কোলকাতা: ‘তৃণমূল পাণ্ডব, আর বিজেপি কৌরবদের দল।’ এমন বার্তা দেওয়ার পরই রঘুনাথপুরের জনসভা থেকে ভোটারদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানতে চান, তারা কোন পক্ষকে বেছে নিতে চান। পাশাপাশি রঘুনাথপুরের এই মঞ্চ থেকে মমতা এ দাবিও করেন, বিজেপি বাংলার অস্তিত্ব ও সংস্কৃতিকে দুর্বল করতে চাইছে। বাংলাকে ‘টার্গেট’ করার অভিযোগও তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাই ভোটে তৃণমূলকে সমর্থন করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একটা ভোটও যেন অন্য কাউকে না যায়।
সঙ্গে ভোটারদের উদ্দেশে তাঁর সতর্কবার্তা, ‘পুলিশের পোশাক পরে কেউ যদি ছাপ্পা দিতে আসে, রুখে দাঁড়াবেন।’ এরই রেশ ধরে রঘুনাথপুরের জনসভা থেকে মহিলা ভোটারদের বলেন বেলন নিয়েও প্রস্তুত থাকার কথাও। শুধু তাই নয়, এদিনের রঘুনাথপুরের সভা মঞ্চ থেকে মমতা বলেন, ভোটের আগে বাইরের গুন্ডাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে হবে। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্রীয় বাহিনী বা বিজেপির লোকজন ছদ্মবেশে এসে ভোট প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে মহিলা ভোটারদেরই প্রতিরোধ গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে হবে বলে জানান তিনি। আর এখানেই মমতার বার্তা, ‘যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে, তাই প্রয়োজন হলে বেলন নিয়েও প্রস্তুত থাকুন।’ এরপরই বিজেপিকে বিদ্ধ করে মমতা এও বলেন, ‘তৃণমূলকে চোর বলা হচ্ছে, অথচ দেশ বেচে দেওয়ার চেষ্টা করছে ওরাই।
এদিনও বক্তব্য রাখতে গিয়ে এসআইআর ও সাপ্লিমেন্টারি লিস্টে কারচুপির অভিযোগ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি অভিযোগ করেন, ‘এক একটা বুথে শুনছি পাঁচশো ভোটার থাকলে চারশো নাম বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ এটা কি মজা হচ্ছে? বিজেপি সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করছে৷ প্রথম সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট কোথায় গেল? তোমরা এআই দিয়ে নাম ভুল করেছ, এমনকি বিচারকদের নাম পর্যন্ত অ্যাডজুডিকেশন লিস্টে ঢুকিয়ে দিয়েছ, লজ্জা করে না? শুনুন এদের কোনও লজ্জা নেই, কারণ এদের দু-কানই কাটা।’ সঙ্গে এও বলেন, ইচ্ছাকৃতভাবে বহু মহিলার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বিবাহের পর পদবি পরিবর্তনের কারণে বহু নারী সমস্যায় পড়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে নির্বাচনী নির্ঘণ্ট ঘোষণার পরেরদিন থেকেই প্রশাসনের শীর্ষস্তরে আমলা ও পুলিশ আধিকারিকদের বদল শুরু করেছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন৷ যা নিয়ে বারেবারে সরব হতে দেখা গেছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে৷ যা নিয়ে এতদিন কমিশন ও বিজেপিকে নিশানা করছিলেন তিনি৷ তবে শনিবার নাম না-করেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে ‘শয়তান’ বলে উল্লেখ করলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। মমতার অভিযোগ, তিনি নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে থাকা সত্ত্বেও, তাঁর সমস্ত ক্ষমতা খর্ব করে দিয়ে বাংলার মানুষের উপর অত্যাচার চালানো হচ্ছে বিজেপি কথায়৷ আর এর জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের ‘দুই শয়তান’ দায়ী বলে মন্তব্য করেন তৃণমূল সুপ্রিমো। আর এই প্রসঙ্গে টেনে সঙ্গে এও বলেন, ‘বাংলায় আমি ইলেক্টেড চিফ মিনিস্টার থাকা সত্ত্বেও, সব পাওয়ার কেড়ে নিয়ে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট আর তার দুই শয়তান, নাম বলার প্রয়োজন নেই, মিলে অত্যাচার করে যাচ্ছে বাংলার মানুষের ওপর।
