অচেনা রবীন্দ্রনাথ: এক অভাবনীয় গৌরবময় জীবন অধ্যায়

rabindranath-tagore-removes-the-worry-of-his-disciple-in-this-way

বেবি চক্রবর্ত্তী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামটি উচ্চারিত হলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বিশ্বকবি, এক সাহিত্যসম্রাট, এক দার্শনিক ও মানবতাবাদীর প্রতিচ্ছবি। তাঁর কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস এবং প্রবন্ধ বাংলা সাহিত্যকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি বিশ্বসাহিত্যের ভাণ্ডারেও এক অনন্য স্থান অধিকার করেছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের যে পরিচয়টি আমরা সাধারণত জানি, তার আড়ালেও লুকিয়ে আছে এক ভিন্ন রবীন্দ্রনাথ—এক অচেনা, অনাবিষ্কৃত এবং বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। এই অচেনা রবীন্দ্রনাথকে জানার মধ্য দিয়েই আমরা তাঁর প্রকৃত মহত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারি।
শৈশবের নিঃসঙ্গতা ও আত্মগঠন:-
রবীন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৬১ সালের ৭ মে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। বাহ্যিকভাবে অভিজাত ও সমৃদ্ধ পরিবারের সন্তান হলেও তাঁর শৈশব ছিল অনেকাংশে নিঃসঙ্গ। পরিবারের সদস্যসংখ্যা ছিল বিশাল, কিন্তু প্রত্যেকেই নিজেদের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। ছোটবেলায় তিনি মায়ের সান্নিধ্য খুব বেশি পাননি। গৃহশিক্ষক এবং পরিচারকদের তত্ত্বাবধানে তাঁর বেড়ে ওঠা।
এই নিঃসঙ্গতাই তাঁকে অন্তর্মুখী করে তুলেছিল। বাড়ির বারান্দা, ছাদ কিংবা জানালার পাশে বসে তিনি প্রকৃতিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রকৃতির যে অসাধারণ উপস্থিতি দেখা যায়, তার ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল এই শৈশবেই। অনেকেই রবীন্দ্রনাথকে শুধু কবি হিসেবে জানেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিশীলতার মূল উৎস ছিল একাকীত্ব ও আত্মঅনুসন্ধান।

