নয়া দিল্লি: আমেরিকা–ইরান যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকেই পরিবর্তন করেনি, বরং এটি বিশ্ব শক্তির ভারসাম্যের মৌলিক কাঠামোতেও নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। জ্বালানি সংকট, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে এমন একটি শক্তি সামনে এসেছে, যা সরাসরি যুদ্ধে জড়িত না থেকেও তার প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে—চীন। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ থেকে স্পষ্ট যে, চীন এখন আর কেবল একটি অর্থনৈতিক শক্তি নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনৈতিক সমীকরণে একটি নির্ণায়ক ভূমিকা পালনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
গত এক দশক ধরে এশিয়া ও আফ্রিকার বহু উন্নয়নশীল দেশ চীনের ঋণ, অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের উপর বাড়তে থাকা নির্ভরতা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। “ঋণ-ফাঁদ কূটনীতি”র মতো ধারণাগুলোও আলোচনায় এসেছে। তবে বর্তমান সংকট এই আলোচনাকে আংশিকভাবে চ্যালেঞ্জ করেছে। যখন প্রচলিত জ্বালানি উৎসগুলো অস্থির হয়ে পড়ে এবং পশ্চিমা দেশগুলো তাদের নিজস্ব কৌশলগত অগ্রাধিকারে মনোযোগ দেয়, তখন চীনের তৈরি বিকল্প কাঠামো—বিশেষত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সস্তা প্রযুক্তি—অনেক দেশের জন্য স্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের উদাহরণটি যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক। অতীতে জ্বালানির দামের বৃদ্ধির কারণে বারবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়া এই দেশটি এখন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বলে মনে হচ্ছে। চীন থেকে আমদানি করা সৌর প্যানেলগুলো জ্বালানি নির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যখন ঘরোয়া পর্যায়ে জ্বালানি উৎপাদনের ক্ষমতা বাড়ে, তখন আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা মোকাবেলার সক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। এটি শুধু জ্বালানি নীতির সাফল্য নয়, বরং চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতার ফল।
নেপালের প্রেক্ষাপটও ভিন্ন নয়। সস্তা চীনা বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং জলবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ পেট্রোলিয়ামের উপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করেছে। যখন বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়, তখন বিকল্প জ্বালানি উৎসসম্পন্ন দেশগুলো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকে। এটি প্রমাণ করে যে, চীন যে সবুজ প্রযুক্তিকে উৎসাহ দিচ্ছে, তা শুধু একটি বাণিজ্যিক পণ্য নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি মাধ্যম।
তবে এটিকে একতরফাভাবে “চীনের জয়” বলা একটি সরলীকৃত বিশ্লেষণ হবে। চীনের বাড়তে থাকা প্রভাবের সঙ্গে কিছু গুরুতর প্রশ্নও উঠে আসে। চীনের উপর নির্ভরতা কি দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ? অতীতের কিছু ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে, চীন বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। তাই বর্তমান স্থিতিশীলতাকে ভবিষ্যতের সম্পূর্ণ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবে ধরা যায় না।
তবুও, বর্তমান পরিস্থিতি একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—বিশ্ব এখন একধ্রুবীয় ব্যবস্থা থেকে সরে আসছে। যেখানে আমেরিকা এবং তার মিত্ররা সামরিক ও কৌশলগত হস্তক্ষেপে মনোযোগী, সেখানে চীন অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে তার প্রভাব বাড়াচ্ছে। এটি দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে প্রতিযোগিতা—একটি শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ, অন্যটি নির্ভরতা সৃষ্টি করে প্রভাব বিস্তার।
এই প্রতিযোগিতায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তারা আর শুধু প্রভাব গ্রহণকারী নিষ্ক্রিয় পক্ষ নয়, বরং বিকল্পগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষাকারী সক্রিয় খেলোয়াড়ে পরিণত হচ্ছে। চীনের সঙ্গে সহযোগিতায় তাৎক্ষণিক লাভ দেখা যেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। নচেৎ, এক নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে অন্য নির্ভরতার ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
অবশেষে, আমেরিকা–ইরান যুদ্ধ বৈশ্বিক রাজনীতিতে একটি নতুন যুগের ইঙ্গিত দিয়েছে, যেখানে শক্তি শুধু সামরিক ক্ষমতা দিয়ে সংজ্ঞায়িত হয় না। জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের মতো “নীরব শক্তি”ই এখন প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণ করছে। এই ক্ষেত্রগুলোতে চীন তার অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে, ফলে সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই একটি নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
এখন প্রশ্ন শুধু এই নয় যে, চীন কতটা শক্তিশালী হয়েছে, বরং এই নতুন বাস্তবতাকে বিশ্ব কীভাবে গ্রহণ করবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি যেমন একটি সুযোগ, তেমনি একটি চ্যালেঞ্জ—যদি তারা সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তবে তারা লাভবান হবে; অন্যথায়, তারা এই নতুন শক্তির খেলায় কেবল মোহরা হয়ে পড়তে পারে।









