নকশালবাড়ির পর শিলিগুড়ি করিডরে বামপন্থার পুনর্গঠন ও বাংলার পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্য

IMG-20260427-WA0069

দেবেন্দ্র কে. ঢুঙ্গানা

নয়াদিল্লি: পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে নকশালবাড়ি শুধু একটি ভূগোল নয়, বরং একটি আদর্শিক বিস্ফোরণের প্রতীক। ১৯৬৭ সালে শুরু হওয়া নকশাল আন্দোলন ভারতীয় বামপন্থাকে সশস্ত্র সংগ্রামের পথে এগিয়ে দেয় এবং তাকে রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে নিয়ে আসে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই আন্দোলন আজ রাজনৈতিকভাবে প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। প্রশ্ন উঠছে – বামপন্থা কি সত্যিই শেষ হয়ে গেছে, নাকি নতুন রূপে নিজেকে পুনর্গঠিত করছে?
বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, পূর্ব-মধ্য ভারতে মাওবাদী আন্দোলনের প্রভাব অনেকটাই কমে গেছে। নিরাপত্তা কৌশল, উন্নয়নমূলক কর্মসূচি এবং স্থানীয় রাজনৈতিক সমন্বয়ের ফলে সশস্ত্র বিদ্রোহের ভিত্তি দুর্বল হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বামপন্থী মতাদর্শের অবসান হয়েছে। বরং এটি একটি রূপান্তরের সময়,i যেখানে বন্দুকের জায়গা নিয়েছে ব্যালট।
শিলিগুড়ি করিডর, যাকে ‘চিকেন নেক’ বলা হয়, আজ আবার কৌশলগত ও রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগের জীবনরেখা, পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি সংবেদনশীল অঞ্চল। নকশালবাড়ি আন্দোলনের সূতিকাগার এই এলাকায় হওয়ায় এর প্রতীকী গুরুত্ব আজও অটুট।
বর্তমান বিধানসভা নির্বাচনে বামপন্থী দলগুলি, বিশেষ করে সিপিআই(এম), কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে তাদের হারানো ভিত্তি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে। এটি শুধু নির্বাচনী অঙ্ক নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। একসময় বাংলার শাসনক্ষমতায় থাকা বামফ্রন্ট আজ প্রান্তিক অবস্থায় পৌঁছেছে, এবং সেই প্রেক্ষিতেই তাদের সক্রিয়তা বোঝা জরুরি।
কৌশলগতভাবে বামপন্থীরা এখন সরাসরি সংঘর্ষের রাজনীতি ছেড়ে সহযোগিতা ও জোটের পথে হাঁটছে। শিলিগুড়ি করিডর, ডুয়ার্স এবং উত্তর-পূর্ব হিমালয় সংলগ্ন জেলাগুলিতে তারা স্থানীয় জাতিগত, ভাষাগত ও অর্থনৈতিক অসন্তোষকে রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখছে। চা-বাগানের শ্রমিক, আদিবাসী সম্প্রদায় এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষ আজও উন্নয়ন ও প্রতিনিধিত্বের অভাব অনুভব করে, এই শূন্যস্থানেই বামপন্থীরা ফিরে আসার পথ খুঁজছে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস আঞ্চলিক পরিচয় ও কল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান মজবুত করেছে। অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি জাতীয়তাবাদ, নিরাপত্তা এবং ‘জনসংখ্যা পরিবর্তন’-এর মতো ইস্যু তুলে ধরে মেরুকরণের রাজনীতি করছে। এই পরিস্থিতিতে বামপন্থীদের জন্য আলাদা পরিচয় গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বামপন্থার অন্যতম বড় দুর্বলতা হল সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আদর্শগত নমনীয়তা না দেখাতে পারা। যখন বিশ্বজুড়ে কমিউনিস্ট আন্দোলন সংস্কার ও উদারনীতির দিকে এগিয়েছে, তখন ভারতীয় বামপন্থা পুরনো কাঠামোতেই আটকে ছিল। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য শিল্পায়নের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু দলের ভেতর থেকেই বিরোধিতার মুখে পড়েন। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের আন্দোলন শুধু একটি শিল্প প্রকল্পকেই থামায়নি, বরং বামপন্থার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকেও বড় আঘাত দেয়।
বর্তমান নির্বাচনে বামপন্থীদের সক্রিয়তা প্রধানত দুই স্তরে দেখা যায়। প্রথমত, সংগঠন পুনর্গঠন, স্থানীয় স্তরে কর্মীদের পুনরায় সক্রিয় করা। দ্বিতীয়ত, বিকল্প রাজনৈতিক বয়ান, মেরুকরণ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে সরে এসে শ্রেণিভিত্তিক ও অর্থনৈতিক ইস্যুকে সামনে আনা। তবুও প্রশ্ন রয়ে যায়, এটি কি যথেষ্ট?
শিলিগুড়ি করিডরে তাদের কৌশল স্পষ্ট। এলাকার ভৌগোলিক সংবেদনশীলতা, সীমান্ত রাজনীতি এবং সামাজিক বৈচিত্র্যকে ভিত্তি করে তারা প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে বর্তমানে এই অঞ্চল বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের সরাসরি লড়াইয়ের কেন্দ্র, যেখানে বামপন্থা তৃতীয় শক্তি হিসেবে সীমাবদ্ধ।
ভারতীয় জাতীয় রাজনীতিতে এর প্রভাব কী হতে পারে? স্বল্পমেয়াদে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে, যদি বামপন্থীরা তাদের কৌশল সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে তারা আবার ‘কিংমেকার’-এর ভূমিকায় ফিরে আসতে পারে, বিশেষ করে জোট রাজনীতির যুগে। সংসদে কম আসন থাকলেও নির্ণায়ক ভূমিকা নেওয়ার সম্ভাবনা এখনও রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত, নকশালবাড়ির উত্তরাধিকার শুধু ইতিহাস নয়, বর্তমানেরও ইঙ্গিত। সশস্ত্র সংগ্রাম থেকে সংসদীয় রাজনীতিতে পরিবর্তন বামপন্থাকে নতুন সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে আদর্শগত স্বচ্ছতা, সাংগঠনিক শক্তি এবং সময়োপযোগী কৌশল অপরিহার্য।
আজ দেওয়ালে লেখা বিপ্লবের স্লোগান ফিকে হয়ে গেলেও রাজনীতি এখনও পরিবর্তনশীল। শিলিগুড়ি করিডরে আবারও শক্তির ভারসাম্যের নতুন খেলা শুরু হয়েছে। বামপন্থার জন্য এটি হয়তো শেষ সুযোগ, ইতিহাসের স্মৃতি ছেড়ে বর্তমানের প্রেক্ষাপটে নিজেদের নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার।

About Author

Advertisement