চেন্নাই: ভারতের রোগীদের ক্যানসার টিস্যু থেকে সংগৃহীত জিনগত তথ্যের ভিত্তিতে স্তন ক্যানসারের বিরুদ্ধে মেসেঞ্জার আরএনএ (এমআরএনএ) প্রযুক্তিনির্ভর একটি পরীক্ষামূলক টিকা তৈরির কাজ করছেন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) মাদ্রাজের বিজ্ঞানীরা। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় ক্যানসার টিস্যু বায়োব্যাঙ্কে ইতিমধ্যে প্রায় ১০ হাজার ক্যানসার টিস্যুর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এই নমুনার সাহায্যে গবেষকেরা ভারতীয় রোগীদের টিউমারে উপস্থিত বিশেষ অ্যান্টিজেন শনাক্ত করছেন। তবে টিকাটি এখনও পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। ইঁদুরের ওপর এর পরীক্ষা চালানোর প্রস্তুতি চলছে। মানুষের ক্ষেত্রে এর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা প্রমাণ করতে আরও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
চেন্নাইয়ে অবস্থিত আইআইটি মাদ্রাজের জৈবপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক এস. মহালিঙ্গম এমন একটি শীতল কক্ষে প্রবেশ করেন, যেখানে সারি সারি ফ্রিজার ও স্টেইনলেস স্টিলের তরল নাইট্রোজেনের ট্যাঙ্ক রাখা রয়েছে। ট্যাঙ্কগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে তিনি জানান, সেখানে হাজার হাজার ক্যানসার টিস্যুর নমুনা সংরক্ষিত রয়েছে। তাঁর কথায়, চেন্নাইয়ের ১২টিরও বেশি হাসপাতাল থেকে রোগীদের ক্যানসার টিস্যুর প্রায় ১০ হাজার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এই নমুনাগুলো অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় রাখা হয়। অন্যদিকে, রক্তের বিভিন্ন উপাদান এবং টিউমার থেকে নিষ্কাশিত ডিএনএ ও আরএনএ আলাদা ফ্রিজারে সংরক্ষণ করা হয়।
এটি জাতীয় ক্যানসার টিস্যু বায়োব্যাঙ্ক। ২০১৫ সালে আইআইটি মাদ্রাজে এই কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। বায়োব্যাঙ্ক হলো এমন একটি বৈজ্ঞানিক পরিকাঠামো, যেখানে টিস্যু, রক্ত ও জিনগত উপাদানের মতো জৈবিক নমুনা পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ করা হয়। পাশাপাশি রোগীদের চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্যও রাখা হয়, যাতে বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে ক্যানসারের কারণ, এর বিকাশ এবং চিকিৎসার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করতে পারেন।
প্রায় এক দশক ধরে গড়ে ওঠা এই পরিকাঠামো এখন স্তন ক্যানসারের বিরুদ্ধে একটি পরীক্ষামূলক টিকা তৈরির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য হলো ভারতীয় রোগীদের টিউমারে উপস্থিত বিশেষ অ্যান্টিজেন শনাক্ত করা। এই অ্যান্টিজেনকে লক্ষ্য করে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে সক্রিয় করা যায় কি না, তা পরীক্ষা করে দেখছেন গবেষকেরা।
অধ্যাপক মহালিঙ্গমের মতে, তাঁর দল টিউমারের এমন কিছু অ্যান্টিজেন শনাক্ত করেছে, যেগুলোর উল্লেখ অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত গবেষণার তথ্যভান্ডারে আগে পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আগে থেকেই পরিচিত অ্যান্টিজেনও শনাক্ত করা হয়েছে। এই ফলাফলের ভিত্তিতেই এমআরএনএ টিকার প্রাথমিক রূপ তৈরি করা হচ্ছে।
এমআরএনএ প্রযুক্তিতে ক্যানসারের বিরুদ্ধে রোগপ্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা
কোভিড-১৯ মহামারির সময় এমআরএনএ-ভিত্তিক টিকা প্রযুক্তি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। এই প্রযুক্তিতে শরীরের কোষকে একটি নির্দিষ্ট প্রোটিন তৈরির জন্য জিনগত নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সেই প্রোটিনকে চিনতে শিখতে পারে এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়া গড়ে তুলতে পারে।
ক্যানসারের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির উদ্দেশ্য কিছুটা আলাদা। এখানে এমন টিউমার অ্যান্টিজেনের ভিত্তিতে টিকা তৈরির চেষ্টা করা হয়, যেগুলো ক্যানসার কোষ শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে। শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এই অ্যান্টিজেনগুলোকে চিনতে শিখলে সংশ্লিষ্ট ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