প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ:-
অচেনা রবীন্দ্রনাথের অন্যতম দিক হলো তাঁর শিক্ষাচিন্তা। তিনি প্রচলিত বিদ্যালয় শিক্ষাকে কখনোই মন থেকে গ্রহণ করতে পারেননি। স্কুলের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি শিক্ষা তাঁর কাছে ছিল একঘেয়ে এবং সৃজনশীলতাবিরোধী। এজন্য তিনি একাধিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও কোথাও বেশিদিন পড়াশোনা করেননি।
পরবর্তীকালে তিনি শান্তিনিকেতনে যে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলেন, তা ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। প্রকৃতির মাঝে মুক্ত পরিবেশে শিক্ষা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আন্তরিক সম্পর্ক, শিল্প-সাহিত্য ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা—এসব ছিল তাঁর শিক্ষাদর্শনের মূল ভিত্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার জন্য নয়; বরং মানুষের পূর্ণ বিকাশের জন্য।
আজকের যুগে যখন শিক্ষাকে প্রায়ই চাকরি পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়, তখন রবীন্দ্রনাথের এই চিন্তাধারা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়।
রবীন্দ্রনাথকে আমরা সাহিত্যিক হিসেবে যতটা চিনি, সমাজসংস্কারক হিসেবে ততটা চিনি না। জমিদারির কাজের সূত্রে তিনি পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। সেখানে তিনি গ্রামের মানুষের দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও নানা সমস্যাকে খুব কাছ থেকে দেখেন।
তিনি উপলব্ধি করেন যে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয় যদি গ্রামের উন্নয়ন না ঘটে। তাই তিনি কৃষকদের জন্য সমবায় ব্যবস্থা চালু করার উদ্যোগ নেন, কৃষি উন্নয়নের নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেন।
পরে শান্তিনিকেতনের পাশে শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি পল্লি উন্নয়নের এক অনন্য মডেল গড়ে তোলেন। তাঁর এই কর্মযজ্ঞ প্রমাণ করে যে তিনি শুধু কল্পনার কবি ছিলেন না; বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধানেও ছিলেন গভীরভাবে আগ্রহী।
বিজ্ঞানমনস্ক রবীন্দ্রনাথ:-
সাধারণ ধারণা হলো কবিরা আবেগপ্রবণ হন এবং বিজ্ঞান থেকে দূরে থাকেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এর ব্যতিক্রম। তিনি বিজ্ঞান সম্পর্কে গভীর আগ্রহী ছিলেন এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
তাঁর লেখা ‘বিশ্বপরিচয়’ গ্রন্থটি বিজ্ঞানের জটিল বিষয়কে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করার এক অসাধারণ উদাহরণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞান মানুষের জ্ঞানকে প্রসারিত করে এবং কুসংস্কার দূর করতে সাহায্য করে।
বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর আলোচনা আজও ইতিহাসে স্মরণীয়। সেই আলোচনায় বাস্তবতা, সত্য এবং মানবচেতনা নিয়ে তাঁদের গভীর মতবিনিময় হয়েছিল। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথ কেবল সাহিত্যিকই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন মুক্তমনা চিন্তাবিদও।
চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথ:-
রবীন্দ্রনাথের আরেকটি অচেনা পরিচয় হলো তাঁর চিত্রশিল্পী সত্তা। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তিনি ছবি আঁকা শুরু করেন। আশ্চর্যের বিষয়, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই তিনি প্রায় দুই হাজারেরও বেশি চিত্রকর্ম সৃষ্টি করেন।
তাঁর ছবিগুলোতে দেখা যায় এক স্বতন্ত্র শৈলী। মানুষের মুখ, পশুপাখি, বিমূর্ত আকৃতি এবং কল্পনার নানা রূপ তাঁর তুলিতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তাঁর চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় এবং শিল্পসমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে।
অনেকেই জানেন না যে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম আন্তর্জাতিক শিল্পাঙ্গনেও যথেষ্ট মর্যাদা লাভ করেছিল। তাঁর সৃষ্টিশীলতার এই দিকটি তাঁকে আরও বিস্ময়কর করে তোলে।
রাজনৈতিক চেতনা ও মানবতাবাদ:-
রবীন্দ্রনাথ সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, কিন্তু রাজনৈতিক ঘটনাবলির প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। তিনি জাতীয়তাবাদকে সমর্থন করলেও অন্ধ জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করেছেন।
