শিলং: ভারতের মেঘালয়ে মুরগি ও শূকরের মাংসের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় খাদ্যবাহিত রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পাওয়া গেছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, ওই ব্যাকটেরিয়ার একাধিক নমুনা সাধারণভাবে ব্যবহৃত বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করেছে। এই ফলাফল মাংসের স্বাস্থ্যবিধি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
অ্যাপ্লায়েড ফুড রিসার্চ নামের বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, পরীক্ষিত ৮৬৪টি নমুনার মধ্যে ২৭টিতে ক্যাম্পাইলোব্যাক্টার জেজুনি নামের ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এই ব্যাকটেরিয়া মানুষের মধ্যে ডায়রিয়া, পেটব্যথা ও জ্বরের মতো উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে।
গবেষকেরা আরও দেখতে পেয়েছেন, পরীক্ষিত ব্যাকটেরিয়ার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ একাধিক শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী। অর্থাৎ, ওই ব্যাকটেরিয়াগুলি অন্তত তিনটি ভিন্ন শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা দেখিয়েছে।
ভারতের উমিয়ামে অবস্থিত ভারতীয় কৃষি গবেষণা পরিষদের উত্তর-পূর্ব পার্বত্য অঞ্চল গবেষণা কেন্দ্র, উত্তরপ্রদেশের ভারতীয় পশুচিকিৎসা গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং মেঘালয়ের কিরডেমকুলাইয়ে অবস্থিত কেন্দ্রীয় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি মহাবিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে এই গবেষণা পরিচালনা করেন।
গবেষণার জন্য মেঘালয়ের রি-ভোই এবং ইস্ট খাসি হিলস জেলার পশুপালন খামার, পশু জবাইয়ের কেন্দ্র এবং খুচরো মাংসের দোকান থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। মুরগি ও শূকরের উৎপাদন থেকে শুরু করে ক্রেতার কাছে পৌঁছনো পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি এবং তার জিনগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করাই ছিল গবেষণার মূল উদ্দেশ্য।
মুরগির অন্ত্র থেকে সংগ্রহ করা ১৪৪টি নমুনা পরীক্ষা করে ১৪টিতে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া যায়। এই হার ৯.৭২ শতাংশ।
অন্যদিকে, শূকরের মাংসের ১৪৪টি নমুনার মধ্যে ১১টিতে ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। এই হার ৭.৬৪ শতাংশ। মুরগির মাংসের ১৪৪টি নমুনার মধ্যে দুটিতে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে, যা মোট নমুনার ১.৩৯ শতাংশ।
তবে মুরগির ক্লোয়াকাল সোয়াব, শূকরের অন্ত্র এবং মলদ্বার থেকে সংগ্রহ করা নমুনায় ওই ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান মেলেনি।
অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে উচ্চ প্রতিরোধক্ষমতা
গবেষণায় ২৬টি ব্যাকটেরিয়ার নমুনার অ্যান্টিবায়োটিক-সংবেদনশীলতা পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে দেখা গেছে, ন্যালিডিক্সিক অ্যাসিড এবং টেট্রাসাইক্লিনের বিরুদ্ধে সর্বাধিক প্রতিরোধক্ষমতা রয়েছে। উভয় অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে ৭৩.০৮ শতাংশ ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী ছিল।
এ ছাড়া, ৪২.৩১ শতাংশ নমুনায় অ্যাম্পিসিলিন এবং ১৯.২৩ শতাংশ নমুনায় সিপ্রোফ্লক্সাসিনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা পাওয়া গেছে।
পরীক্ষিত ২৬টি নমুনার মধ্যে আটটি একাধিক শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী ছিল। এই হার ৩০.৭৭ শতাংশ। এ ধরনের প্রতিরোধক্ষমতা সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।