টিউমার অ্যান্টিজেন হলো এমন প্রোটিন বা প্রোটিনের অংশ, যেগুলোকে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা শনাক্ত করতে পারে। ক্যানসার কোষে জিনগত পরিবর্তন ঘটলে কিছু প্রোটিনের গঠন বদলে যেতে পারে অথবা নতুন প্রোটিন তৈরি হতে পারে। এর ফলে সৃষ্ট বিশেষ অ্যান্টিজেনকে নিওঅ্যান্টিজেন বলা হয়। ব্যক্তিভিত্তিক বা রোগী অনুযায়ী আলাদা ক্যানসার টিকা তৈরির ক্ষেত্রে এই নিওঅ্যান্টিজেন গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
আইআইটি মাদ্রাজের এই প্রকল্পের বিশেষত্ব হলো, এতে ভারতীয় রোগীদের টিউমারের নমুনা থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে। গবেষকেরা এমন অ্যান্টিজেন শনাক্ত করতে চাইছেন, যেগুলো ভারতীয় রোগীদের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। পাশাপাশি, সেগুলোকে লক্ষ্য করে কার্যকর রোগপ্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়া তৈরি করা সম্ভব কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
তবে কোনও অ্যান্টিজেন শনাক্ত করা মানেই কার্যকর টিকা তৈরি হয়ে যাওয়া নয়। নির্বাচিত অ্যান্টিজেন শরীরে পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে কি না, সেই প্রতিক্রিয়া ক্যানসার কোষকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে কি না এবং এর ফলে স্বাভাবিক কোষের অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি হয় কি না, তা বিজ্ঞানীদের প্রমাণ করতে হবে।
অধ্যাপক মহালিঙ্গম জানিয়েছেন, তাঁর দল টিকার প্রাথমিক রূপ তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। আপাতত এর জিনগত গঠনের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়, কারণ এ বিষয়ে পেটেন্টের আবেদন করা হয়েছে। গবেষকেরা এখন স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত ইঁদুরের মডেলে টিকাটি পরীক্ষা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পরীক্ষাগার ও প্রাণীর ওপর গবেষণার ফল আশাব্যঞ্জক হলে ভবিষ্যতে মানুষের ওপর পরীক্ষার সম্ভাবনা বিবেচনা করা হতে পারে।
তাই এই পর্যায়ে এটিকে স্তন ক্যানসারের অনুমোদিত টিকা বা প্রমাণিত চিকিৎসা বলা ঠিক হবে না। এটি একটি প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ। এর প্রকৃত কার্যকারিতা ভবিষ্যতের পরীক্ষার ফল থেকেই স্পষ্ট হবে।
ভারতীয় রোগীদের নমুনার প্রয়োজন কেন দেখা দিল?
জাতীয় ক্যানসার টিস্যু বায়োব্যাঙ্ক তৈরির ধারণাটি প্রথম সামনে আসে ২০১৩ সালে। সে সময় অধ্যাপক মহালিঙ্গমের পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণার ফলাফল যাচাই করার জন্য প্রকৃত ক্যানসার টিস্যুর নমুনা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু গবেষণার কাজে উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত নমুনা পাওয়া যায়, এমন কোনও উন্মুক্ত সংরক্ষণকেন্দ্র খুঁজে পেতে তিনি সমস্যায় পড়েন।
তিনি উপলব্ধি করেন, ভারতে ক্যানসার রোগী ও গবেষকের সংখ্যা বিপুল হলেও ক্যানসার টিস্যু পরিকল্পিতভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য সরবরাহ করার মতো পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে। এরপর তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিভাগটি এই উদ্যোগে আর্থিক সহায়তা দেয়।
২০১৫ সালে দুটি হাসপাতালের সহযোগিতায় শুরু হওয়া এই বায়োব্যাঙ্কের নেটওয়ার্ক এখন ১২টিরও বেশি হাসপাতালে বিস্তৃত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। অধ্যাপক মহালিঙ্গমের মতে, মোট নমুনার প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ এসেছে তামিলনাড়ুর বাইরে থেকে।
এই কেন্দ্রে স্তন ক্যানসারের পাশাপাশি পরিপাকতন্ত্র, যকৃৎ ও রক্তের ক্যানসারসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের নমুনা সংরক্ষিত রয়েছে। কিছু রোগীর নমুনা চিকিৎসার বিভিন্ন পর্যায়ে সংগ্রহ করা হয়। বিশেষ করে লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের নমুনা নিয়মিত পরীক্ষা করলে রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত পরিবর্তন সময়ের সঙ্গে কীভাবে ঘটছে, তা বোঝা সম্ভব হয়।
এই ধরনের নমুনা গবেষকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করে। একই বয়সের, একই ধরনের টিউমারে আক্রান্ত এবং প্রায় একই চিকিৎসা পাওয়া কিছু রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসা ভালো কাজ করে, অথচ অন্যদের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না কেন?