১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া নাইট উপাধি ত্যাগ করেন। এটি ছিল এক সাহসী ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। তাঁর এই সিদ্ধান্ত সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
তবে তিনি মনে করতেন, মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ধর্ম, জাতি কিংবা রাষ্ট্রের সংকীর্ণ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি মানবতার কথা বলেছেন। তাঁর রচনায় বারবার বিশ্বমানবতার এই বাণী উচ্চারিত হয়েছে।
ভ্রমণপিপাসু রবীন্দ্রনাথ:-
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন অসাধারণ ভ্রমণপ্রেমী। জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন।
এই ভ্রমণগুলো তাঁর চিন্তাজগতকে সমৃদ্ধ করেছিল। বিভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা ও সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের ফলে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আরও ব্যাপক ও বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে।
বিদেশ সফরের সময় তিনি অসংখ্য বক্তৃতা দিয়েছেন এবং পূর্ব ও পশ্চিমের সাংস্কৃতিক সংলাপের সেতুবন্ধন রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর কাছে পৃথিবী ছিল একটি বৃহৎ পরিবার।
পরিবেশচিন্তক রবীন্দ্রনাথ:-
আজকের পৃথিবীতে পরিবেশ সংরক্ষণ একটি বড় আলোচনার বিষয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বহু আগেই প্রকৃতি ও পরিবেশের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। তাই শান্তিনিকেতনে তিনি বৃক্ষরোপণ উৎসব, বর্ষামঙ্গল এবং হলকর্ষণ উৎসবের প্রচলন করেন। এসব উৎসবের মাধ্যমে মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে সংযুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন।‌ তাঁর কবিতা ও গানে প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে। আধুনিক পরিবেশবাদী চিন্তার সঙ্গে তাঁর দর্শনের বিস্ময়কর মিল লক্ষ্য করা যায়।
ব্যক্তিগত জীবনের বেদনা:-
রবীন্দ্রনাথের জীবন কেবল সাফল্য ও সম্মানের গল্প নয়; এটি গভীর বেদনায়ও পরিপূর্ণ। স্ত্রী মৃণালিনী দেবী, কন্যা রেণুকা, পুত্র শমীন্দ্রনাথ এবং আরও কয়েকজন প্রিয়জনের অকালমৃত্যু তাঁকে বারবার আঘাত করেছে।
তবুও তিনি ভেঙে পড়েননি। ব্যক্তিগত শোককে তিনি সৃষ্টিশীল শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। তাঁর বহু কবিতা, গান এবং প্রবন্ধে এই গভীর জীবনবোধের প্রকাশ ঘটেছে।
এই দিকটি আমাদের শেখায় যে প্রতিকূলতার মধ্যেও সৃজনশীলতা এবং মানবিকতা বজায় রাখা সম্ভব।
বিশ্বকবি পরিচয়ের আড়ালে মানুষ রবীন্দ্রনাথ:-
রবীন্দ্রনাথকে আমরা প্রায়ই দেবতুল্য মর্যাদা দিয়ে দেখি। কিন্তু তাঁর প্রকৃত শক্তি ছিল তাঁর মানবিকতায়। তিনি হাসতেন, রসিকতা করতেন, ভুল করতেন, নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করতেন এবং নিজের চিন্তাকেও প্রশ্ন করতেন।
চিঠিপত্র, স্মৃতিকথা এবং সমসাময়িকদের লেখায় আমরা এক প্রাণবন্ত, কৌতূহলী এবং সহজ মানুষ রবীন্দ্রনাথকে দেখতে পাই। তিনি শিশুদের সঙ্গে যেমন আনন্দে মিশতেন, তেমনি বিশ্বনেতা ও চিন্তাবিদদের সঙ্গেও সমান স্বাচ্ছন্দ্যে আলোচনা করতেন।
এই মানবিক রবীন্দ্রনাথকে জানলে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা আরও গভীর হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কেবল কবি, সাহিত্যিক বা নোবেলজয়ী হিসেবে দেখলে তাঁর ব্যক্তিত্বের পূর্ণতা উপলব্ধি করা যায় না। তিনি ছিলেন শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক, কৃষি উন্নয়নের পথিকৃৎ, বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাবিদ, চিত্রশিল্পী, পরিবেশপ্রেমী, বিশ্বভ্রমণকারী এবং সর্বোপরি একজন মানবতাবাদী মানুষ।
অচেনা রবীন্দ্রনাথকে জানার অর্থ হলো তাঁর বহুমাত্রিক জীবনদর্শনকে জানা। তাঁর চিন্তা ও কর্ম আজও আমাদের পথ দেখায়—মুক্তচিন্তা, মানবতা, শিক্ষা, প্রকৃতিপ্রেম এবং বিশ্বভ্রাতৃত্বের পথে। তাই রবীন্দ্রনাথ কেবল অতীতের একজন মহান ব্যক্তি নন; তিনি বর্তমান ও ভবিষ্যতেরও এক চিরন্তন প্রেরণার উৎস। তাঁর পরিচয়ের যত গভীরে প্রবেশ করা যায়, ততই আবিষ্কৃত হয় নতুন নতুন রবীন্দ্রনাথ—এক সত্যিকারের অচেনা রবীন্দ্রনাথ।

About Author

Advertisement