছায় কি না, সেই তদন্তের পাশাপাশি মণিপুর ও মিয়ানমারের দিক থেকে ভারতে প্রবেশ করা মাদকের পথ, বিহারের বাজার এবং নেপালের সঙ্গে সম্ভাব্য সরবরাহ সম্পর্ক নিয়েও তথ্য আদান-প্রদান করা প্রয়োজন।
নেপাল পুলিশের মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যুরো, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী, শুল্ক প্রশাসন এবং ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান ও যৌথ নজরদারি আরও কার্যকর করা যেতে পারে।
বিশেষ করে ঝাপার কাঁকড়ভিট্টা, ভদ্রপুর, পাঠামারি ও পন্থাপাড়া, মোরংয়ের রানি এবং সুনসারির সীমান্তবর্তী যাতায়াত কেন্দ্রগুলিতে ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের তদন্ত এবং মাদকাসক্তির ফাঁদে পড়া কিশোর-কিশোরীদের শনাক্ত করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
উন্মুক্ত সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া এর বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। বরং বৈধ যাতায়াত সহজ রেখে অপরাধীরা যাতে এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করতে না পারে, সেই ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিদ্যালয় ও কলেজে সচেতনতামূলক কর্মসূচি, স্থানীয় পর্যায়ে নেশামুক্তি ও পুনর্বাসন পরিষেবা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে সমন্বয়ও পুলিশি অভিযানের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে ভারতের তদন্তকারী সংস্থাগুলির পক্ষেও শুধু মালদার অপরাধচক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করাকে যথেষ্ট সাফল্য বলে মনে করা উচিত নয়।
কুমারপুরে পাওয়া উৎপাদন কেন্দ্রের উৎস কোথায়? রাসায়নিক কাঁচামাল কারা সরবরাহ করেছিল? উৎপাদনের জন্য আর্থিক বিনিয়োগ কে করেছিল? বণ্টনের দায়িত্ব কার হাতে ছিল? গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে অন্য রাজ্যের মাদক ব্যবসায়ীদের কী ধরনের সম্পর্ক ছিল?
এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর সামনে আসা জরুরি। কালিয়াচকে উদ্ধার হওয়া মরফিনের উৎস এবং গন্তব্য শনাক্ত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে পুলিশি সমন্বয়, ব্যাংকিং লেনদেনের তদন্ত, ডিজিটাল প্রমাণের বিশ্লেষণ এবং অর্থপাচার সংক্রান্ত তদন্ত প্রয়োজন।
মাদক ব্যবসার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বিপুল মুনাফা। কয়েক লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা করার সম্ভাবনা বেকার যুবক, আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবার এবং অপরাধী গোষ্ঠীগুলিকে আকৃষ্ট করে।
যখন অপরাধীরা স্থানীয় সমাজের শিশু, মহিলা এবং বেকার যুবকদের নিজেদের ব্যবসার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে, তখন এই সমস্যা পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে একটি গুরুতর সামাজিক সংকটে পরিণত হতে পারে। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণকে শুধু গ্রেফতার, উদ্ধার এবং মামলা দায়েরের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।
মালদার কুমারপুরে পুলিশের অভিযান এবং কালিয়াচকে সাম্প্রতিক মাদক উদ্ধারের ঘটনা উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে পূর্ব ভারতে ছড়িয়ে পড়া সম্ভাব্য মাদক নেটওয়ার্কের কাঠামো নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
এই তদন্তে নেপাল পর্যন্ত কোনও যোগাযোগ বা সরবরাহের সম্পর্ক সামনে আসে কি না, তা আগামী দিনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে। এখনই নেপালকে এই অপরাধচক্রের গন্তব্য অথবা মাদক পরিবহণের কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা তথ্যগতভাবে সঠিক হবে না। তবে সীমান্তবর্তী এলাকায় সতর্কতা বাড়ানো, ভারতীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির সঙ্গে সমন্বয় করা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেভাগে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে বিলম্ব করাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
আম ও জাল নোটের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত মালদার নাম আজ মাদক উৎপাদন ও পাচারের সংবাদে উঠে আসা শুধু একটি জেলার অপরাধের কাহিনি নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ায় সীমান্তপারের সংগঠিত অপরাধ, দুর্বল সামাজিক নিরাপত্তা এবং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।
আজ কুমারপুরের অলিগলিতে দৃশ্যমান মাদক ব্যবসা আগামী দিনে সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশের বাজারেও পৌঁছাতে পারে। তাই প্রশ্ন শুধু মালদায় কত কেজি মাদক উদ্ধার হয়েছে, তা নয়। এর পেছনে থাকা আর্থিক শক্তি, সরবরাহের সম্পর্ক এবং অপরাধীদের সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক শেষ পর্যন্ত কতদূর বিস্তৃত, সেটিও জানা জরুরি।
এই তদন্ত থেকে পাওয়া উত্তর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং নেপালের সীমান্তবর্তী সমাজের নিরাপত্তা কৌশল নির্ধারণেও নতুন দিশা দিতে পারে।

About Author

Advertisement