বেবি চক্রবর্ত্তী
কল্পনাশক্তির চর্চা ছাড়া কোনো মানুষই কখনো কোনো মহান আবিষ্কার করতে পারেনি..! মানব ইতিহাসে এমন কিছু আবিষ্কার আছে যা সভ্যতার গতিপথ ঘুরিয়ে দিয়েছে। মানব দৃষ্টি প্রকৃতির উপহার হলেও এর সীমাবদ্ধতা খুবই স্পষ্ট। বিজ্ঞান গবেষণার ইতিহাসে কত মানুষ এসেছেন, আবার চলেও গেছেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে কিছু মানুষ, অমর হয়ে থেকে গেছেন। প্রথাগত কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বা কোন নামজাদা গবেষণাগারের সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন না। তবু তাঁকে আধুনিক জীব বিদ্যার অন্যতম জনক বলা হয়। তাঁর নাম অ্যান্টনি ভ্যান লেভেনহুক। জীবনের প্রথম দিকে তাঁর পরিচয় ছিল একজন ঝাড়ুদার ও চশমার কাঁচ নির্মাতা হিসাবে।
একজন ঝাড়ুদার ও চশমার কাঁচ নির্মাতা কেমন করে হয়ে উঠলেন আধুনিক জীববিদ্যার অন্যতম জনক তা জানতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সপ্তদশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে। নেদারল্যান্ডের ডেলফট শহরে একটি চশমার দোকানে দাঁড়িয়ে থাকে এক কিশোর। দোকানের কর্মচারীরা কেমন করে কাঁচ ঘষে চশমা তৈরি করে সেটাই মন দিয়ে দেখতে থাকে ছেলেটা। কয়েক বছর আগে ছেলেটির বাবা মারা গেছেন। আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ। তাই স্কুলের পাঠ শেষ না করেই একটি মুদির দোকানে চাকরি নেয় ছেলেটি। এরই মধ্যে পুরসভার একটা চাকরি জুটে যায় তার। খুব একটা বড় চাকরি নয়, ঝাড়ুদার এর কাজ- পেট চালাতে সেই কাজটি তিনি করতে শুরু করেন। ঝাড়ুদার এর কাজ করলেও ছেলেটির মন পড়ে আছে ওই চশমার দোকানের দিকে।
ছেলেটি চশমার দোকানে কাঁচ কাটা দেখে বুঝতে পেরেছিল এক টুকরো কাঁচ ঘষে মাঝখানটা উঁচু করতে পারলে সেটা লেন্সে পরিণত হয়। তার ভেতর দিয়ে তাকালে ছোট জিনিস বড় দেখায়। ছেলেটি তখন ভাবে সে নিজেই এই জিনিস তৈরি করবে। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। সত্যি সে কাঁচ ঘষে লেন্স তৈরি করে, সেটা চশমার দোকানের থেকেও ভালো লেন্স। ১৬৩২ সালে নেদারল্যান্ডের ডেলফট শহরে জন্ম নেওয়া এই শিশুটি খুব অল্প বয়সেই তৈরি করে ফেললেন “একক লেন্স যুক্ত মাইক্রোস্কোপ”- তাঁর আবিষ্কৃত এই মাইক্রোস্কোপ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে জলের নিচে সাঁতার কাটা এককোষী জীব ( যাদের তিনি ‘অ্যানিমেলকিউলুস’ নামে ডাকতেন) দেখতে সক্ষম হন।
১৬৭৪ সালে তিনি জল, দাঁতের ময়লা, রক্ত, বীজ, খাদ্যদ্রব্য প্রভৃতি নানা জিনিস পরীক্ষা করে একের পর এক নতুন জগৎ আবিষ্কার করতে থাকেন। তিনি নিজে কোন প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও তাঁর গবেষণা অত্যন্ত বিস্ময়কর ছিল। অ্যান্টনি লেভেনহুক ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া, প্রোটোজোয়া এমনকি মানব শুক্রাণুও পর্যবেক্ষণ করেন। এসব তথ্য তিনি ইংল্যান্ডের রাজকীয় সোসাইটিতে চিঠি লিখে পাঠাতে থাকেন। তাঁর গবেষণার গভীরতা দেখে বিশ্বের বিজ্ঞান সমাজ হতবাক হয়ে যায়।
