এনবিএসটিসি-র সাহসী সিদ্ধান্ত, এক নতুন দৃষ্টান্ত
শিবনাথ দাস
শিলিগুড়ি: বর্তমান সময়ে উন্নয়নের সংজ্ঞা প্রায়শই রাজস্ব বৃদ্ধি, মুনাফা এবং আর্থিক লাভের নিরিখে বিচার করা হয়। সরকারি হোক বা বেসরকারি, বেশিরভাগ সংস্থাই আয়ের অঙ্ক বাড়াতে সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নকে গৌণ করে রাখে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ সংস্থা (এনবিএসটিসি)র সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে এক ব্যতিক্রমী ও অনুকরণীয় উদাহরণ। জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে বছরে প্রায় ১ কোটি ২৫ লক্ষ টাকার রাজস্ব ত্যাগ করে বাসের গা থেকে তামাকজাত পণ্য, গুটখা ও পানমশলার বিজ্ঞাপন সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, এটি একটি গভীর নৈতিক ও সামাজিক বার্তা। একটি রাষ্ট্রীয় পরিবহণ সংস্থা, যারা প্রতিনিয়ত লোকসান আর ভরতুকির সঙ্গে লড়াই করে পরিষেবা বজায় রাখে, তাদের কাছে সওয়া এক কোটি টাকার রাজস্ব ছেড়ে দেওয়া সহজ কথা নয়। কিন্তু নিগম কর্তৃপক্ষ প্রমাণ করে দিয়েছে যে, কোষাগারের শ্রীবৃদ্ধির চেয়ে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের সুরক্ষা অনেক বেশি মূল্যবান। বাসের গায়ে চটকদার রঙে রাঙানো গুটখা বা পানমশলার বিজ্ঞাপন দেখে কিশোর ও যুবসমাজ এই মারণ নেশার প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে, এই আশঙ্কা থেকেই এই আমূল পরিবর্তনের ডাক দেওয়া হয়েছে। এনবিএসটিসি-র প্রায় ৭০০টি বাসের মধ্যে প্রায় ১৫০টিতে দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন চলছিল। স্বাভাবিকভাবেই এই বিজ্ঞাপন থেকে সংস্থার উল্লেখযোগ্য আয় হত। কিন্তু প্রশ্ন একটাই, জনগণের করের টাকায় চলা একটি সরকারি পরিবহণ সংস্থার গায়ে এমন পণ্যের প্রচার কি আদৌ গ্রহণযোগ্য, যা ক্যানসারের মতো মারণ রোগের অন্যতম কারণ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এনবিএসটিসি যে সাহসী পথে হাঁটল, তা প্রশাসনিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বাসের গায়ে রঙিন, আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন কেবল পণ্যের পরিচিতি বাড়ায় না, বরং অবচেতন মনেও প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে কিশোর ও যুবসমাজের কাছে এই ধরনের প্রচার এক ধরনের নীরব প্রলোভন তৈরি করে। যাতায়াতের সময় প্রতিদিন চোখের সামনে থাকা এই বিজ্ঞাপন ধীরে ধীরে নেশার প্রতি আগ্রহ জন্ম দিতে পারে, এ কথা চিকিৎসক ও সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন। সেই বাস্তবতাকে স্বীকার করেই এনবিএসটিসি এই ‘অপ্রিয় কিন্তু প্রয়োজনীয়’ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে নাগরিক সমাজ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির দীর্ঘদিনের দাবি। বহুবার প্রশ্ন উঠেছে, স্বাস্থ্য সচেতনতার কথা বলা সরকারই কীভাবে পরোক্ষভাবে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতিকর পণ্যের প্রচারে মদত দিতে পারে? এনবিএসটিসি র বর্তমান চেয়ারম্যান পার্থপ্রতিম রায় এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর দীপঙ্কর পিল্লাইয়ের নেতৃত্বে সংস্থার বোর্ড সেই প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়েছে। সরকারি বিধিনিষেধ, সামাজিক চাপ এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংস্থার পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে।পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য পরিবহণ নিগম যেমন দক্ষিণবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ সংস্থা (এসবিএসটিসি) বা পশ্চিমবঙ্গ পরিবহণ নিগম (ডব্লুবিটিসি) এর ক্ষেত্রেও এই সিদ্ধান্ত এক বিশাল উদাহরণ হয়ে থাকবে। কেবল পরিবহণ দপ্তর কেন, সরকারের অন্যান্য বিভাগ এবং রেলকেও এই পথে হাঁটার কথা ভাবতে হবে। রাজস্বের ঘাটতি পূরণের জন্য হয়তো অন্য পথ খোঁজা সম্ভব, কিন্তু জনস্বাস্থ্যের যে ক্ষতি হয়ে যায়, তা পূরণ করা দুঃসাধ্য।এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। তামাকজাত দ্রব্য কেবল মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়, পরিবেশ ও নাগরিক সৌন্দর্যবোধের পক্ষেও মারাত্মক ক্ষতিকর। বাস, রাস্তা কিংবা পাবলিক প্লেসে থুতু, প্যাকেট ফেলে নোংরামি, সবই এই নেশারই পরিণতি। ফলে তামাকজাত পণ্যের প্রচার বন্ধ মানে কেবল স্বাস্থ্যরক্ষা নয়, বরং একটি পরিচ্ছন্ন ও সচেতন সমাজ গঠনের দিকেও এক ধাপ এগোনো। সমালোচকরা বলতে পারেন লোকসানে চলা একটি পরিবহণ সংস্থার পক্ষে এমন রাজস্ব ত্যাগ কি যুক্তিসঙ্গত? কিন্তু এখানেই আসে রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধের প্রশ্ন। রাজস্বের ঘাটতি অন্য পথেও পূরণ করা যায় পরিষেবা উন্নত করে, স্বাস্থ্যকর পণ্য বা সামাজিক সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন এনে। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের যে ক্ষতি একবার হয়ে যায়, তা আর্থিক অঙ্ক দিয়ে পূরণ করা যায় না। সেই উপলব্ধিই এনবিএসটিসি-কে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
এই সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য পরিবহণ সংস্থা- দক্ষিণবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ সংস্থা (এসবিএসটিসি) বা পশ্চিমবঙ্গ পরিবহণ নিগম (ডব্লুবিটিসি)-এর কাছেও এক স্পষ্ট বার্তা বহন করে। শুধু রাজ্য নয়, দেশের অন্যান্য রাজ্য পরিবহণ সংস্থা, এমনকি রেলওয়ের মতো বৃহৎ সরকারি পরিষেবার ক্ষেত্রেও এই উদাহরণ অনুসরণযোগ্য। সরকারি পরিকাঠামো কখনওই ক্ষতিকর পণ্যের প্রচারের বাহন হতে পারে না, এই নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করার সময় অনেক আগেই এসেছে। পরিশেষে বলা যায়, এনবিএসটিসি-র এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে দিয়েছে যে প্রশাসনিক সাহস এখনও হারিয়ে যায়নি। ১ কোটি ২৫ লক্ষ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়তো হবে, কিন্তু তার বিনিময়ে সংস্থাটি যে সামাজিক আস্থা, নৈতিক উচ্চতা এবং জনসম্মান অর্জন করল, তার কোনও আর্থিক মূল্য নেই। বিজ্ঞাপনের মোড়কে লুকিয়ে থাকা বিষাক্ত হাতছানি থেকে সাধারণ মানুষকে দূরে রাখার এই প্রচেষ্টায় এনবিএসটিসি নিঃসন্দেহে পথপ্রদর্শক।উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ সংস্থাকে এই জনহিতকর, দূরদর্শী ও সাহসী সিদ্ধান্তের জন্য বিনম্র কুর্নিশ জানাই। আশা করা যায়, ভবিষ্যতে এই সংস্থা কেবল যাত্রী পরিবহণেই নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুস্থ মূল্যবোধ রক্ষার ক্ষেত্রেও অন্যদের পথ দেখাবে।