অধ্যাপক মহালিঙ্গম স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত এমন ১০ জন রোগীর উদাহরণ দিয়েছেন, যাঁদের একই ধরনের কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের ক্ষেত্রে চিকিৎসা ভালো ফল দেয়, কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তাঁর মতে, এই পার্থক্যের পেছনে জিনগত বা জিনোমগত বৈচিত্র্য থাকতে পারে। তবে এই বৈচিত্র্য ও চিকিৎসার ফলাফলের মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন।
পশ্চিমা দেশগুলোর তথ্যের বাইরে গিয়ে গবেষণার প্রয়োজন
ক্যানসারের জিনগত গঠন বোঝার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত গবেষণার তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই গবেষণাগুলো ক্যানসারের বিভিন্ন ধরন, ঝুঁকি এবং চিকিৎসা সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য দিয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্য থাকায় সেই ফলাফল দিয়ে ভারতীয় রোগীদের সব বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
এই কারণেই ভারতীয় রোগীদের নমুনাভিত্তিক গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে ভারতীয় জনগোষ্ঠীতে কোন জিনগত পরিবর্তন বেশি দেখা যায়, কোন পরিবর্তনের সঙ্গে ক্যানসারের বিকাশের সম্পর্ক থাকতে পারে এবং সেগুলো চিকিৎসার প্রতি রোগীর প্রতিক্রিয়াকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা বোঝা সম্ভব হতে পারে।
অধ্যাপক মহালিঙ্গম স্তন ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বিআরসিএ-১ ও বিআরসিএ-২ জিনের কথা উল্লেখ করেছেন। এই জিনগুলোর কিছু ক্ষতিকর জিনগত পরিবর্তন স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাঁর দল স্তন ক্যানসারের প্রায় এক হাজার নমুনা বিশ্লেষণ করেছে। ওই গবেষণায় প্রায় ৪ শতাংশ রোগীর মধ্যে এই জিনগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত মিউটেশন পাওয়া গেছে। তবে বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল তুলনা করার সময় নমুনা নির্বাচনের পদ্ধতি, রোগীদের বৈশিষ্ট্য এবং পরীক্ষার কৌশল বিবেচনা করা জরুরি। শুধু শতাংশের পার্থক্যের ভিত্তিতে কোনও জনগোষ্ঠীতে ক্যানসারের ঝুঁকি কম বা বেশি বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
গবেষকেরা আরইসিকিউএল-১-সহ অন্যান্য জিনেও জিনগত বৈচিত্র্য শনাক্ত করেছেন। এই জিন ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ মেরামতের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা পালন করে। অধ্যাপক মহালিঙ্গমের মতে, এই জিনের একটি বিশেষ জিনগত পরিবর্তন ভারতীয় জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩.৬ থেকে ৩.৯ শতাংশ মানুষের মধ্যে পাওয়া গেছে। অথচ অন্য কিছু তথ্যভান্ডারে এর হার ১ শতাংশেরও কম।
তবে কোনও জিনগত পরিবর্তন একটি জনগোষ্ঠীতে বেশি দেখা গেলেই সেটি ক্যানসারের কারণ বা চিকিৎসার ফলাফলকে প্রভাবিত করে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এর চিকিৎসাগত গুরুত্ব বুঝতে আরও গবেষণা এবং স্বাধীনভাবে বৈজ্ঞানিক যাচাই প্রয়োজন।
নমুনা থেকে জিনোমগত তথ্য: কীভাবে চলে গবেষণা?