গবেষকেরা আরও দেখতে পেয়েছেন, ২৬টি ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে ১৪টি বায়োফিল্ম তৈরি করতে সক্ষম। বায়োফিল্ম হলো ব্যাকটেরিয়ার এমন একটি গঠন, যেখানে তারা কোনও পৃষ্ঠের সঙ্গে লেগে থেকে একত্রে বসতি তৈরি করে। এই গঠন ব্যাকটেরিয়াকে প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে সাহায্য করতে পারে। মাংস প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত পৃষ্ঠ থেকে এ ধরনের ব্যাকটেরিয়া নির্মূল করা কঠিন হতে পারে।
জিনগত বিশ্লেষণে মিলেছে প্রতিরোধক্ষমতার প্রমাণ
বিজ্ঞানীরা ২৫টি ব্যাকটেরিয়ার সম্পূর্ণ জিনোম বিশ্লেষণ করে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক্ষমতা এবং রোগ সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেন।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৮৮ শতাংশ জিনোমে জিওয়াইআরএ জিনের টি৮৬আই মিউটেশন বা জিনগত পরিবর্তন রয়েছে। এই পরিবর্তন ফ্লুরোকুইনোলোন শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। টেট্রাসাইক্লিনসহ অন্যান্য অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত জিনও শনাক্ত হয়েছে।
ব্যাকটেরিয়ার জিনগত ধরনে বৈচিত্র্য থাকলেও এসটি১০৭০৯ নামের জিনগত ধরনটি সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এটি এসটি৩৫৩ ক্লোনাল কমপ্লেক্সের অন্তর্গত।
গবেষকদের দাবি, তাঁদের জানা মতে, ভারতে শূকর থেকে সংগৃহীত ক্যাম্পাইলোব্যাক্টার জেজুনির জিনগত মহামারিবিদ্যা নিয়ে এটিই প্রথম গবেষণা। তাঁদের মতে, খাদ্যবাহিত সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎস চিহ্নিত করতে শূকরের মাংসকেও নজরদারির আওতায় আনা জরুরি। কারণ, এই ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত মুরগি ও মুরগিজাত পণ্যের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
খামার থেকে বাজার পর্যন্ত নজরদারি বাড়ানোর সুপারিশ
গবেষণায় খামারের পাশাপাশি পশু জবাইয়ের কেন্দ্র, মাংস কাটা ও প্রক্রিয়াকরণের স্থান, পরিবহণ ব্যবস্থা এবং খুচরো বিক্রয়কেন্দ্রে খাদ্যনিরাপত্তা নজরদারি জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
সরবরাহব্যবস্থার যেকোনও পর্যায়ে মাংস দূষিত হতে পারে। তাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, সঠিকভাবে মাংস সংরক্ষণ করা এবং স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে মাংস পরিচালনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
তাঁরা মানবস্বাস্থ্য, পশুস্বাস্থ্য এবং খাদ্যনিরাপত্তাকে একসঙ্গে যুক্ত করে ‘ওয়ান হেলথ’ বা একীভূত স্বাস্থ্যভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করেছেন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার পর্যবেক্ষণ, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের প্রবণতা শনাক্ত এবং খামার থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছনো পর্যন্ত সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।
তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এই ফলাফলকে সমগ্র মেঘালয় রাজ্যে মাংসের দূষণের পরিস্থিতির প্রতিনিধিত্বকারী পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। গবেষণাটি মাত্র দুটি জেলায় পরিচালিত হয়েছে এবং নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে সুবিধাভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। ফলে রাজ্যজুড়ে ব্যাকটেরিয়ার প্রকৃত উপস্থিতি ও বিস্তারের মাত্রা নির্ধারণ করতে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।
সীমিত এলাকা ও নমুনার ভিত্তিতে পরিচালিত হলেও এই গবেষণা মেঘালয়ে ক্যাম্পাইলোব্যাক্টার জেজুনির জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক্ষমতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছে। খাদ্যবাহিত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে পশুপালন থেকে মাংস বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা এবং অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার নিয়মিত নজরদারি চালানোর প্রয়োজনীয়তার ওপরও গবেষণাটি গুরুত্ব দিয়েছে।