অন্যদিকে, রামনবমীর শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে রঘুনাথগঞ্জে অশান্তির ঘটনাতেও নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপিকে দায়ী করেন মমতা। বলেন, ‘রঘুনাথগঞ্জে তুমি রামনবমীর মিছিল করো, আমাদের কোনও আপত্তি নেই৷ আমাদের ছেলেমেয়েরাও করে, কিন্তু অশান্তি তো করে না৷ তোমরা পরশুদিন সিউড়িতে মিছিল করেছ, বন্দুক উঁচিয়ে মিছিল করেছ । আমি জানি না-কেন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যাকশন নিচ্ছে না। আপনারা আমাকে দোষ দেবেন না, আমার থেকে সব কেড়ে নিয়েছে৷ সব নিজেদের মতো অফিসার রিক্রুট করেছে ৷ আমরা চাই সবাই নিরপেক্ষভাবে কাজ করুক ৷ আজ না-হলেও কাল, তোমাদের একটাকেও ছাড়ব না। মনে রাখবে মানুষ তোমাদের বিচার করবে।
অন্যদিকে, এদিনের সভা থেকে হঠাৎই বেহালায় বুলডোজার চালিয়ে দোকান ভেঙে দেওয়ার অভিযোগে সরব হন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ নির্বাচন কমিশনের তরফে কলকাতা পুরনিগমের কমিশনার বদল নিয়ে বলতে গিয়ে হঠাৎই মমতা বলেন, ‘আমি দুঃখিত, আমি ক্ষমা চাইছি বেহালার সেই সব দোকানদারদের কাছে।’ সঙ্গে এও বলেন, ফিরহাদ হাকিম মেয়র থাকলে কি হবে, ওখানে কমিশনার নিয়োগ করেছে বিজেপির লোককে। তাঁকে আমি অনুরোধ করব, আগুনে পা দিয়ে খেলবেন না। বুলডোজার চালিয়ে অনেক দোকান বেহালায় ভেঙে দিয়েছে। আমার হাতে নেই, বেহালাবাসী আমি দুঃখিত, আমি ক্ষমাপ্রার্থী। যে দোকান বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে দিয়েছে, আমি আবার করে দেব, আমাকে সময় দিন, এরা চিরকাল থাকবে না। আমাদের অর্ডারে হয়নি। সবাইকে সরিয়ে দিয়ে কখনও বুলডোজার চালাচ্ছে, কখনও অশান্তি করছে, যা ইচ্ছে তাই করে যাচ্ছে।
এদিকে বেহালা এলাকায় বুলডোজার দিয়ে দোকান ভাঙার বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের তরফে সোশাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট করা হয়েছে৷ সেখানে বলা হয়েছে, বেহালায় দোকান ভাঙার ঘটনাটি ২০২৪ সালের৷ পুলিশের পোস্টে বলা হয়েছে, ‘বেহালায় বেআইনি দোকান ভাঙা ২০২৪ সালের ৷ সেটিকে মিথ্যে প্রচারের জন্য ২০২৬ সালে ব্যবহার করা হচ্ছে ৷ কেউ বা কারা এমন ভুয়ো পোস্ট ছড়ালে, তাদের বিরুদ্ধে আইনত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এছাড়াও এদিনও আধিকারিক বদল নিয়ে তৃণমূল সুপ্রিমোর নিশানায় ছিল জাতীয় নির্বাচন কমিশন ৷ মমতা বলেন, ’নির্বাচনের দিন ঘোষণা হওয়ার পর থেকে, বা তারও আগে থেকে, বিজেপি পরিচালিত যে ‘ভ্যানিশ কমিশন’ আছে, বিজেপির ‘ভ্যানিশ ওয়াশিং মেশিন কমিশন’, তারা মানুষের ওপর অত্যাচার করার জন্য, যারা এলাকা চিনত এমন প্রায় ৫০ থেকে ১০০ জন অফিসারকে তামিলনাড়ু ও কেরালায় পাঠিয়ে দিয়েছে। যাতে এখানে বিজেপির বেনামি টাকা, গুন্ডা, ড্রাগ ঢুকতে পারে এবং বুলডোজার চালানো ও অশান্তি করার সুযোগ পায়।’ এছাড়াও গ্যাসের দাম, রেলভাড়া বৃদ্ধি এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্প নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়িয়ে কেন্দ্র সরকার নিজেদের সুবিধা করছে। নোটবন্দি থেকে আধার— বারবার লাইনে দাঁড়ানোর প্রসঙ্গ তুলে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘একটা জীবনে কতবার লাইনে দাঁড়াবেন মানুষ?’ সব মিলিয়ে, রঘুনাথপুরের সভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করে দেন, ভোটের লড়াই এবার শুধু রাজনৈতিক নয়, এবার তা জড়িয়ে গেছে বাংলার আবেগের সঙ্গেও।











