শ্রীমতি অন্নপূর্ণা দেবী(ভারত সরকারের নারী ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রী)
“স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে গঠন” -এই প্রতিপাদ্য নিয়ে ভারত ১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ব্রিকস-এর সভাপতিত্ব গ্রহণ করেছে। মহিলা-কেন্দ্রিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে আমাদের অবদানটি সুনির্দিষ্ট। আমরা কেবল কোনো স্লোগান কিংবা প্রদর্শনের জন্য সফলতার কোনো তালিকা নিয়ে আসছি না। আমরা এমন একটি কার্যকর কাঠামো বা কর্মপদ্ধতি নিয়ে আসছি যা ইতিমধ্যেই কোটি কোটি নারীর কাছে পৌঁছেছে। এই উদ্যোগ কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়—বরং ভারত থেকে এর সূচনা হলেও, বিশ্বের যেখানেই এটি সম্প্রসারিত হবে, সেখানেই একে আরও বিকশিত ও সমৃদ্ধ করার সুযোগ রয়েছে।এই পার্থক্যটিই হলো মূল বিষয়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারত ‘মহিলা-নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন’-কে একটি জাতীয় কর্মসূচি হিসেবে এমন এক ব্যাপক পরিসরে এগিয়ে নিয়ে চলেছে যার নজির খুব কম দেশেই পাওয়া যায়। ২০২৩ সালে জি-২০ গোষ্ঠীর সভাপতিত্ব করার সময় ভারত বিশ্বমঞ্চে আলোচনার অভিমুখ ‘মহিলা উন্নয়ন’ থেকে ‘মহিলা-নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন’-এর দিকে ঘুরিয়ে দিতে সহায়তা করেছিল। এটি কেবল শব্দচয়নের পরিবর্তন ছিল না, বরং ছিল দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন।নারীকে কেবল উন্নয়নের সুবিধাভোগী হিসেবে দেখার পরিবর্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে গণ্য করার এক নতুন সূচনা। কোচির এই আয়োজনে আমরা যে প্রশ্নটি সামনে আনছি, তা মূলত সেই পরিবর্তনেরই পরবর্তী ধাপ। একবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলে, কীভাবে তা ব্যাপক পরিসরে একেবারে প্রত্যন্ত গ্রামের শেষ প্রান্তের নারীর কাছেও পৌঁছে দেওয়া সম্ভব? ভারত কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, গত দশ বছর ধরে কার্যত সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজে চলেছে।ভারতের কাছে এই মনোভাব নতুন কিছু নয়,এটি অত্যন্ত প্রাচীন। উন্নয়নের ধারণা প্রচলিত হওয়ার অনেক আগে থেকেই আমাদের সংস্কৃতিতে নারীকে শক্তি, জ্ঞান ও সমৃদ্ধির—অর্থাৎ যে তিনটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে কোনো সমাজ গড়ে ওঠে, তার—মূল উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং দুর্গা, সরস্বতী ও লক্ষ্মীরূপে তাঁদের পূজো করা হয়েছে। ঐশ্বরিক শক্তিকেই ‘শক্তি’ নামে অভিহিত করা হয় এবং একটি বহুল-উদ্ধৃত সংস্কৃত শ্লোকে বলা হয়েছে যে, যেখানে নারীকে সম্মান করা হয়, সেখানে স্বয়ং দেবতারাও আনন্দিত হন। এই শ্রদ্ধা নিছক প্রতীকীও ছিল না, লোপামুদ্রা ও ঘোষার মতো মহিলা ঋষিরা ঋগ্বেদের মন্ত্র রচনা করেছিলেন এবং গার্গী ও মৈত্রেয়ীর মতো দার্শনিকরা উপনিষদের মহান তাত্ত্বিক বিতর্কে নিজেদের প্রজ্ঞা ও পাণ্ডিত্যের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। সুতরাং, ভারতের ক্ষেত্রে মহিলা-নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন কোনো ধার করা ধারণা নয়, বরং এটি একটি প্রাচীন ধারণারই সমসাময়িক রূপ।শুরুটা করা যাক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি দিয়েই। ভারতের পঞ্চায়েতি রাজ প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রায় অর্ধেকই নারী—যা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম নির্বাচিত নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্র—এবং ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম, ২০২৩’-এর মাধ্যমে সংসদ ও রাজ্য বিধানসভাগুলোতে নারীদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষিত করা হয়েছে। তবে নারীর প্রতিনিধিত্বই কিন্তু নারী-নেতৃত্বাধীন উন্নয়নের শেষ কথা নয়, বরং এখান থেকেই এর সূচনা। নারীদের সেবা প্রদান করে ঠিকই, কিন্তু সেই সেবা-কাঠামো নির্ধারণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে তাদের বাইরে রাখে, এমন কোনো মডেলকে কোনোভাবেই ‘নারী-নেতৃত্বাধীন’ বলা যায় না।