ক্যানসার টিস্যু সংগ্রহ করা গবেষণার প্রথম ধাপ মাত্র। এরপর নমুনাগুলো সংরক্ষণ, সেগুলো থেকে জিনগত উপাদান নিষ্কাশন, জিনগত অনুক্রম নির্ণয় এবং প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণের মতো একাধিক ধাপ সম্পন্ন করতে হয়।
জাতীয় ক্যানসার টিস্যু বায়োব্যাঙ্কে টিউমারের টিস্যু তরল নাইট্রোজেনের সাহায্যে প্রায় মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়। এখানে সাতটি ট্যাঙ্ক রয়েছে এবং প্রতিটি ট্যাঙ্কে প্রায় ১৩ হাজার শিশি রাখার ক্ষমতা রয়েছে। এ ছাড়া রক্তের বিভিন্ন উপাদান মাইনাস ৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখা ফ্রিজারে সংরক্ষণ করা হয়। টিউমার থেকে নিষ্কাশিত ডিএনএ ও আরএনএও ভবিষ্যতের গবেষণার জন্য রাখা হয়।
বায়োব্যাঙ্কের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ডা. জন পিটারের মতে, নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষাগার পরিবেশে নমুনা প্রস্তুত করা এবং সেখান থেকে জিনগত উপাদান নিষ্কাশন করা হয়। এর ফলে বাইরের পদার্থের সংস্পর্শে নমুনা দূষিত হওয়ার আশঙ্কা কমানো যায়।
এরপর নমুনার জিনগত অনুক্রম নির্ণয় করা হয়। সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে কোনও জীবের সমগ্র জিনগত উপাদান সম্পর্কে বিস্তৃত তথ্য পাওয়া যায়। অন্যদিকে, সম্পূর্ণ এক্সোম সিকোয়েন্সিংয়ে মূলত ডিএনএর সেই অংশগুলো পরীক্ষা করা হয়, যেগুলোতে প্রোটিন তৈরির নির্দেশ থাকে। আরএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের সাহায্যে কোনও নমুনায় কোন জিন সক্রিয় রয়েছে, তা বোঝা যায়।
ডা. পিটারের মতে, একটি সিকোয়েন্সিং প্রক্রিয়া থেকে প্রায় দেড় থেকে তিন টেরাবাইট পর্যন্ত তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এত বিপুল তথ্য সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও বিশ্লেষণের জন্য বিশেষ কম্পিউটার ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষিত বিজ্ঞানীর প্রয়োজন হয়।
কোনও রোগীর টিউমারের নমুনার সঙ্গে সেই রোগীর স্বাভাবিক টিস্যু বা রক্তের নমুনা তুলনা করলে ক্যানসার কোষে সৃষ্ট জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। এর ফলে ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তন এবং জন্মগত জিনগত বৈচিত্র্যের মধ্যে পার্থক্য বোঝা যায়। রক্তের নমুনা থেকে বাবা-মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এবং ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, এমন জিনগত পরিবর্তনও পরীক্ষা করা সম্ভব।
কিছু ধরনের ক্যানসারে চিকিৎসার বিভিন্ন পর্যায়ে সংগ্রহ করা নমুনার তুলনাও গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে সময়ের সঙ্গে টিউমারের জিনগত গঠনে কী পরিবর্তন ঘটছে এবং চিকিৎসার প্রতি তার প্রতিক্রিয়া কীভাবে বদলাচ্ছে, তা বোঝা যেতে পারে।
এই গবেষণা ভবিষ্যতে এমন কিছু জৈবিক নির্দেশক শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে, যেগুলোর মাধ্যমে অনুমান করা সম্ভব হবে কোনও নির্দিষ্ট রোগী একটি বিশেষ ওষুধে কতটা উপকৃত হতে পারেন। তবে এই ধরনের অনুমান নিয়মিত চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে বিস্তৃত পরীক্ষা ও স্বাধীন বৈজ্ঞানিক যাচাই প্রয়োজন।
ভারতীয় ক্যানসার জিনোম অ্যাটলাস ঘিরে বাড়ছে প্রত্যাশা
ক্যানসার টিস্যু বায়োব্যাঙ্কে সংরক্ষিত নমুনাগুলো ভারতে ক্যানসারের জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে একটি বিস্তৃত ডিজিটাল তথ্যভান্ডার তৈরির প্রচেষ্টার সঙ্গেও যুক্ত। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে কার্কিনোস হেলথকেয়ারের সহযোগিতায় ভারত ক্যানসার জিনোম অ্যাটলাস তৈরি করা হয়, যা ২০২৪ সালে চালু হয়েছিল।
অধ্যাপক মহালিঙ্গমের মতে, এই অ্যাটলাসে স্তন ক্যানসার, লিউকেমিয়া, অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার এবং বৃহদান্ত্রের ক্যানসারসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের প্রায় দুই হাজার জিনোমগত প্রোফাইল রয়েছে। তাঁর দল তিন হাজারেরও বেশি নমুনার সিকোয়েন্সিং সম্পন্ন করেছে। আরও কিছু তথ্য এই সংগ্রহে যুক্ত করার কাজ চলছে।
