কনসার্টের ছন্দে সিকিমের পর্যটন

IMG-20261014-WA0061

হিমালয় রাজ্যে নেপালি সুরে গড়ে উঠছে নতুন অর্থনীতি

গ্যাংটক(দেশবন্ধু বিশ্বামিত্র): সিকিম তার পর্যটনের পরিচয় বদলানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাহাড় দেখতে আসা, ছবি তোলা এবং ফিরে যাওয়ার প্রচলিত পর্যটনের পরিবর্তে এবার সিকিম রাজ্য মানুষকে সংগীতের টানে আমন্ত্রণ জানাতে, তাঁদের বেশি দিন ধরে রাখতে এবং রাজ্যের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখাতে উদ্যোগী হয়েছে। লাইভ সংগীতকে পর্যটন প্রসারের নতুন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার এই কৌশল হিমালয়ের এই রাজ্যের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই কৌশলের অংশ হিসেবেই নেপালের জনপ্রিয় ফোক রক ব্যান্ড নেপথ্য আগামী ৩১ অক্টোবর গ্যাংটকের পালজোর স্টেডিয়ামে সংগীত পরিবেশন করবে। আয়োজকদের দাবি, সিকিমের রাজধানীতে নেপথ্যের এটিই প্রথম অনুষ্ঠান। ‘লেটস গেট লাউড, সেলিব্রেট সিকিম’ নামে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানকে শুধুমাত্র একটি সংগীতসন্ধ্যা হিসেবে নয়, বরং কনসার্ট পর্যটনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক তথা বিধায়ক সঞ্জিত খারেলের বক্তব্য, মানুষ সংগীতের টানে সিকিমে আসুক, কয়েক দিন এখানে থাকুক এবং রাজ্যের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখুক—এটাই তাঁদের লক্ষ্য। তাঁর যুক্তি, কনসার্টে যোগ দিতে আসা দর্শকেরা হোটেল, পরিবহণ, কেনাকাটা এবং দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার জন্য অর্থ ব্যয় করেন। এর ফলে বড় ও ছোট—সব ধরনের স্থানীয় ব্যবসায়ী সরাসরি উপকৃত হন।
এই ভাবনা সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং গোলের প্রস্তাবিত কনসার্ট অর্থনীতির ধারণার সঙ্গে যুক্ত। উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কনসার্টকে একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার ওপর তিনি ধারাবাহিকভাবে জোর দিয়ে আসছেন।
এই উদ্যোগের একটি ছোট উদাহরণ গত বছরও দেখা গিয়েছিল। পজিটিভ ভাইবস এন্টারটেইনমেন্ট নেটওয়ার্ক গত বছরের ১৫ নভেম্বর গ্যাংটকে গায়ক সত্রাজ রাজ বৈদ্যের একটি কনসার্টের আয়োজন করেছিল। আয়োজক সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক বিকেশ কায়স্থের মতে, ওই কনসার্ট দেখতে সিকিমের বাইরে থেকে দুই হাজারেরও বেশি দর্শক এসেছিলেন। তাঁর দাবি, তাঁদের উপস্থিতিতে স্থানীয় বাজারে তিন কোটি টাকারও বেশি ব্যবসা হয়েছিল। তবে এই পরিসংখ্যান আয়োজকদের প্রাথমিক অনুমানমাত্র; এর স্বাধীনভাবে কোনও নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সিকিমের এই উদ্যোগের সঙ্গে নাগাল্যান্ডের হর্নবিল উৎসবের তুলনা করা যেতে পারে। সংস্কৃতি ও লাইভ সংগীত কীভাবে পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে, তার উদাহরণ ইতিমধ্যেই তুলে ধরেছে হর্নবিল উৎসব। শিলিগুড়ির সংগীতপ্রেমী আশিস প্রধান, যিনি নিয়মিত এই উৎসবে যোগ দেন, তাঁর মতে, রক সংগীত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ক্রমশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। পাশাপাশি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পর্যটকদের নাগাল্যান্ড সম্পর্কে আরও জানতে আগ্রহী করে তোলে। সিকিমও এখন সেই পথেই এগোচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে নেপালি ব্যান্ড ও শিল্পীদের উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত নেপথ্য নেপালের গ্রামীণ জনজীবনের কথ্য ভাষা এবং আদিবাসী সংগীতের প্রভাবে তৈরি সমকালীন গানের জন্য পরিচিত। গায়ক অমৃত গুরুঙের নেতৃত্বাধীন এই ব্যান্ডের প্রাথমিক ফোক-পপ সংগীতধারা পরবর্তীকালে রকের দিকে মোড় নেয়। নেপালের সংঘাতের সময় প্রকাশিত তাদের ‘ঘটনা’ অ্যালবাম শান্তির আহ্বান জানিয়েছিল।
এমন একটি ব্যান্ডের সিকিমে সংগীত পরিবেশন শুধু বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দুই হিমালয়-সংলগ্ন সমাজের মধ্যে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন হিসেবেও কাজ করে। নেপালি ভাষা ও আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত সিকিমে নেপালি শিল্পীদের আগমন পর্যটনের সঙ্গে এক আবেগপূর্ণ সম্পর্কও গড়ে তুলবে।
সিকিম এখন আর শুধুমাত্র দেখার জায়গা নয়; বরং সংগীত শোনার, আনন্দ উপভোগ করার এবং নানা অভিজ্ঞতাকে জীবন্ত করে তোলার এক আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠছে। এই রাজ্যের পর্যটন বিকাশে সংগীতের ভূমিকা ক্রমশ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

About Author

Advertisement