এই পরিষেবা প্রদানের কাঠামোটি তিনটি উপাদানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা কেবল সম্মিলিতভাবেই কার্যকর হয়। প্রথমটি হলো ‘নাগালের মধ্যে সেবা পৌঁছানো’ ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা ডিজিটাল গণ-পরিকাঠামো সরাসরি নারীদের হাতে সুবিধা পৌঁছে দেয়, আধার-সংযুক্ত অর্থ স্থানান্তরের ফলে যেসব মধ্যস্বত্বভোগীরা আগে সরকারি সহায়তা প্রকৃত প্রাপকের কাছে পৌঁছানোর আগেই তা সরিয়ে নিত তাঁদের আর কোনো ভূমিকা থাকে না। ‘প্রধানমন্ত্রী মাতৃ বন্দনা যোজনা’ এই ব্যবস্থার কার্যকারিতার একটি বাস্তব উদাহরণ। এর আওতায় ৪.২৬ কোটিরও বেশি মা তাঁদের আধার-সংযুক্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি ২০,০৬০ কোটি টাকারও বেশি মাতৃত্বকালীন সুবিধা পেয়েছেন। দ্বিতীয়টি হলো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ‘ ডিএওয়াই এনআরএলএম’ কর্মসূচির অধীনে ১০.০৫ কোটিরও বেশি গ্রামীণ এলাকার মহিলাকে ৯০.৯০ লক্ষেরও বেশি ‘স্বয়ং-সহায়ক গোষ্ঠী’-র অন্তর্ভুক্ত করে সংগঠিত করা হয়েছে। এটি মহিলা-চালিত সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিশ্বের বৃহত্তম নেটওয়ার্ক। তৃতীয়টি হলো ‘গতিশীলতা’ অর্থাৎ মূল্য-শৃঙ্খলের একেবারে নিচের স্তরে স্থায়ীভাবে আটকে না থেকে বরং উন্নতির পথে সচেতনভাবে এগিয়ে যাওয়া। ভারত বর্তমানে ৬৫,৯৪৯ জন স্বয়ং-সহায়ক গোষ্ঠীর সদস্যকে ‘বিজনেস করেসপন্ডেন্ট এজেন্ট’ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে। তাঁরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমানত, ঋণ, রেমিট্যান্স এবং পেনশনের মতো পরিষেবা পৌঁছে দিচ্ছেন। যে নারী একসময় সরকারি সুবিধা পাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়াতেন, তিনিই এখন সেই পরিষেবা পৌঁছে দিচ্ছেন।এসবের সমন্বয়ে অংশগ্রহণ রূপান্তরিত হয় আয় ও মালিকানায়। ‘লাখপতি দিদি’ উদ্যোগের আওতায়, ২০২৫ সালের জুন নাগাদ ১.৪৮ কোটি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর নারী সদস্য বার্ষিক অন্তত ১ লক্ষ টাকা আয়ের স্তরে পৌঁছেছিলেন। এছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া উদ্যোক্তা বিষয়ক জাতীয় অভিযানের লক্ষ্য হলো ৫০ হাজার ‘কমিউনিটি রিসোর্স পার্সন’-এর মাধ্যমে আরও ৫০ লক্ষ নারীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা। আনুষ্ঠানিক উদ্যোগের ক্ষেত্রেও অগ্রগতির একই ধারা পরিলক্ষিত হয়। পিএমএমওয়াই -এর আওতায় প্রদত্ত ঋণের ৬৯ শতাংশ এবং ‘স্ট্যান্ড-আপ ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির ৮৪ শতাংশ সুবিধাভোগীই হলেন নারী। পাশাপাশি ডিপিআইআইটি কর্তৃক স্বীকৃত ২.১২ লক্ষ স্টার্টআপের মধ্যে ১.০২ লক্ষেরও বেশিতে অন্তত একজন নারী পরিচালক বা অংশীদার রয়েছেন।এদের অনেকেই বড় শহরের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত ছোট শহরের বাসিন্দা। ব্রিকস-এর কাছে আমরা কেবল এই পরিচিত নামগুলোই তুলে ধরছি না, বরং এর অন্তর্নিহিত ক্রমধারাটিও উপস্থাপন করছি।প্রথমে ব্যাপক পরিসরে পৌঁছানো, এরপর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা এবং সবশেষে সুবিধাভোগী থেকে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার একটি সুবিন্যস্ত পথ তৈরি করা।পরিসংখ্যানগুলো এই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। ২০১৭-১৮ সালে ভারতে কর্মশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের হার ছিল ২৩.৩ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ সালে বেড়ে ৪১.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে ।একই সময়ে নারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৫.৬ শতাংশ থেকে কমে ৩.২ শতাংশে নেমে এসেছে। বর্তমানে কর্মশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি হওয়ায়, আমাদের মনোযোগ এখন পরবর্তী ধাপের দিকে—অর্থাৎ তাদের কাজের মান ও আয়ের আরও উন্নয়ন ঘটানো।