দেবেন্দ্র কিশোর
বিশ্বজুড়ে শক্তি প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে। এমন সময় বেটাভোল্ট নিউ এনার্জি টেকনোলজি উদ্ভাবিত ‘বিভি ১০০’ নামের ক্ষুদ্র পারমাণবিক ব্যাটারি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। “৫০ বছর পর্যন্ত চার্জ ছাড়াই চলতে সক্ষম ব্যাটারি” — এই দাবি নিজেই অত্যন্ত বিস্ময়কর এবং আকর্ষণীয়। মুদ্রার মতো ছোট আকারের এই ব্যাটারি যদি কোম্পানির দাবিমতো কার্যকর প্রমাণিত হয়, তবে তা শক্তি প্রযুক্তির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এর সঙ্গে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক, বাণিজ্যিক এবং নিরাপত্তাজনিত প্রশ্নও জড়িত, যেগুলোর সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ জরুরি।
‘বিভি ১০০’ ব্যাটারির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর দীর্ঘমেয়াদি শক্তি সরবরাহ ক্ষমতা। কোম্পানির দাবি অনুযায়ী, এই ব্যাটারি কোনো রিচার্জ বা রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই ৫০ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। এতে ব্যবহৃত ‘নিকেল-৬৩’ নামের তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে শক্তি উৎপন্ন করে, যা ‘বেটাভোল্টাইক কনভার্সন’ প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়। কৃত্রিম ডায়মন্ড সেমিকন্ডাক্টরের মাধ্যমে উৎপন্ন এই শক্তিকে অত্যন্ত স্থিতিশীল ও দীর্ঘস্থায়ী বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এই ধারণা সম্পূর্ণ নতুন নয়। এর আগেও পারমাণবিক শক্তিনির্ভর ছোট ব্যাটারি মহাকাশ গবেষণা ও সামরিক যন্ত্রপাতিতে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু সেগুলো সাধারণ ভোক্তাদের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ এবং আকারে বড় ছিল। বেটাভোল্ট নিউ এনার্জি টেকনোলজি দাবি করছে যে তারা একই প্রযুক্তিকে ছোট, নিরাপদ এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য করে তুলেছে। এ কারণেই বিষয়টি বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এখন কি সত্যিই এমন সময় আসছে যখন মোবাইল বা ল্যাপটপ আর কখনও চার্জ দিতে হবে না?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর উত্তর আপাতত “না”। বর্তমানে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ‘বিভি ১০০’ ব্যাটারির বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা এখনও খুবই সীমিত। এটি মাইক্রোওয়াট মাত্রার শক্তি উৎপন্ন করে, যা চিকিৎসা সরঞ্জাম, ক্ষুদ্র সেন্সর বা কম শক্তি ব্যবহারকারী যন্ত্রের জন্য উপযোগী হতে পারে। কিন্তু আধুনিক স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা বৈদ্যুতিক যানবাহন চালাতে অনেক বেশি শক্তির প্রয়োজন হয়। ফলে নিকট ভবিষ্যতে এই ব্যাটারি প্রচলিত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির সম্পূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
তবুও এর সম্ভাব্য ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, পেসমেকারের মতো চিকিৎসা যন্ত্রে বারবার অস্ত্রোপচার করে ব্যাটারি পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দূর হতে পারে। একইভাবে পাহাড়, মরুভূমি বা সমুদ্রের গভীরে স্থাপিত সেন্সরগুলো বহু বছর ধরে রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই কাজ করতে পারবে। মহাকাশ অভিযানের ক্ষেত্রেও এ ধরনের ব্যাটারি অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে, যেখানে শক্তি সরবরাহ একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
নিরাপত্তার বিষয়ে কোম্পানির দাবি, এই ব্যাটারি থেকে ক্ষতিকর গামা বিকিরণ নির্গত হয় না এবং নিকেল-৬৩ ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার পর স্থিতিশীল তামায় রূপান্তরিত হয়। তবুও “পারমাণবিক” শব্দটির সঙ্গে জড়িত ভয় ও সন্দেহ স্বাভাবিক। তেজস্ক্রিয় পদার্থের উৎপাদন, পরিবহন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিয়ম অত্যন্ত কঠোর। ভবিষ্যতে যদি এই ধরনের ব্যাটারি বৃহৎ পরিসরে বাজারে আসে, তবে এর নিরাপত্তা, পরিবেশগত প্রভাব এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন হবে।
এই ঘটনাটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও সামনে এনেছে—শক্তি প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীন-এর দ্রুত উত্থান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক যানবাহন, সৌরশক্তি এবং এখন ক্ষুদ্র পারমাণবিক ব্যাটারি—সব ক্ষেত্রেই চীন তার প্রযুক্তিগত প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে। এটি পশ্চিমা বিশ্বের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ‘বিভি ১০০’ একটি আকর্ষণীয় ও সম্ভাবনাময় উদ্ভাবন, যা ভবিষ্যতের শক্তি প্রযুক্তি নিয়ে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে। তবে একে “মোবাইলকে চিরতরে চার্জমুক্ত করে দেওয়া বিপ্লব” বলা এখনও সময়ের আগে হবে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, বাণিজ্যিক কার্যকারিতা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলোর পূর্ণ প্রমাণ এখনও বাকি। তাই এই প্রযুক্তিকে অলৌকিক আবিষ্কার হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাবনার এক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিযুক্ত।










