ভদ্রপুর(দেবেন্দ্র কে. ঢুঙ্গানা): সাম্প্রতিক অনুষ্ঠিত নির্বাচন এবং তার পর গঠিত ক্ষমতার সমীকরণ শুধু নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, বরং তার পররাষ্ট্র নীতির দিকনির্দেশনা ও চরিত্র নিয়েও গভীর বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। বর্তমান সরকার- বিশেষ করে রাস্বপা নেতৃত্বাধীন উদীয়মান ‘বালেন সরকার’—কে ঘিরে ওঠা প্রশ্নগুলো কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দেশের সার্বভৌমত্ব, কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, সেই মৌলিক উদ্বেগের সঙ্গেই যুক্ত।
সরকার গঠনের প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলো পর্যবেক্ষণ করে কিছু বিশ্লেষক এটিকে “অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনের চেয়ে বহিরাগত প্রভাবের ফল” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। বিশেষ করে মার্কিন কৌশলগত আগ্রহ নেপালের রাজনৈতিক কাঠামোর উপর প্রভাব ফেলছে, এমন যুক্তি রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। এই বিশ্লেষণকে সম্পূর্ণ সত্য বলা না গেলেও, উত্থাপিত প্রশ্নগুলোকে উপেক্ষা করাও সম্ভব নয়।
নেপালের পররাষ্ট্র নীতি ঐতিহাসিকভাবে “ভারসাম্য” এবং “অ-জোট নিরপেক্ষতা (নন-অ্যালাইনমেন্ট)” নীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ভারত ও চীনের মতো দুই শক্তিশালী প্রতিবেশীর মাঝখানে অবস্থিত নেপাল সবসময় “সমদূরত্ব” এবং “সমান সম্পর্ক” বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ভারসাম্য টলে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। যদি কোনো সরকারকে “মার্কিন প্রভাবে পরিচালিত” বলে ধারণা শক্তিশালী হয়, তাহলে তা স্বাভাবিকভাবেই চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অবিশ্বাস সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো নেপালকে চীনের তিব্বত অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করে দেখার বহিরাগত কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি। ‘ফ্রি তিব্বত’ আন্দোলনের সঙ্গে কিছু মন্ত্রীর অতীত সংশ্লিষ্টতার উল্লেখ এই আশঙ্কাকে আরও জোরদার করেছে। যদিও ব্যক্তিগত পটভূমি এবং সরকারি নীতির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকা উচিত, তবে কূটনীতিতে ধারণা (পারসেপশন) প্রায়শই বাস্তবতায় রূপ নেয়। ফলে এ ধরনের সম্পর্ক আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কী বার্তা দেয়, তা অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়।
নেপাল সবসময় ‘ওয়ান চায়না পলিসি’র প্রতি তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে, যার মাধ্যমে তিব্বতকে চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই প্রেক্ষাপটে, যদি সরকারের কোনো কার্যক্রম বা বক্তব্যে এই নীতিতে অস্পষ্টতা দেখা দেয়, তবে তা নেপাল–চীন সম্পর্কের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। এতে নেপালের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চর্চায়ও কিছু উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ছাত্র সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন এবং সংবাদমাধ্যমের উপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর প্রচেষ্টার অভিযোগ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো বহুত্ববাদ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংগঠন গঠনের অধিকার। যদি রাষ্ট্র এই মৌলিক অধিকারগুলো সীমিত করার দিকে অগ্রসর হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে ইঙ্গিত করতে পারে।
এর পাশাপাশি, জনপ্রিয়তাবাদ (পপুলিজম)-এর উত্থানও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রাথমিকভাবে এটি জনসমর্থন অর্জন করতে সক্ষম হলেও, যদি এটি প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিতার আওতায় না থাকে, তবে তা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে চরম অবস্থায় ফ্যাসিবাদী প্রবণতার জন্ম দিতে পারে। ইতিহাস দেখায়, জনমতকে উসকে দিয়ে ক্ষমতায় আসা শক্তিগুলো প্রায়ই প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যকে উপেক্ষা করে।
এমন পরিস্থিতিতে “দেশপ্রেমিক ও প্রগতিশীল শক্তির ঐক্য”র আহ্বানকেও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী বোঝা জরুরি। ঐক্য নিজেই কোনো সমাধান নয়; এটি নির্ভর করে সেই ঐক্য কোন মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। যদি এটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সুরক্ষা, জাতীয় সার্বভৌমত্বের শক্তিশালীকরণ এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্র নীতির পক্ষে কেন্দ্রীভূত হয়, তবে তা ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু যদি এটি শুধুমাত্র ক্ষমতার লড়াই বা আদর্শগত মেরুকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সমস্যা আরও গভীর হতে পারে।
অবশেষে, নেপালের সামনে চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট- অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে বহিরাগত শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। কোনো শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করা বা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা, দুটিই চরম অবস্থান, যা নেপালের জন্য উপযুক্ত নয়। প্রয়োজন একটি বাস্তবসম্মত, স্বাধীন এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্র নীতি, যা সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে, কিন্তু কারও প্রভাবে পরিচালিত হবে না।
বর্তমান সরকারের পদক্ষেপগুলোকে এই মানদণ্ডেই মূল্যায়ন করা উচিত। সমালোচনা ও সমর্থন—উভয়ই গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তবে তা তথ্য, যুক্তি এবং বিচক্ষণতার উপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত। নেপালের নিজের পথ নির্ধারণ করার সক্ষমতা রয়েছে—প্রশ্ন শুধু এই যে, সেই পথ কতটা স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দূরদর্শী হবে।