এবারের নারী-কেন্দ্রিক কর্মসূচিতে চারটি অগ্রাধিকারমূলক ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে একটি সরাসরি আমাদের অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যা্য তা হল জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির ক্ষেত্রে নারীদের ভূমিকা। এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নারীরা যখন অংশ নেন, তখন পুষ্টির অবস্থার উন্নতি ঘটে এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি বা আঘাত আরও ভালোভাবে সামলে উঠতে পারে। এটি কোনো তাত্ত্বিক বা বিমূর্ত বিষয় নয়। ঝাড়খণ্ডের নারী কৃষকদের কাছে এমন সব ধরণের বীজের তথ্য রয়েছে যা দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুমেও টিকে থাকতে সক্ষম। রাজস্থানের নারী পশুপালকরা জানেন কোন পথে গবাদি পশুদের নিয়ে খরা-কবলিত এলাকা পার করা সম্ভব। এই বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতাকে উপেক্ষা না করে কাজে লাগাবে এমন সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ভারতের লক্ষ্য হওয়া উচিত। ‘মিশন পোষণ ২.০’কর্মসূচিটি অঙ্গনওয়াড়ি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে নারীরাই তৃণমূল পর্যায়ে সেবা পৌঁছে দেওয়ার বিশ্বস্ত মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি কাজ করে। লাদাখে নারীদের তৈরি উঁচু জলাধার বা জল-সংরক্ষণ কাঠামো থেকে শুরু করে ওড়িশা উপকূলে ম্যানগ্রোভ বন রক্ষাকারী কমিটি পর্যন্ত সর্বত্রই এর প্রতিফলন দেখা যায়। এছাড়া, অভিযোজন-সংক্রান্ত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নারীরা এখন কেবল গ্রহীতা নন, বরং ক্রমশ নিজেরাই তা পরিচালনা করছেন: ‘নমো ড্রোন দিদি’ প্রকল্পের আওতায় স্বনির্ভর গোষ্ঠীর নারীদের কৃষি-কাজে ব্যবহৃত ড্রোন ওড়ানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এটি অধিকতর দক্ষতা ও উচ্চ আয়ের কাজের দিকে তাঁদের এগিয়ে নেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ।একটি বিষয় একান্তই ভারতের নিজস্ব। ‘এক জেলা এক পণ্য’ প্রকল্পের মাধ্যমে, এখন ৭৬১টি জেলা জুড়ে ১,১০২টি পণ্যকে অন্তর্ভুক্ত করে, নারী সংগঠনগুলো স্থানীয় বিশেষত্ব—যেমন হস্তনির্মিত তাঁত, জিআই-ট্যাগযুক্ত হস্তশিল্প, আঞ্চলিক খাবার—কে ব্র্যান্ডেড এবং ক্রমবর্ধমানভাবে রপ্তানিমুখী পণ্যে রূপান্তরিত করে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র বাজারের পথ তৈরি করে দেয় ‘অবসর’ প্রকল্পের অধীনে বিমানবন্দরে সংরক্ষিত খুচরা বিক্রয়ের জায়গা এবং ‘ভোকাল ফর লোকাল’-এর আওতায় নারী-নেতৃত্বাধীন উদ্যোগগুলোর জন্য একটি বিশেষ ‘জিইএম’ স্টোরফ্রন্ট। এটিই আক্ষরিক অর্থে টেকসই উন্নয়ন—স্থানীয় উপকরণ, স্থানীয় দক্ষতা এবং স্থানীয় সরবরাহ ব্যবস্থা যা মূল্যকে সম্প্রদায়ের মধ্যেই ধরে রাখে এবং এমন এক ধরনের উন্নয়ন যার জন্য একজন নারীকে বাজারে পৌঁছানোর জন্য নিজের জেলা ছাড়তে হয় না।মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর দূরদর্শী নেতৃত্বে, নারী-নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন কেবল সরকারের ঘোষিত একটি আকাঙ্ক্ষা নয়, এটি এমন একটি ব্যবস্থা যা সরকার ধাপে ধাপে গড়ে তোলে, যতক্ষণ না তা সেই শেষ নারীর কাছে পৌঁছায় যার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছিল। এই জুলাই মাসে কোচিতে আয়োজিত মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে, ভারত এই কাঠামোটিকে একটি অবদান হিসেবে উপস্থাপন করবে। এটি এমন কোনো নির্দেশিকা নয় যা থেকে অন্যরা শিক্ষা নিয়ে নিজেদের পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। সেই ব্যবস্থা এবং তার কার্যকারিতার প্রমাণই ভারত ব্রিকস-এ নিয়ে আসছে। এই আদান-প্রদান দ্বিমুখী। ভারত ব্রিকস অংশীদারদের নিয়ে আসা সেরা অনুশীলনগুলো থেকে শিখতে এবং নিজেরগুলোও ভাগ করে নিতে প্রস্তুত হয়ে কোচিতে আসছে।