এই ধরনের ডিজিটাল তথ্যভান্ডারের উদ্দেশ্য হলো ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করা এবং বিভিন্ন রোগীর তথ্যের তুলনা করা। এর মাধ্যমে ক্যানসারের বিভিন্ন ধরন, তার বিকাশ এবং চিকিৎসার প্রতি প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে গবেষকেরা আরও ভালো ধারণা পেতে পারেন।
তবে এই তথ্যভান্ডারে সবার অবাধ প্রবেশাধিকার নেই। নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী গবেষকেরা মিউটেশন-সংক্রান্ত কিছু তথ্য দেখতে পারেন। কিন্তু মূল জিনোমগত তথ্য এবং রোগীর পরিচয় প্রকাশ করতে পারে, এমন তথ্যের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। প্রকৃত টিস্যুর নমুনা ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজনীয় নৈতিক অনুমোদনও নিতে হয়। এর ফলে রোগীর ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা এবং জৈবিক নমুনার দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
ক্যানসার গবেষণার পরিকাঠামো অত্যন্ত ব্যয়বহুল
ক্যানসার টিস্যু বায়োব্যাঙ্ক এবং জিনোম অ্যাটলাসের মতো পরিকাঠামো তৈরি করা ও দীর্ঘদিন পরিচালনা করা ব্যয়সাপেক্ষ। আইআইটি মাদ্রাজে জাতীয় ক্যানসার টিস্যু বায়োব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠার জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ থেকে ২৭.৮১ কোটি টাকা এবং আইআইটি মাদ্রাজের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত ৩.৯ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠার জন্য মোট ৩১.৭১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়।
এই কেন্দ্রটি সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ক্যানসার টিস্যুর নমুনা সংরক্ষণের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। এটি পরিচালনার জন্য বিশেষ সংরক্ষণব্যবস্থা, নিম্ন তাপমাত্রা বজায় রাখার যন্ত্রপাতি, পরীক্ষাগার এবং তথ্য বিশ্লেষণের জন্য কম্পিউটার পরিকাঠামো প্রয়োজন।
নমুনার ধরন অনুযায়ী সংরক্ষণের পদ্ধতিও আলাদা হয়। কিছু টিস্যু অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় রাখা হয়। অন্যদিকে, কিছু নমুনা ফরমালিনের মতো সংরক্ষক তরলে রেখে প্যারাফিনের মধ্যে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হয়। পরে প্যারাফিনে রাখা টিস্যুর পাতলা স্তর কেটে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে পরীক্ষা করা যায়।
জিনোম সিকোয়েন্সিংয়েও উল্লেখযোগ্য খরচ হয়। অধ্যাপক মহালিঙ্গমের অনুমান অনুযায়ী, একটি নমুনার সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্সিং করতে প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হতে পারে। এর বাইরে তথ্য সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং বিশেষজ্ঞদের পরিষেবা গ্রহণের জন্যও বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়।
তাই গবেষণার জন্য প্রাথমিক অনুদানই যথেষ্ট নয়। বায়োব্যাঙ্ক দীর্ঘদিন চালু রাখা, নমুনার গুণমান বজায় রাখা, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ এবং দক্ষ বৈজ্ঞানিক কর্মী নিয়োগের জন্য ধারাবাহিক আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।
রোগীর টিউমার থেকেই পরীক্ষাগারে চিকিৎসার কার্যকারিতা যাচাই
আইআইটি মাদ্রাজের গবেষক দল ক্যানসার টিস্যু বায়োব্যাঙ্কের পাশাপাশি রোগীদের টিউমার থেকে অর্গানয়েড তৈরির কাজও করছে। অর্গানয়েড হলো পরীক্ষাগারে তৈরি ত্রিমাত্রিক জৈবিক মডেল, যা মূল টিস্যুর কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে পারে।
অধ্যাপক মহালিঙ্গমের মতে, তাঁর দল যকৃতের ক্যানসারের জন্য এমন মডেল তৈরি করেছে। বর্তমানে স্তন ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের মডেল তৈরির কাজ চলছে।