তাঁর তৈরি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সংখ্যা ছিল ২৫০ এরও বেশি। অনেকে মনে করেন এই লেন্সগুলোর ক্ষমতা এতটাই বেশি ছিল যে আধুনিক যুগের অনেক মাইক্রোস্কোপও সেগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারেনা। তাঁর এই আবিষ্কারকে কেন্দ্র করেই জীব বিজ্ঞানের এক নতুন অধ্যায় গড়ে ওঠে।
প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকরা অনুমান করেছিলেন এমন অনেক ক্ষুদ্র বস্তু রয়েছে যা চোখে দেখা যায় না। তবে সে সময় এগুলো কেবল ধারনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৫৯০ সালের আশেপাশে নেদারল্যান্ডের জ্যাচারিয়াস ইয়ানসেন ও তাঁর বাবা হান্স ইয়ানসেন এই দুই চশমা প্রস্তুতকারক তারা একাধিক লেন্স সমন্বিত একটি যন্ত্র তৈরি করেন যা দিয়ে ছোট বস্তুকে বড় করে দেখা যায়। এটি ছিল প্রথম যৌগিক অণুবীক্ষণ যন্ত্রের আদিরূপ। যদিও এই যন্ত্রটি ছিল অপূর্ণাঙ্গ ও সীমিত ক্ষমতা সম্পন্ন। ইংল্যান্ডের বিজ্ঞানী রবার্ট হুক ১৬৬৫ সালে একটি উন্নত যৌগিক অণুবীক্ষণ যন্ত্র নির্মাণ করে কর্ক গাছের সাল পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। যেখানে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন মৌচাকের মতো গঠন। যাকে তিনি নাম দেন, ‘Cell’ বা কোষ। এই আবিষ্কার থেকেই জন্ম নেয় জীববিজ্ঞানের একটি নতুন শাখা — কোষতত্ত্ব।
অনুবিক্ষন যন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে আকর্ষণীয় চরিত্র হলেন ডাচ নাগরিক অ্যান্টনি ভ্যান লিউয়েনহুক। তাঁর আবিষ্কৃত এই যন্ত্রের মাধ্যমে শুধু জিববিদ্যাই নয় পরবর্তী সময় চিকিৎসা বিজ্ঞান, চিকিৎসার প্যাথলজি, ভাইরোলজি, বায়োটেকনোলজি, এমনকি ন্যানোপ্রযুক্তির বিকাশে দারুন প্রভাব ফেলে। কোষ বিভাজন, ডিএনএ বিশ্লেষণ, ক্যান্সার শনাক্তকরণ সবই সম্ভব হয়েছে এই যন্ত্রের কল্যাণে।
এক ঝাড়ুদার, এক চশমা প্রস্তুতকারক এবং এক বিজ্ঞানের হাত ধরে তৈরি অণুবীক্ষণ যন্ত্র আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে সেবা দিচ্ছে। এই যন্ত্র আমাদের দৃষ্টিকে শুধু ক্ষুদ্র জগতে পৌঁছে দেয়নি, খুলে দিয়েছে জ্ঞানের এক বিশাল দরজা। একটি সরল কৌতূহল থেকেই যে আবিষ্কার শুরু হয়েছিল তা আজ পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক হাতিয়ার। একে বলা যেতেই পারে – ” মানব দৃষ্টির সীমা ভাঙ্গার ইতিহাস”।
অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া জীববিজ্ঞান আজ কল্পনাই করা যায় না। অথচ এর পেছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি কোন পান্ডিত্যপূর্ণ গবেষক নন – বরং এক পরিশ্রমী কৌতুহলী ও আত্মনির্ভরশীল মানুষ। যিনি জীবন শুরু করেছিলেন ঝাড়ুদার বা সাধারণ কাজ দিয়ে। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন আগ্রহ, মেধা ও অধ্যাবসায় থাকলে বড় কাজের জন্য ডিগ্রী নয়, দরকার বিশ্বাস ও সাধনা। চশমার কাঁচ ঘষতে ঘষতে যিনি উন্মোচন করেছিলেন অদৃশ্য জীবজগৎ ইতিহাসের পাতায় তিনি আজও বিজ্ঞান চর্চার মহান পথিকৃৎ হয়ে রয়েছেন।