এই মডেল ব্যবহার করে পরীক্ষাগারে বিভিন্ন ওষুধের প্রতি টিউমারের প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করা যায়। কোনও রোগীর টিউমার থেকে তৈরি অর্গানয়েডে বিভিন্ন ওষুধ প্রয়োগ করে গবেষকেরা বুঝতে পারেন, কোন চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে আরও পরীক্ষা করা যেতে পারে।
ভবিষ্যতে এই ধরনের মডেল ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা বলতে রোগীর জৈবিক ও চিকিৎসাগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতিকে বোঝায়। তবে পরীক্ষাগারে কোনও ওষুধ কার্যকর প্রমাণিত হলেই যে রোগীর শরীরেও সেটি একইভাবে কাজ করবে, তার নিশ্চয়তা নেই। তাই এই ফলাফলের চিকিৎসাগত কার্যকারিতা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
ভারতে ক্যানসারের ক্রমবর্ধমান বোঝা এবং বৃহত্তর গবেষণার প্রয়োজন
ভারতে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় রোগ প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং গবেষণার গুরুত্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা বা আইএআরসির গ্লোবোক্যানের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে ভারতে স্তন ক্যানসারের প্রায় এক লাখ ৯২ হাজার নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন। নারীদের মধ্যে এটি ছিল সবচেয়ে বেশি দেখা যাওয়া ক্যানসার। এই পরিসংখ্যান ক্যানসার প্রতিরোধ ও কার্যকর চিকিৎসার জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আরও বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
আইআইটি মাদ্রাজের প্রকল্পটিও এই বৃহত্তর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একটি অংশ। ভারতীয় রোগীদের নমুনা থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে গবেষকেরা বোঝার চেষ্টা করছেন, দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীতে ক্যানসারের জিনগত বৈশিষ্ট্য কেমন এবং এই বৈশিষ্ট্যগুলো চিকিৎসার ফলাফলকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
অধ্যাপক মহালিঙ্গমের মতে, এই ধরনের গবেষণাকে আরও বিস্তৃত করতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অতিরিক্ত ক্যানসার বায়োব্যাঙ্ক এবং সিকোয়েন্সিং কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে সংগৃহীত নমুনার ভিত্তিতে সমগ্র ভারতের জনগোষ্ঠীতে কোনও জিনগত পরিবর্তন কতটা সাধারণ, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব করা কঠিন।
তাঁর মতে, হাসপাতাল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি বিনিয়োগও বৃদ্ধি করা দরকার। এর ফলে আরও বেশি নমুনা সংগ্রহ, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং গবেষণার ফলাফলকে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।
অধ্যাপক মহালিঙ্গমের মনে আছে, ক্যানসার টিস্যু বায়োব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব প্রথম দেওয়ার সময় তাঁর কয়েকজন সহকর্মী এর নির্মাণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনার জটিলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি উদ্যোগটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তাঁর বিশ্বাস, ভারতে ক্যানসারের ক্রমবর্ধমান বোঝা মোকাবিলা করতে হলে দেশের নিজস্ব রোগীদের ওপর ভিত্তি করে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ তৈরি করা জরুরি। স্তন ক্যানসারের বিরুদ্ধে এমআরএনএ-ভিত্তিক পরীক্ষামূলক টিকা তৈরির প্রচেষ্টাও সেই বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ।
এই মুহূর্তে এই গবেষণা থেকে কোনও প্রমাণিত টিকা বা তাৎক্ষণিক চিকিৎসার প্রত্যাশা করা তাড়াহুড়ো হবে। তবে ভারতীয় রোগীদের টিউমারের জিনগত বৈশিষ্ট্য বোঝা, সম্ভাব্য রোগপ্রতিরোধমূলক লক্ষ্য শনাক্ত করা এবং ভবিষ্যতের চিকিৎসার ভিত্তি তৈরির ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে পরবর্তী পরীক্ষায় টিকাটি কতটা নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিত হয় এবং মানুষের ওপর পরিচালিত পরীক্ষায় এর সুফল নিশ্চিত করা যায় কি না, তার ওপর।





